প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর পাঁচ সপ্তাহ হয়ে গেল, নির্বাচন কমিশনের কাছে এখনও ঝুলে রয়েছে ‘আসল তৃণমূলের’ চাবি। এই পরিস্থিতিতে গত কাল নির্বাচন কমিশনকে দ্বিতীয় চিঠি দিয়ে তৃণমূলের আসল দাবিদার সংক্রান্ত তদন্তের ইতি টানতে অনুরোধ করলেন নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সঙ্গে আমডাঙার বিধায়ক পিরজাদা কাশেম সিদ্দিকীর মুখ্য নির্বাচন কমিশনকে ২৫ অগস্ট লেখা একটি ইমেল-এর প্রতিলিপিও তাঁর চিঠির সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন তিনি। ওই ইমেলে সিদ্দিকী জানিয়েছিলেন, গত ২২ জুন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়রা কলকাতার নিউ টাউনের একটি হোটেলে তৃণমূলের যে ‘বিশেষ অধিবেশন’ ডেকেছিলেন, তার কোনও বিজ্ঞপ্তি দলের বিধায়ক এবং সংশ্লিষ্ট সদস্যদের দেওয়া হয়নি। ওই অধিবেশনের বিভিন্ন বেআইনি প্রক্রিয়াগত দিকের কথা তুলে ধরেছিলেন সিদ্দিকী। গত কাল তাঁর লেখা চিঠিতে এই বিষয়টির উল্লেখ করেছেন মমতা।
এর আগে ২৯ জুলাই কমিশনেকে চিঠি দিয়েছিলেন মমতা। তাঁর বক্তব্য, তৃণমূলের আসল দাবিদার সংক্রান্ত তদন্তের সময়সীমা শেষ। যত দ্রুত সম্ভব তা গুটিয়ে ফেলা হোক। কারণ, রাজ্যের রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়ছে। তৃণমূলের নাম, প্রতীক এবং তহবিলের অধিকার চেয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবির, নিজেদের দলীয় গঠনতন্ত্র ও সাংগঠনিক নির্বাচনের বিস্তারিত তথ্য জমা দেওয়ার জন্য বাড়তি ১৫ দিন চেয়েছিল কমিশনের কাছে। যার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে ২৫ জুলাই। তিন বার সময় দিয়েও ঋতব্রত শিবির তাদের তথ্য-সহ চিঠিজমা দিতে পারেনি। অথচ তৃণমূল তাদের তথ্য জমা দিয়েছে কমিশনের দেওয়া সময়সীমাকে মান্যতা দিয়ে।
রাজনৈতিক মহলে চর্চা, আর ঝুলিয়ে না রেখে আগামী দিন দশেকের মধ্যেই বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে পারে কমিশন। রাজনৈতিক শিবিরের একাংশের বক্তব্য, তৃণমূলের নাম, প্রতীক, তহবিল যদি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকেই যায়, তা হলে তার প্রভাব পড়বে দিল্লিতে এনসিপিআই-এর কুড়ি জন লোকসভা সাংসদের পরিস্থিতিতে। আপাতত স্পিকারের অফিস থেকে চিঠি লিখে তাঁদের কাছে বক্তব্যজানতে চাওয়া হয়েছে।
তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে নোটিস জারি করেছে সুপ্রিম কোর্ট। ঘটনাহল, এনসিপিআই-তে যোগ দিলেও এখনও খাতায় কলমে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায়রা তৃণমূলেরই সাংসদ হিসাবে গণ্য হচ্ছেন। যদি ঋতব্রত বাহিনী তৃণমূলের নাম এবং প্রতীক পেয়ে যায়, তা হলে এনসিপিআই-এর উপর থেকে চাপ অনেকটাই কেটে যাবে। এনসিপিআই সূত্রের খবর, তাঁরা আর তৃণমূলে ফিরতে চাইছেন না, বিজেপির শরিক হিসেবেইথাকতে চাইছেন।
ঋতব্রতরা তৃণমূলের রাজনৈতিক মালিকানা পেলে তাদের সঙ্গে এই কুড়ি জন লোকসভা সাংসদের বোঝাপড়া অনেকটাই মসৃণ হবে, সেটাই স্বাভাবিক। কারণ ঋতব্রতপন্থী এবং এই কুড়ি জনের রাজনৈতিক পদক্ষেপ আলাদা হলেও সিদ্ধান্ত কার্যত একই ছিল— মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব থেকে বিদ্রোহ করে বেরিয়ে আসা। সে ক্ষেত্রে তৃণমূলের হাতবদল ঘটলে, হয় নতুন তৃণমূল নেতৃত্ব এনসিপিআই-এর উপর থেকে মামলা তুলে, তাদের দলত্যাগ বিরোধী আইন থেকে মুক্তি দেবে, অথবা এই কুড়ি জনকে বিজেপি চাইলে সরাসরি তাদের সঙ্গে মিশিয়ে সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারে। যদিনির্বাচন কমিশনের রায় ঋতব্রতদের বিরুদ্ধে যায়, তা হলে এই কুড়ি সাংসদের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলার বিষয়টি চালিয়ে যাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দল। কমিশনের সিদ্ধান্ত সম্পর্কেজানতে চাওয়া হলে তৃণমূলের রাজ্যসভার নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন বলেন, ‘‘আমরা একটি বইয়ের উপর আস্থা রাখি। তা দেশের সংবিধান।’’