লোকসভার এ বারের বাদল অধিবেশন থেকে সাসপেন্ড (নিলম্বিত) করা হল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের মহিলা সাংসদদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। ওই অভিযোগের প্রেক্ষিতে পদক্ষেপ করা হয় তৃণমূলের ওই সাংসদের বিরুদ্ধে। অধিবেশনের বাকি দিনগুলিতে তিনি আর থাকতে পারবেন না লোকসভায়।
নির্দিষ্ট ভাবে কী অভিযোগ রয়েছে কল্যাণের বিরুদ্ধে, তা প্রাথমিক ভাবে স্পষ্ট নয়। তবে সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানাচ্ছে, স্পিকার ওম বিড়লার কাছে কল্যাণের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে। তার প্রেক্ষিতে কল্যাণকে সাসপেন্ড করার প্রস্তাব আনা হয় লোকসভায়। ধ্বনিভোটে তা পাশও হয়। এর পরেই তাঁকে অধিবেশনকক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে বলা হয়।
বিরোধীদের হট্টগোলের জেরে এ দিন লোকসভার অধিবেশন মুলতুবি হয়ে যায়। পিটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময়ে ‘বিদ্রোহী’ শিবিরের তিন মহিলা সাংসদ— কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায় এবং মিতালি বাগের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়ান কল্যাণ। দু’পক্ষের মধ্যে উত্যপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। ঠিক কী কারণে এই তর্কাতর্কি হয়েছে, এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তা স্পষ্ট নয়।
দু’পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের সময়ে কয়েক জন বিরোধী সাংসদ বিষয়টি থামানোর চেষ্টা করেন। দু’পক্ষকেই শান্ত করার চেষ্টা করেন তাঁরা। পিটিআই জানাচ্ছে, কী ঘটেছে সে বিষয়ে বিরোধী সাংসদেরা জানতে চাইলে অধিবেশন কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান কল্যাণ। অন্য দিকে কাকলি এবং ‘বিদ্রোহী’ গোষ্ঠী অন্য সাংসদেরা মিলে তখন চলে যান স্পিকারের ঘরে। সূত্রের খবর, স্পিকার তাঁদের লিখিত ভাবে নিজেদের অভিযোগ জানাতে বলেন।
পরে দুপুর ২টোয় ফের অধিবেশন বসলে কল্যাণের বিরুদ্ধে অভিযোগটি উত্থাপন করা হয় লোকসভায়। তখন লোকসভার কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন অন্ধ্রপ্রদেশের টিডিপি-র সাংসদ কৃষ্ণপ্রসাদ তেনেটি। তিনি বলেন, “কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের মহিলা সাংসদদের বিষয়ে অসংসদীয় ভাষা প্রয়োগ করেছেন। অসংসদীয় টিপ্পনি করেছেন। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে স্পিকারের কাছে।” কল্যাণের মন্তব্য অধিবেশনকক্ষের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছে বলেও জানান তিনি।
আরও পড়ুন:
তেনেটি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অর্জুনরাম মেঘওয়ালকে কল্যাণের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাঠ করার জন্য নির্দেশ দেন। ওই প্রস্তাবে কল্য়াণকে অধিবেশন থেকে নিলম্বিত করার বিষয়ে লোকসভার সম্মতি চাওয়া হয়। নিট প্রশ্নফাঁস বিতর্ক এবং অন্য বিরোধী সাংসদদের হট্টগোলের মাঝেই ধ্বনিভোটে পাশ হয় প্রস্তাবটি। এর পরে কল্যাণকে অধিবেশনকক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে নির্দেশ দেন তেনেটি।
নিলম্বিত হওয়ার পরে ‘বিদ্রোহীদের’ খোঁচা দিয়ে কল্যাণ বলেন, “আমাকে এখানে সাসপেন্ড করে কী করবে? বাড়ি থেকে তো বেরোতে পারে না! ২০ সাংসদের দল না? দেড় মাসে একটা মিটিংও করেছে কলকাতায়? ২০টা ভোটারও নেই ওদের। ওরা গদ্দার, ওরা বেইমান। আজই সব শেষ হয়ে যাচ্ছে না। এক বছর পরে এই সরকার ধসে পড়বে।”
অন্য দিকে, বিদ্রোহী শিবিরের অন্যতম সাংসদ শতাব্দীর অভিযোগ, কল্যাণ মহিলাদের উদ্দেশে ‘কুকথা’ বলেন। সাংসদের কথায়, “কল্যাণদা এটা সব সময় করে থাকেন। সব সময় সকলের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। মহিলাদের গালাগালি দেন। এমন কথা কোনও ভদ্রলোকের মুখে ভাবা যায় না। দিদির কাছে অনেক সময় অভিযোগ গিয়েছে। দিদি বলতেন, ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও, আর হবে না। কিন্তু ওঁর সাহসটা দিনে দিনে এত বেড়ে গিয়েছে, উনি ভাবছেন সবাই ওঁর চাকর।”
লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দল বর্তমানে দু’ভাগে ভেঙে গিয়েছে। ২৮ জনের মধ্যে ২০ জন সাংসদই ‘বিদ্রোহী’ হয়ে তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। যোগ দিয়েছেন ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (এনসিপিআই)-য়। কাকলি, শতাব্দী, মিতালি— তিন জনেই সেই বিদ্রোহী শিবিরের সাংসদ। অন্য দিকে, কল্যাণ এখনও কালীঘাট শিবিরেই রয়েছেন বলে খবর।
অতীতেও মহিলা সাংসদদের নিশানা করে মন্তব্যের জেরে বিতর্কের মুখে পড়তে হয়েছিল কল্যাণকে। গত মে মাসেও কল্যাণের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন কাকলি। লোকসভার স্পিকারের কাছে গত মে মাসে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন তিনি। কল্যাণের বিরুদ্ধে ‘মৌখিক হেনস্থার’ অভিযোগ তুলেছিলেন। জুন মাসেও কল্য়াণের বিরুদ্ধে স্পিকারের কাছে চিঠি জমা দিয়েছিলেন বারাসতের সাংসদ। ওই চিঠিতে লিখেছিলেন, শুধু তাঁকে নয়, অন্য মহিলা সাংসদদেরও ‘আপত্তিকর, অসম্মানজনক’ কথাবার্তা বলেন শ্রীরামপুরের সাংসদ। কল্যাণের বহিষ্কারেরও দাবি জানিয়েছিলেন স্পিকারের কাছে।
কল্যাণ অধিবেশন থেকে নিলম্বিত হওয়ার পরে মুখ খুলেছেন কাকলিও। তৃণমূলের ওই সাংসদকে বিঁধে তিনি বলেন, “উনি নারীবিদ্বেষী। উনি কখনও সদনের ভিতরে, কখনও সংসদের বাইরে মহিলাদের অসম্মান করেন। গালিগালাজ করেন। আজও তার অন্যথা হয়নি। উনি মহিলাদের যে ভাষায় আক্রমণ করেন, তার প্রতিবাদে আজ অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছিল স্পিকারের কাছে।”