বই ছুঁড়ে ফেলে দিতে উদ্যত এক যুবককে এক প্রবীণ অনুরোধ করছেন, ‘‘বইটা নষ্ট কোরো না ভাই। এ দিকে এসো, বইগুলো দ্যাখো...।’’ পুজোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োর এই মুহূর্ত যেন এক প্রতীক হয়ে উঠেছে। ভিডিয়োয় যে বৃদ্ধকে দেখা যাচ্ছে, সত্তরোর্ধ্ব সেই বিপুল দাশগুপ্ত মনে করছেন, এই প্রতিবাদ তাঁর একার নয়, বহু বইপ্রেমী, শিক্ষাপ্রেমী মানুষের কথা।
সিপিএমের সর্বক্ষণের কর্মী, দমদমের বাসিন্দা বিপুলের ছবি ‘ভাইরাল’ হয়ে যায় নাগেরবাজারে বামেদের বই-বিপণিতে আক্রমণের ঘটনায়। বই ফেলে দিতে উদ্যত যুবকদের অনুরোধ করছিলেন, শান্ত ভাবে বোঝাচ্ছিলেন এলাকায় ‘বুজুদা’ নামেই পরিচিত বিপুল। ওই মুহূর্তে তাঁর এমন আচরণের প্রশংসায় সমাজমাধ্যমে সরব হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। বিপুল নিজে অবশ্য এতে আলাদা করে আনন্দের কিছু দেখছেন না। তাঁর নিজের ব্যক্তিগত প্রচারে বারবার আপত্তির কথা জানিয়ে তিনি কেবল বলছেন, ‘‘ওই সময় যা করা উচিত, সেটুকুই করেছি। পরেও করব।’’ তাঁর কথায়, ‘‘আমি একটা শৃঙ্খলাবদ্ধ দলের একেবারে নিচুতলার কর্মী। আমি একা নই, গোটা রাজ্যে অনেকে প্রতিবাদ করেছেন। আলাদা করে আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই।’’
১৯৭৭-এ রাজ্যে বাম সরকার ক্ষমতায় আসার পরে সম্ভবত ১৯৭৯ সাল থেকে বামেদের এই বই-বিপণি নাগেরবাজারে চলছে বলে জানান বিপুল। তবে এমন ঘটনা কখনও ঘটেনি বলে জানালেন তিনি। সেই ১৯৭৯ থেকেই নাগেরবাজারের বামেদের বই-বিপণির সঙ্গে যুক্ত বিপুল। নিজে বিয়ে করেননি। জানালেন, ‘হোলটাইমার’ হিসেবে সর্বক্ষণ মানুষের সঙ্গে থাকেন তিনি। নিজে কী বই পড়েন সারা বছর? বিপুল বললেন, ‘‘লালন ফকির, শাহ আব্দুল করিমের বই পড়ি। বাংলাদেশের বই পড়ি। সেই সঙ্গে রামায়ণ-মহাভারত, দেশের মনীষীদের কথা পড়ি। মার্কসবাদ যতটুকু অনুধাবন করতে পারি ততটুকু পড়ি।’’ বইয়ের প্রতি এই ভালবাসা থেকেই তিনি বই-বিপণিতে আক্রমণে উদ্যত যুবকদের অনুরোধ করে তাঁদের নিরস্ত করতে চেয়েছিলেন। বিপুল বললেন, ‘‘এতে কী হবে তা বড় কথা নয়। সে তো সময় বলবে। তবে আমরা যারা বই পড়ে বড় হয়েছি, যে শিক্ষা পেয়েছি তারই বশবর্তী হয়ে, যেটা যখন করা দরকার সেটা করেছি।’’
প্রতিবাদ করেছেন বহরমপুরের চিকিৎসক, চক্ষু-বিশেষজ্ঞ অশোককুমার ভকতও। জানালেন, বিভিন্ন বই-বিপণি থেকে প্রায় ৬০ হাজার টাকার বই কিনে পুজো দেখতে আসা তরুণদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন তিনি। অশোক বলেন, ‘‘আমার প্রতিবাদ কোনও রাজনীতি বা কোনও দলের সঙ্গে যুক্ত কারও বিরুদ্ধে নয়। বইয়ের উপর আক্রমণের বিরুদ্ধে এটা আমার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, নীরব প্রতিবাদ।’’
বইকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পথ সুগম করতে এমন নাগরিক সহায়তার টুকরো ছবি ধরা পড়েছে রাজ্য জুড়েই। কলকাতার কসবায় বামেদের বই-বিপণী করতে অনুমতির সমস্যা হওয়ায় নিজের গ্যারাজে সেই বিপণি করতে দিয়েছেন মিলন বন্দ্যোপাধ্যায় নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি। এমন আবহে বই পড়ার ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে আশার কথা শোনালেন দমদমের বিপুল। তিনি বললেন, ‘‘মাঝে একটু কমেছিল। কিন্তু আমার মনে হয়, তরুণ প্রজন্ম আবার বই পড়ছে। তারা বিভিন্ন ধরনের বই পড়ছে। সেটা আমার কাছেখুব আশাব্যঞ্জক।’’