Advertisement
E-Paper

নজরে ত্রুটি, দায়ের ভাগী দূষণ পর্ষদও

চিঠিটা পাঠিয়েছিলেন এক প্রাথমিক স্কুল-শিক্ষক। সুতি থেকে। মুর্শিদাবাদের সেই সুতি। পিংলার বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে মৃত নাবালক শ্রমিকদের অধিকাংশের বাড়ি যেখানে। রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের জন অভিযোগ সেলে পাঠানো চিঠিতে প্রেরক অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর পাড়ায় অবৈধ শব্দবাজির কারখানা রমরমিয়ে চলছে। হামেশা বিকট শব্দে বোমা-পটকা ফাটিয়ে চলছে ‘টেস্টিং।’ প্রতিবাদ করতে গিয়ে শব্দবাজির কারবারিদের হুমকিতে গ্রামছাড়া হয়ে তাঁকে ফরাক্কায় এসে আশ্রয় নিতে হয়েছে।

সুরবেক বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ১০ মে ২০১৫ ০৩:০২

চিঠিটা পাঠিয়েছিলেন এক প্রাথমিক স্কুল-শিক্ষক। সুতি থেকে।

মুর্শিদাবাদের সেই সুতি। পিংলার বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে মৃত নাবালক শ্রমিকদের অধিকাংশের বাড়ি যেখানে। রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের জন অভিযোগ সেলে পাঠানো চিঠিতে প্রেরক অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর পাড়ায় অবৈধ শব্দবাজির কারখানা রমরমিয়ে চলছে। হামেশা বিকট শব্দে বোমা-পটকা ফাটিয়ে চলছে ‘টেস্টিং।’ প্রতিবাদ করতে গিয়ে শব্দবাজির কারবারিদের হুমকিতে গ্রামছাড়া হয়ে তাঁকে ফরাক্কায় এসে আশ্রয় নিতে হয়েছে।

ঘটনাটা নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকের। তত দিনে পশ্চিমবঙ্গে শব্দবাজি নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে। তা সত্ত্বেও দক্ষিণ ২৪ পরগনার চম্পাহাটি, হাড়াল, নুঙ্গি, মহেশতলা, বজবজ কিংবা হাওড়ার বাগনানের মতো বিভিন্ন জায়গায় যে ঢালাও শব্দবাজি তৈরি হচ্ছে, পর্ষদ তা জানত। কিন্তু সুতির কথাটা জানা ছিল না। জানার পরে সুতিতে পুলিশকে নিয়ে পর্ষদ অভিযান চালায়। বেশ কয়েক জন ধরা পড়ে, বাজেয়াপ্ত হয় বিস্তর নিষিদ্ধ বাজি। পাশাপাশি প্রতিবাদী শিক্ষককে নিরাপত্তা দিয়ে গ্রামে ফেরানো হয়।

শুধু সুতি নয়। পর্ষদ-সূত্রের খবর, ২০০১-এ উত্তর ২৪ পরগনার নীলগঞ্জে শব্দবাজির কারখানা ও তার বিপুল উৎপাদনের হদিস মিলেছিল সাধারণ মানুষের পাঠানো চিঠি মারফত। পরের বছর ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের চিঠির সুবাদেই পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড় ও হুগলির ডানকুনি-চণ্ডীতলায় শব্দবাজির কারখানা-গুদামের খোঁজ মেলে। একই ভাবে হাওড়ার কদমতলায় ফাঁস হয় ‘জলবোমা’ কারখানার অস্তিত্ব।

পিংলা-কাণ্ডের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, ওখানে বারোটি প্রাণ কেড়ে নেওয়া অবৈধ বাজি কারখানাটি এত দিন ধরে প্রকাশ্যে চললেও পুলিশ কী করছিল? রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদও যে দায় এড়াতে পারে না, তা একান্তে মানছেন পর্ষদ-কর্তাদের একাংশ। ওঁদের বক্তব্য, বাজির কারখানা চালু করতে হলে সর্বাগ্রে অনুমতি নিতে হয় এক্সপ্লোসিভ ডিপার্টমেন্ট থেকে, জেলার ক্ষেত্রে যে বিভাগের বকলমে অনুমোদনপত্রে সই করেন জেলাশাসক। তার পরে দমকলের সম্মতি। সে সব দেখে এবং পরিবেশরক্ষার বিভিন্ন শর্ত পূরণ হচ্ছে কি না যাচাই করে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ অনুমোদন মঞ্জুর করে।

