সব কিছু ঠিকঠাক চললে, রাজ্যে পুরভোট আগামী নভেম্বরে। কিন্তু নগরের বাঁকে বাঁকে, দেওয়ালে দেওয়ালে ঘাসফুল প্রতীক হয়তো দেখা যাবে না। দেখা যাবে না, ঘাসফুলের তলায় লেখা, ‘এই চিহ্নে ভোট দিন।’ কারণ, ঘাসফুল চিহ্নের স্বত্বাধিকারী ঠিক করতে আরও চার মাস লেগে যাবে! এমনই জানাল সুপ্রিম কোর্ট।
অন্য দিকে, বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ ঘাসফুল প্রতীকে জেতা ১০ বিধায়কের বিধায়কপদ খারিজের আর্জি জানিয়েছিল মমতা শিবির। সেই মামলায় বিধানসভার স্পিকারের জন্য সময়সীমা বেঁধে দিল না সুপ্রিম কোর্ট।
ফলত, একই দিনে দুই মামলাতেই প্রাথমিক ভাবে ধাক্কা খেল কালীঘাট তৃণমূল বা মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস।
নাম-প্রতীকের যুদ্ধ
মুর্শিদাবাদের রেজিনগর এবং পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে উপনির্বাচনের জন্য তৃণমূলের দুই শিবিরকে আলাদা নাম এবং প্রতীক দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ‘ফ্রিজ়’ করা হয়েছে ঘাসফুল চিহ্ন। বদলে মমতা-অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রার্থীর প্রতীক হয় বল পায়ে ফুটবলার। ঋতব্রত শিবির অর্থাৎ গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস পায় খাম। সেই প্রতীক নিয়ে আইএসএফের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছে। এর মাঝে ঘাসফুল নিয়ে মামলার শুনানি হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চে। দীর্ঘ সওয়াল-জবাবের পর শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, ‘তৃণমূল’ নামের ব্যবহার এবং ‘জোড়াফুল’ প্রতীক কারা পাবে, তা চার মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করবে নির্বাচন কমিশন। সেই সঙ্গে প্রতীক নিয়ে দুই তৃণমূলের বক্তব্য শোনার কাজও শেষ করতে হবে চার সপ্তাহের মধ্যে। অর্থাৎ, ‘তৃণমূল’ নাম এবং ‘ঘাসফুল’ প্রতীক কার হবে, তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে নিতে নতুন বছর এসে যাবে।
সোমবারের শুনানিতে মমতা তৃণমূলের আইনজীবী কপিল সিব্বল এবং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতীক সংক্রান্ত বিষয়টির দ্রুত নিষ্পত্তি চেয়ে আদালতে আর্জি জানিয়েছিলেন। কমিশনের কাছে দু’পক্ষের সওয়াল-জবাব প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে কি না, জানতে চায় প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। মমতা তৃণমূল তাতে সম্মতিসূচক উত্তর দিয়েছে। তবে ঋতব্রত তৃণমূলের তরফে আইনজীবী মুকুল রোহতগি কমিশনকে তাদের বক্তব্য জানানোর জন্য ছ’সপ্তাহ সময় চেয়েছেন। আদালত জানিয়ে দেয়, চার সপ্তাহের মধ্যে ওই কাজ করে ফেলতে হবে। তার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তিন মাস সময় পাবে কমিশন।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী নির্দেশে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল, ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং জোড়াফুল প্রতীক ‘ফ্রিজ়’ করছে তারা। তৃণমূলের ‘জোড়াফুল’ আপাতত তাদের সিন্দুকে জমা রাখা হচ্ছে। দল কার, আসল তৃণমূল কে, দলের তহবিলের মালিকানা কোন গোষ্ঠীর, সেই সমস্ত বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার পর সিন্দুকের তালা খুলবে। তার পর ৬ অক্টোবর রাজ্যের দুই কেন্দ্রের উপনির্বাচনের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন তিন বারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। মামলা করেন কমিশনের বিরুদ্ধে। মামলায় পক্ষ করেন বিরোধী দলনেতা ঋতব্রতকে। দ্রুত শুনানির আর্জি জানান মমতার আইনজীবী সিব্বল। গত বৃহস্পতিবার প্রথম শুনানিতে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ কমিশনের উদ্দেশে বলেছিল, একটি যুক্তিসঙ্গত সময়সীমা বলতে। যেই সময়ের মধ্যে দু’পক্ষই তাদের প্রমাণ এবং বক্তব্য পেশ করার ঠিকঠাক সুযোগ পাবে। আবার দীর্ঘসূত্রিতাও থাকবে না।
