রাজ্যে সরকার পোষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি সংক্রান্ত নতুন সংশোধিত বিল নিয়ে শিক্ষাজগতে আশঙ্কার আবহে এ বার বিশ্ববিদ্যালয়গুলির আচার্য তথা রাজ্যপাল রবীন্দ্রনারায়ণ রবির শরণাপন্ন হলেন রাজ্যের প্রথম সারির শিক্ষাবিদদের একাংশ। বিলটি কার্যকর হয়ে নতুন বদলি নীতির রূপায়ণ ঘটলে তা রাজ্যের প্রাচীন ও প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পরিচালন ব্যবস্থায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে বলে তাঁদের দাবি। সেই সঙ্গে আনকোরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির জন্যও ছিটেফোঁটা কল্যাণসাধন করবে না। জোরালো স্বরে এই মত ব্যক্ত করে শিক্ষাবিদদের তরফে আচার্যকে প্রস্তাবিত বিলটিতে সায় না দিতে অনুরোধ করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সংশোধনী বিলটি বিধানসভায় পাশ হলেও এখনও রাজ্যপালের কাছে পাঠানো হয়নি। বিলটির বিরোধিতায় যুক্তি দিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সুপরিচিত অধ্যাপকদের ব্যাখ্যা, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েরই স্বকীয় সত্তা, কাঠামো এবং পঠনপাঠন কর্মসূচি থাকে। ইচ্ছেমতো অধ্যাপকদের একটি থেকে আর একটিতে সরালে এই কাঠামোগত ভারসাম্য এবং গবেষণার কাজ ধাক্কা খাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম এবং গবেষণার কর্মসূচি নির্দিষ্ট করার পরে সেই অধ্যাপকদের যত্র তত্র বদলিতে তাঁদের আহরণ করা পরিকাঠামো, পরীক্ষাগার বা গ্রন্থাগারের সম্পদের সদ্ব্যবহার হবে না, গবেষকেরাও সমস্যায় পড়বেন। প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর হিসেবে দক্ষ অধ্যাপকদের উপস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তঃবিষয়ক গবেষণায় যে পৃষ্ঠপোষকতা সুনিশ্চিত করত তারও ক্ষতি হবে বলেই মত আবেদনকারী শিক্ষাবিদদের। দফা রফা হবে উৎকর্ষ চর্চার। আবার অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বেহাল পরিবেশেও সেই শিক্ষকদের মেধা ও কার্যকারিতার প্রতি সুবিচার করা যাবে না।
শিক্ষাবিদেরা আচার্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যে, প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিই এখন শয়ে শয়ে শূন্য পদে কাহিল। তাদের পরিকাঠামো এবং মানবসম্পদের খামতি আগে পূরণ করা দরকার।
রাজ্যের নবীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পরিকাঠামোর দুর্দশা নিয়ে নানা মহলে আক্ষেপ উঠে এসেছে। প্রবীণ অধ্যাপকদের মতে, আগে সেখানকার পরিকাঠামো ঠিক করা হোক। অন্য জায়গার অধ্যাপকদের আলটপকা বদলির মাধ্যমে পিছিয়ে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির রাতারাতি হাল ফেরানো অসম্ভব।
এই দিকগুলির উল্লেখ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধিকারের মতো মৌলিক বিষয়ও মনে করিয়েছেন প্রবীণ শিক্ষাবিদেরা। কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বজ্রমুষ্টিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্থ স্বাভাবিক বিকাশের পথই রুদ্ধ হবে বলে তাঁদের মত। চিঠিটিতে স্বাক্ষর করেছেন ১৫ জন খ্যাতনামা অধ্যাপক, গবেষক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন যাদবপুরের ইমেরিটাস অধ্যাপক, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অমিতা চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন পালিত অধ্যাপক, প্রয়াগরাজের হরিশ্চন্দ্র রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর প্রাক্তন অধিকর্তা, পদার্থবিদ অমিতাভ রায়চৌধুরী, আইআইএম কলকাতায় অর্থনীতির প্রাক্তন অধ্যাপক অনুপ সিংহ, যাদবপুরের অবসরপ্রাপ্ত রাজা রামান্না চেয়ার প্রফেসর, আইআইটি খড়্গপুরের কম্পিউটার সায়েন্সের প্রাক্তন অধ্যাপক, এনআইটি দুর্গাপুরের প্রাক্তন অধিকর্তা অনুপম বসু, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং ম্যাকাউটের প্রাক্তন উপাচার্য অশোকরঞ্জন ঠাকুর, সেন্টার ফর স্টাডিজ় ইন সোশাল সায়েন্সেস, কলকাতার প্রাক্তন অধিকর্তা পার্থ চট্টোপাধ্যায়, আইএসআইয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং প্রাক্তন ন্যাশনাল সায়েন্স চেয়ার প্রফেসর পার্থপ্রতিম মজুমদার, রবীন্দ্রভারতীর প্রাক্তন উপাচার্য সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী, টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও প্রাক্তন অধিকর্তা, পদার্থবিদ সব্যসাচী ভট্টাচার্য, যাদবপুরের রসায়নের প্রাক্তন অধ্যাপক, ভাটনগর পুরস্কারজয়ী সমরেশ ভট্টাচার্য, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এসএন ব্যানার্জি অধ্যাপক শোভনলাল দত্ত গুপ্ত, যাদবপুরের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ও সহ-উপাচার্য সিদ্ধার্থ দত্ত, যাদবপুরের দুই ইমেরিটাস অধ্যাপক সুকান্ত চৌধুরী এবং সুপ্রিয়া চৌধুরী।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথে সুভাষচন্দ্র বসুর উদ্ধৃতি। ছবি: সুমন বল্লভ।