নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি ছিল দেড় হাজার টাকার ‘লক্ষ্মীর ভান্ডারে’র দ্বিগুণ টাকা পাবেন রাজ্যের মহিলারা। কিন্তু নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরে বারেবারেই সমস্যা দেখা দিচ্ছে মহিলাদের মাসিক ভাতা নিয়ে। ফলে, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ উঠছে সরকারের বিরুদ্ধে। এর মোকাবিলায় বিধায়কদের এলাকায় নামিয়ে মানুষের ক্ষোভ প্রশমন ও বিরোধীদের প্রচার ভোঁতা করার চেষ্টা চালিয়ে ছিল বিজেপি। কিন্তু সেই প্রয়াসও কতটা সফল হয়েছে, সেই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে দলেই।
অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে ক্রমেই ক্ষোভ বাড়ছে রাজ্যের মহিলাদের মধ্যে। পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে সরকারের ‘সদিচ্ছা’ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই আবহে দলের মধ্যেও প্রশ্ন উঠছে জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়ে। পঞ্চায়েত, পুরসভা না-থাকায় সরকারি প্রকল্প নিচু তলায় পৌঁছনোর মূল দায়িত্ব ছিল বিধায়কদের উপরে। সূত্রের খবর, সরকারের তরফে পেন ড্রাইভের মাধ্যমে বিধানসভা ধরে ধরে এই সংক্রান্ত তথ্য পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল বিধায়কদের কাছে। তাঁদের বলা হয়েছিল, ‘যোগ্য’ বা ‘অযোগ্যে’র তালিকার ক্ষেত্রে স্থানীয় স্তরে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করতে। কিন্তু তাতেও এখনও পর্যন্ত পরিস্থিতির বদল হয়নি।
রাজ্য জুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে থাকায় বিধায়কদের সক্রিয় হওয়ার জন্য নতুন করে বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রের খবর। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শনিবারই তাঁর বিধানসভা কেন্দ্র ভবানীপুরে বলেছেন, ‘‘যোগ্য আবেদনকারীরা সকলেই অন্নপূর্ণার টাকা পাবেন। কোনও সংশয় নেই। যাঁরা ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আবেদন করেছিলেন, তাঁদের কোনও সমস্যা হয়ে থাকলে পোর্টালে জানাতে পারবেন। সকলে পোর্টালে অভ্যস্ত নন, স্থানীয় বিধায়ক, মণ্ডল, ওয়ার্ড কমিটি, মহিলা মোর্চার কর্মীরা তাঁদের সাহায্য করবেন।’’
সমস্যা ইতিমধ্যেই অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে শাসক শিবিরের বিধায়কদের একাংশের দাবি। ভাতারের বিজেপি বিধায়ক সৌমেন কার্ফা যেমন দাবি করছেন, ‘‘এক একটি বিধানসভায় অন্তত পাঁচ লক্ষ মহিলা থাকেন। প্রথম বারের পরে বিডিও দফতর বা অন্য সরকারি দফতরে হাজার হাজার মহিলা বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন। এখন বড়জোর ৫০-১০০ জন বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। তাও সেটা হচ্ছে বামেদের মদতে। শতাংশের নিরিখে কতটুকু? আমরা নিশ্চিত করতে পারি, প্রত্যেক যোগ্য মহিলা অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাবেন। দু’মাস দেরি হতে পারে, কিন্তু কেউ বঞ্চিত হবেন না।’’
তবে বিজেপির একটা অংশ অবশ্য দলের বিধায়কদের সক্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। গঙ্গা পাড়ের এক পরাজিত বিজেপি প্রার্থীর অভিযোগ, ‘‘দলের বিধায়ক থেকে নেতৃত্বের কাজ সরকারের প্রকল্পগুলি যাতে মানুষের কাছে পৌঁছয়, সেটা দেখা। সরকারের ভাল কাজের প্রচার করা। তার বদলে হামলা, হুজ্জুতি, দখলদারি আর টাকা তোলায় ব্যস্ত অনেকে! কার সঙ্গে সেটিং করে কোন ক্লাব দখল করবে, কোন নির্মাণ ব্যবসায়ীকে হুমকি দিয়ে টাকা তুলবে, কোন বাহুবলীকে নিজের দিকে টেনে কোন গোডাউনের সিন্ডিকেট দখল করবে, সে সব নিয়ে ব্যস্ত!’’ তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘‘এই সুযোগে সিপিএম বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যাচ্ছে। তৃণমূল সাহস করে বাইরে বেরোচ্ছে না। পুর-নির্বাচনে বিজেপি-বিরোধী ভোট সিপিএমে পড়লে নেতাদের টনক নড়বে!’’
যদিও ব্যারাকপুরের বিজেপি বিধায়ক কৌস্তভ বাগচীর দাবি, ‘‘পুরো প্রক্রিয়াটাই সরকারি। দলের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। আমাদের বরং মনে হচ্ছে, প্রক্রিয়ার উপরে দলের নিয়ন্ত্রণ থাকলে ভাল হত।’’ তিনি এই অব্যবস্থার জন্য সরকারি কর্মচারীদের একাংশের ‘অন্তর্ঘাত’কে দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ‘‘তৃণমূল আমলের সরকারি কর্মচারীদের একাংশ ইচ্ছাকৃত ভাবে ভুল করছেন। এর ফলে যোগ্য অনেকে টাকা পাচ্ছেন না। অনেক কর্মচারী পুরনো আমলের পদ্ধতিতে কাজ করছেন। এর কারণে দেরি হচ্ছে। আমাদের উপরে সব দায় পড়ছে। প্রশাসনকে জানিয়েছি।’’ রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের মতে, ‘‘ক্ষোভ যে রয়েছে, এটা সত্যি। আমরা বিষয়টা দেখছি। কর্মী সঙ্কোচন রয়েছে। তার উপরে জনগণনার কাজ চলছে। তাই তথ্য আপলোড হতে দেরি হচ্ছে।’’
সরকারের বিরুদ্ধে ঝাঁঝ বাড়িয়েছে বিরোধীরাও। কালীঘাটপন্থী তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষের দাবি, ‘‘নির্বাচনের আগে বলা হয়েছিল যাঁরা ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ পেতেন তাঁরা সকলেই তিন হাজার টাকা পাবেন। এর জন্য পাড়ায় পাড়ায় ফর্ম পূরণ করানো হয়েছিল। যাঁরা ফর্ম পূরণ করালেন, এখন তাঁদের গিয়ে ধরা উচিত!’’