সোমবার নিজেদের বক্তব্য জানিয়েছে কমিশন। তার পর ‘তৃণমূল’ নাম ব্যবহার এবং প্রতীক নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কমিশনকেও সময়সীমা বলে দিল সুপ্রিম কোর্ট। এই নির্দেশের ফলে জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে যে আইনি লড়াই এবং সাংগঠনিক টানাপড়েন চলছে, তা পুরভোটের আগে শেষ হবে না। তবে জরুরিকালীন সিদ্ধান্ত যদি নিতেই হয়, সেক্ষেত্রে বিষয়টি শীর্ষ আদালতকে জানাবে কমিশন।
আরও পড়ুন:
বিধায়কপদ খারিজ
বিধানসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের মাসখানেকের মধ্যে তৃণমূলের অন্দরে শুরু হয় তীব্র টানাপড়েন। উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে কয়েক জন বিধায়ক মমতা-অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। শুধু তা-ই নয়, মূল তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় প্রতীক ও তহবিলেরও ভাগ দাবি করেন। শেষমেশ গত ৮ জুলাই ‘বিদ্রোহী’ ঋতব্রত-সহ ১০ বিধায়কের বিরুদ্ধে দলত্যাগ-বিরোধী আইন প্রয়োগ করে পদ বাতিলের আর্জি নিয়ে বিধানসভার স্পিকারের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। তার পর দীর্ঘ দিন কেটে গিয়েছে। কিন্তু স্পিকার কোনও সিদ্ধান্ত নেননি। বিলম্ব দেখে আদালতের হস্তক্ষেপ চান মমতা তৃণমূলের বিধায়ক।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এই বিষয়টিও এনসিপিআই নামক ‘অচেনা’ দলে চলে যাওয়া ২০ সাংসদের বিরুদ্ধে মামলার মতো দীর্ঘায়িত হতে চলেছে। সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ জানিয়েছে, ২০২০ সালে সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ে বলা হয়েছে, কোনও বিধায়কের বিরুদ্ধে দলত্যাগ-বিরোধী আইন বা বিধায়কপদ খারিজ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা স্পিকারের হাতে রয়েছে। এর জন্য স্পিকারকে উপযুক্ত সময় দেওয়া হবে।
সাধারণত তিন মাসের মধ্যে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। স্পিকার সেই সময়ের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আশাপ্রকাশ করছে শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ জানায়, এই মামলায় নতুন করে আর কোনও নির্দেশ দেওয়া হবে না। মমতা তৃণমূলের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “তিন মাসের মধ্যে স্পিকারকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।” স্পিকার ওই সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত না-নিলে তাঁরা কি আবার আদালতের দ্বারস্থ হবেন? খোলসা করেননি শ্রীরামপুরের সাংসদ।
উল্লেখ্য, এর আগে হাই কোর্টে মমতা তৃণমূল বলেছিল, কয়েক জন বিধায়ক আলাদা গোষ্ঠী তৈরি করে দলের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারেন না। বহিষ্কৃত কাউকে বিরোধী দলনেতা করা আইনসঙ্গত নয়। কারণ, বিরোধী দলনেতা নির্বাচিত হওয়ার আগেই দলবিরোধী কাজের অভিযোগে ঋতব্রতকে বহিষ্কার করেছিল তৎকালীন অবিভক্ত তৃণমূল। কিন্তু বিরোধী দলনেতা বাছাইয়ে স্পিকারের সিদ্ধান্তের উপর কোনও অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেয়নি কলকাতা হাই কোর্ট।