মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ এবং ‘বৈধ’ ভোটারদের নাম ফেরানোর দাবিতে আন্দোলনে রাজনৈতিক রঙের বিচার করতে চান না বলে জানালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি-বিরোধী সব দলকে একজোট করার কথা বললেন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবিও। আর পশ্চিমবঙ্গে দুই বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচনের প্রচারের মাঝেই মমতা এবং বেবির পত্রালাপ ও ফোনালাপ ঘিরে তৈরি হওয়া ‘বিভ্রান্তি’ কাটাতে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম স্পষ্ট করে দিলেন, মমতা-তৃণমূলের সঙ্গে কোনও নির্বাচনী বোঝাপড়ার কথা ভাবছেন না তাঁরা।
জ্ঞানেশের অপসারণের দাবি এবং কমিশন সংক্রান্ত প্রতিবাদ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে চিঠি বিনিময়ের পরে মমতা ফোনও করেছিলেন বেবিকে। সেই প্রসঙ্গ তুলেই শ্রীরামপুরে শনিবার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বলেছেন, ‘‘সিপিএমের নেতা এম এ বেবি চিঠি লিখেছেন। আমি জবাব দিয়েছি। রাহুল গান্ধীর সঙ্গেও কথা বলেছি। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে মিটিং (‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের বৈঠক হবে।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘প্রশান্ত ভূষণ, যোগেন্দ্র যাদবরা আন্দোলনে নেমে পড়েছেন। আমরা মহুয়াকে পাঠিয়েছি (যন্তর মন্তরে শুক্রবার)। কে করছে, তা দেখব না। বিষয়টা দেখব। কোন রং, কোন পার্টি দেখব না। মুম্বইয়েও শুরু হচ্ছে আন্দোলন। আমরা ঐক্যবদ্ধ ভাবে লড়াই করব। কে লাল, কে নীল দেখার দরকার নেই।’’
পাশাপাশিই সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক বেবি বলেছেন, ‘‘আমরা চিঠি পাঠানোর পরে মমতা যোগাযোগ করেছিলেন। ফোনে কথা হয়েছে। বিরোধী সব রাজনৈতিক শক্তিকে এক জায়গায় আনার প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়েছেন তিনি।’’
এর পরে তা হলে বাংলায় সিপিএম এবং মমতা-তৃণমূল কাছাকাছি আসছে কি না, উপনির্বাচনের মাঝেই সেই প্রশ্ন উঠে গিয়েছে বাম শিবিরের অন্দরে। বাংলায় মমতা-রাজের পতনের পরে বিজেপি-বিরোধী পরিসরে বামেদের উত্থানের যে চর্চা বাম শিবিরে চলছে, ফোনালাপের জেরে তাতে ছন্দপতনের আশঙ্কাও দেখছে বাম শিবিরের একাংশ। আর বিজেপি এই সুযোগে ‘দুই হিন্দু-বিরোধী শক্তি’র আঁতাঁতের তত্ত্ব তুলে ফেলেছে। এই প্রক্ষিতে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক ও পলিটব্যুরো সদস্য সেলিম বলেছেন, ‘‘দেশের সংবিধান আক্রান্ত, সাংবিধানিক সংস্থা নির্বাচন কমিশন আক্রান্ত। জ্ঞানেশ কুমার জ্ঞানত বা অজ্ঞানতাবশত, ঘুষের বিনিময়ে বা তাঁর উপরওয়ালাদের নির্দেশ যে ভাবে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কেড়েছেন, তার প্রতিবাদ করার লক্ষ্যে আমাদের দলের সাধারণ সম্পাদক অ-বিজেপি বিভিন্ন দলকে চিঠি দিয়েছেন। মমতাকেও দিয়েছেন, মমতা জানিয়েছেন, তিনি সঙ্গে আছেন। ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের শরিকেরা ইতিমধ্যেই সক্রিয়, তার বাইরের বিরোধী দলগুলিকেও বার্তা দেওয়া হচ্ছে। তার মানে তৃণমূলের বা মমতার সঙ্গে কোনও জোট বা ভোট নয়।’’
এর জেরে পশ্চিমবঙ্গে কী হবে? সেলিমের ব্যাখ্যা, ‘‘জরুরি অবস্থার মোকাবিলায় অতীতেও জাতীয় স্তরে নানা দল ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বিজেপির যখন কিছুই নেই এই রাজ্যে, জোট করে লড়ে তাদের সাংসদ, ডেপুটি মেয়র নানা কিছু পাইয়ে দিয়েছিলেন তৃণমূল নেত্রী। সে সব আমরা ভুলিনি। কিন্তু রাজনীতি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। এখন বিজেপির বিরুদ্ধে আমরা লড়ছি। রাস্তার আন্দোলনে কাউকে বাধা দেওয়া যায় না। মমতাও রাস্তায় বেরোন, তাঁর কমী-সমর্থকদের উজ্জীবিত করুন। এর মানে এই নয় যে, সিপিএম জোট করতে যাচ্ছে!’’
কলকাতায় তাঁর লেখা একটি বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে সেলিম ও প্রবীণ নেতা বিমান বসুর উপস্থিতিতে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ‘‘আমরা বারবার বলেছি, দেশের ক্ষেত্রে বিজেপির বিরুদ্ধে সবাইকে একজোট হতে হবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বিজেপি এবং তৃণমূল, দুইয়ের বিরুদ্ধেই লড়তে হবে। কারণ, বিজেপি-কে ঘাড়ে করে নিয়ে এসেছে তৃণমূল।’’ মমতা ক্ষমতা হারানোর পরে তাঁর ‘তাগিদ’ আরও বেশি বলে মনে করিয়ে দিয়েও কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীর চৌধুরী বলেছেন, বিরোধী দলগুলির শীর্ষ নেতৃত্ব এই ব্যাপারে যা করার, করছেন।