‘‘কাজেই পর্ষদের একটা দায়িত্ব থেকে যাচ্ছে’’— বলছেন পর্ষদের এক বিজ্ঞানী। ওঁর মন্তব্য, ‘‘পিংলার ব্রাহ্মণবাড়ের কারখানাটিতে বাজির আড়ালে বোমা তৈরি হতো কি না, তা পরের কথা। কিন্তু তৈরি হওয়া বাজিগুলোই বেআইনি। কারণ, এ রাজ্যে শব্দবাজি তৈরি, বিক্রি, চালান, ব্যবহার— সব নিষিদ্ধ।’’

বস্তুত রাজ্যে চোরাগোপ্তা কোথাও শব্দবাজি তৈরি হচ্ছে কি না, পুলিশের সঙ্গে পর্ষদেরও সে দিকে নজর রাখার কথা। তাই পিংলার কারখানার অস্তিত্বের আঁচ না-পাওয়াটাকে পর্ষদেরও ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন অনেকে। পর্ষদের চেয়ারম্যান কল্যাণ রুদ্র লোকাভাবের কথা জানিয়ে বলেন, ‘‘পুলিশের এক জন এডিজি-র পদ পর্ষদে রয়েছে। গত আড়াই বছর ইস্তক পদটি ফাঁকা!’’

অথচ ওই এডিজি-র মাধ্যমেই পুলিশের সঙ্গে পর্ষদের সমন্বয় রক্ষা করার কথা। ২০১২-র নভেম্বর থেকে ওই পদে যেমন কোনও পুলিশ অফিসারকে বহাল করা হয়নি, তেমন গত সাড়ে তিন-চার বছর ধরে পর্ষদের জন অভিযোগ বিভাগটিকেও কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ।

প্রশ্ন উঠেছে, রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের মতো দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদকেও কি ঠুঁটো করে রাখতে চাইছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার?

পর্ষদের অবসরপ্রাপ্ত মুখ্য আইন-আধিকারিক বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠেও হতাশার সুর। তিনি জানাচ্ছেন, দূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ফি জেলায় এক জন ডিএসপি-কে নোডাল অফিসার করা হতো, যাঁর সঙ্গে পর্ষদের আধিকারিকেরা মাসে অন্তত এক বার বসে বেআইনি বাজি কারখানার মতো বহু বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদান করতেন। আগে অনেক পুলিশ অফিসারও পর্ষদ অফিসে নিয়মিত আসতেন পরিবেশ-আইন সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ নিতে। তাঁদের সঙ্গেও তথ্য বিনিময় হতো। ‘‘সে সবের পাট চুকে গিয়েছে!’’ আক্ষেপ বিশ্বজিৎবাবুর। এ-ও বলছেন, ‘‘বহু শব্দবাজি কারখানার অস্তিত্ব আমরা টের পেয়েছিলাম জন অভিযাগ সেলে আসা চিঠি মারফত। আমজনতাই উপযাচক হয়ে খবর দিয়েছেন। সেই মতো ব্যবস্থা হয়েছে।’’

জন অভিযোগে আগের মতো গুরুত্ব দেওয়ার সামর্থ বা সদিচ্ছা এই মুহূর্তে পর্ষদের আছে কি না, সংস্থার প্রাক্তন ও বর্তমান কর্তাদের একাংশ সে বিষয়ে সন্দিহান।

বিশ্বজিৎবাবুর দাবি, ‘‘হতে পারে, স্থানীয় পুলিশের একাংশের সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়ের বাজি কারখানার মালিকের যোগসাজস ছিল। কিন্তু আগে এমন অনেক খবর আমরা সল্টলেকে বসেই স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে পেয়েছি।’’

পর্ষদ-কর্তাদের একাংশ বলছেন, দুর্গাপুজো, কালীপুজো, ছটপুজো তো বটেই। ইদানীং গণেশ পুজো, আইপিএল, ভোটের বিজয়োৎসব এমনকী বিয়ে-মুখেভাতেও দেদার ফাটছে নিষিদ্ধ শব্দবাজি। তাই পর্ষদের তরফে বছরভর অভিযান জরুরি। বাস্তবে কি তা হওয়ার আশা আছে?

কল্যাণবাবু বলছেন, ‘‘সমস্যার পরিধি বাড়লেও পর্ষদে অসুবিধে প্রচুর। তবে পিংলার ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক। দেখছি, কী ভাবে অভিযান চালানো যায়।’’

surabek biswas pollution control board pingla blast disaster poor loose survillance illegal firecracker factories firecracker cottage industry

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy