জমায়েত থেকে উস্কানি ও প্ররোচনামূলক বক্তব্য রাখার ফলেই পুলিশ এবং সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের আক্রান্ত হতে হয়েছে বলে রবিবার আদালতে দাবি করলেন সরকারি আইনজীবী। একাধিক ছবি ও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। শনিবার রাতে ১১ জনকে গ্রেফতারের পরে রাতভর তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ আরও তিন জনকে গ্রেফতার করেছে।
অভিযুক্তদের পক্ষের আইনজীবী জামিনের আবেদন করলেও তা এ দিন গুরুত্ব পায়নি। বিচারক ধৃতদের আগামী দু’দিনের জন্য পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। যদিও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই ঘটনায় নতুন পাশ হওয়া গুন্ডাদমন আইনে পদক্ষেপ করার কথা জানালেও আদালতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শোনা যায়নি। তবে অন্য একাধিক ধারার পাশাপাশি এই মামলায় সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর ও হিংসা রোধে তৈরি ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্যান্স অব পাবলিক অর্ডার’ আইনের ধারা যুক্ত করার আবেদন করা হয়েছে বলে আদালত সূত্রে খবর। এই ধারার বলে ক্ষতিপূরণ আদায় করারসংস্থান রয়েছে।
এ দিনও মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘যাদের ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, তারা গ্রেফতার হয়েছে। এদের সঙ্গে ককরোচ পার্টি, নিট আন্দোলনের কোনও সম্পর্ক নেই। এরা কেউ ছাত্র নয়। এরা জামাতি, মৌলবাদী। এই শক্তিটা বিদেশি শক্তির মদতপুষ্ট হতে পারে। তদন্তকারীরা বলতে পারবেন। ভারতবর্ষকে দুর্বল করতে চায়। অশান্তি করতে চায়। গত ১০ সপ্তাহে যে রাষ্ট্রবাদী সরকার এখানে গঠন হয়েছে, তারা আইন কার্যকর করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ করেছে। সেই যন্ত্রণা থেকে হামলাকারীরা এই কাজ করছে।’’ এ দিন ধৃতদের মধ্যে অন্যতম মহম্মদ আফরোজের সঙ্গে মেটিয়াবুরুজের তৃণমূল বিধায়ক আব্দুল খালেক মোল্লার ছবি প্রকাশ্যে এসেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, খালেকের প্রচারে তাঁর সঙ্গেই জিপগাড়িতে রয়েছে আফরোজ। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিজেপি। খালেককেও ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। খালেক অবশ্য বলেছেন, ‘‘বিধায়ক হওয়ায় যে কেউ আমার কাছে আসতে পারে।’’ সামনে এসেছে আর এক ধৃত ভাঙড়ের বাসিন্দা মহম্মদ জাহিরুদ্দিন মালের পরিবারের প্রতিক্রিয়া। তাঁরা বলেছেন, ‘‘কলকাতায় ব্যবসার কাজে যাতায়াত করে ছেলে। কিন্তু এই আন্দোলনে থাকা উচিত বলে মনে করছিল। তাই গিয়েছিল।’’ আর এক ধৃত আরশাদ আলি ওরফে সাজিদের পরিবারেরও দাবি, ‘‘চেনা-জানা অনেকেই নিট পরীক্ষায় বসেছিল। এই আন্দোলনও শুধু পড়ুয়াদের নয়! চিকিৎসার মতো ক্ষেত্রে অনিয়ম হলে তার প্রভাব তো সব স্তরের মানুষের উপরে পড়ে। সেই ভাবনা থেকেই আন্দোলনের জন্য গিয়েছিল।’’
এ দিন আদালতে ধৃতদের তোলা হলে দু’পক্ষের সওয়াল-জবাবে রীতিমতো তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। অভিযুক্তদের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেন, ‘‘যাদের ধরা হয়েছে, তারা কেউ পেশাদার অপরাধী নয়। কেউ আতঙ্কবাদীও নয়। সারা দেশ জুড়ে নিট প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে। কলকাতা শহর সচেতনতার শহর। প্রত্যেকেরই আন্দোলন করার অধিকার আছে।’’ এর পরে তাঁরা দাবি করেন, এফআইআরে বলা হয়েছে, পুলিশের গার্ডরেল ভাঙা হয়েছে। এই তথ্য ঠিক নয়। কারণ পুলিশের বেশির ভাগ গার্ড রেল এমনিতেই ভাঙা! পুলিশ ও সাংবাদিকদের মারা হয়েছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে, সেই অভিয়োগও ঠিক নয় বলে দাবি করেন ওই আইনজীবীরা। তাঁদের যুক্তি, ‘‘পুলিশ জলের বোতল, কিছু ছোট পাথরকুচি ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করেছে। তাতে কাউকে আঘাত করা যায় না। তা ছাড়া সাংবাদিকেরা ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন। সেখানে কিছুটা ধাক্কাধাক্কি হয়েছে। কিন্তু কাউকে ইচ্ছাকৃত ভাবে মারধর করা হয়নি।’’ পুলিশের রুজু করা এফআইআরে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে দাবি করে এর পরে তাঁরা এ-ও বলেন, গোটা দেশে বিভিন্ন জায়গায় এ নিয়ে আন্দোলন হয়েছে। সর্বত্র যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের আশ্বাস মতো মামলা প্রত্যাহার করা হচ্ছে, সেখানে এই রাজ্যে মামলা দিয়ে জেলে ভরার চেষ্টা হচ্ছে।
সরকারি আইনজীবী আদালতে দাবি করেন, অভিযুক্ত যারা গ্রেফতার হয়েছে, তাদের কয়েক জনের বিরুদ্ধে আগেও মামলা হয়েছে। এমনকি চার্জশিটও আছে। মিছিলের অনুমতি থাকলেও কোনও অবস্থান বিক্ষোভ বা সভার অনুমতি ছিল না। যে ভাবে পুলিশ এবং সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের উপরে হামলা চালানো হয়েছে, তার ভিডিয়ো এবং ছবি রয়েছে। মিছিলে আসা লরির উপর থেকে উস্কানি ও প্ররোচনামূলক নানা বক্তব্য রাখা হয়েছে। তাতেই শান্তিভঙ্গ হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে জলের বোতল, চটি বা পাথরই উদ্ধার হয়নি, লাঠিও উদ্ধার হয়েছে। এমন উস্কানিমূলক কাজে আর কার কার হাত রয়েছে, তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। সেই কারণেই ধৃতদের ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতের আবেদন করা হচ্ছে। বিচারক অবশ্য সব শেষে ধৃতদের দু’দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেন।