নিজের বক্তৃতা শেষ করেই ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে নেমে সটান বাড়ি চলে গেলেন তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তৃতা শোনার জন্যও অপেক্ষা করলেন না। কালীঘাটপন্থীদের একটি সূত্র বলছে, নেত্রী সংক্ষেপে বক্তৃতা শেষ করার নির্দেশ দিলেও কানে তোলেননি শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ। প্রায় সাড়ে ২২ মিনিট বক্তৃতা করেছেন। তার জেরে তালিকায় থাকলেও বাদ পড়তে হয়েছে কয়েক জন সাংসদ-বক্তাকে। তা নিয়েই ‘কথা কাটাকাটি’ হয়েছে নেত্রীর সঙ্গে। বিড়লা তারামণ্ডলের সামনের মঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে যান নেত্রীর অনুগত বলে পরিচিত কল্যাণ। পরে তিনি জানান, অসুস্থতার কারণেই মঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছেন। বাদানুবাদের কোনও প্রশ্নই নেই। যদিও ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে তিনি কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের একাংশকে কটাক্ষ করেন। ব্যাখ্যা দেওয়ারও চেষ্টা করেন, কেন তাঁর ভাষণ দীর্ঘায়িত হয়েছিল।
তারামণ্ডলের সামনে মঞ্চ বেঁধে মঙ্গলবার ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচি পালন করেছেন কালীঘাটপন্থীরা। সেখানে বক্তৃতা করছিলেন কল্যাণ। তাঁর ভাষণের মাঝেই মঞ্চে প্রবেশ করেন মমতা। সেই সময় কিছুটা থেমে আবার বক্তৃতা শুরু করেন শ্রীরামপুরের সাংসদ। মঞ্চে উপস্থিত নেতা-নেত্রীদের একটি সূত্র বলছেন, নেত্রী ইঙ্গিতে কল্যাণকে ভাষণ সংক্ষিপ্ত করার কথা বলেন। অভিযোগ, তার পরেও নিজের বক্তৃতা থামাননি কল্যাণ। তখন বিধায়ক কুণাল ঘোষ উদ্যোগী হয়ে বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেন। একটি সূত্র বলছে, বক্তৃতা শেষ করার পরে কল্যাণের সঙ্গে ধমকের সুরেই কথা বলেন মমতা। সেই নিয়ে দু’জনের বাদানুবাদও হয়। তার পরেই ক্ষোভ প্রকাশ করে মঞ্চ থেকে নেমে যান কল্যাণ। সেখান থেকে সোজা চলে যান নিজের কালীঘাটের বাড়িতে। মমতার বাড়ির তিনটে বাড়ি আগেই কল্যাণের বাসস্থান।
কালীঘাটপন্থীদের একটি সূত্র বলছে, মঙ্গলবার তারামণ্ডলের সামনে মঞ্চে বক্তার তালিকা ছিল দীর্ঘ। সে কারণে সকল বক্তাকেই সংক্ষেপে ভাষণ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ, সেই নির্দেশ কানে তোলেননি কল্যাণ। কথা থাকলেও বক্তৃতা করতে পারেননি লোকসভার সাংসদ মহুয়া মৈত্র, কীর্তি আজাদ, রাজ্যসভার সাংসদ দোলা সেন, সাগরিকা ঘোষ, রাজীব কুমারেরা। এই আবহে দীর্ঘক্ষণ বক্তৃতা করেন কল্যাণ। আর সে-ই নিয়ে মমতার সঙ্গে তাঁর ‘কথা কাটাকাটি’ হয়। তার পরেই শ্রীরামপুরের সাংসদ মঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে যান। তার পরে একে একে বক্তৃতা করেন সৌগত রায়, প্রিয়ঙ্কা অধিকারী, উপাসনা চৌধুরী, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সর্বশেষে নেত্রী মমতা। তবে কল্যাণ আর নেত্রীর ভাষণ শোনার জন্য অপেক্ষা করেননি। পরে তিনি জানান, সোমবার রাত জেগেছেন। জ্বর এসেছে। তাই নিজের বক্তৃতা শেষ করেই মঞ্চ থেকে বেরিয়ে গিয়েছেন। নেত্রীর সঙ্গে বাদানুবাদের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘বচসা হলে কি মঞ্চের সামনে গিয়ে ও ভাবে বক্তৃতা করতাম?’’ যদিও মমতার সঙ্গে তাঁর কথা কাটাকাটি হয়েছে বক্তৃতার পরে বলেই খবর। রাতে কল্যাণ বলেন, “আমি আর কত হিউমিলিয়েট হব। আড়াই মাস ধরে তো দলের জন্য খাটছি। অভিষেক বাড়িতে বসে আছে। বাকিরা কাজ করছে না। তার পরেও?”
আরও পড়ুন:
মঙ্গলবার মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের প্রায় সাড়ে ২২ মিনিটের বক্তৃতায় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়পন্থী থেকে বিজেপি— সকলকে বার বার কটাক্ষ করেছেন কল্যাণ। তিনি বলেন, ‘‘মমতা ছাড়া তৃণমূল, বিরোধী দল বা জনতা হয় না। ও দিকে বিজেপির সহায়তায় মঞ্চ হয়েছে। কিন্তু কর্মীরা ওঁদের সঙ্গে নেই। শুভেন্দু অধিকারীর বি টিম বিধায়কেরা যতই স্বপ্ন দেখুন, নিজেরাই নিজেদের বাঁশ আনছেন।’’
রাজ্যে ক্ষমতাবদলের পরে তৃণমূল দৃশ্যত ভেঙে খান খান হয়েছে। এক সময়কার বিশ্বস্ত অনেক সঙ্গীই মমতার থেকে দূরে সরে গিয়েছেন। ফিরহাদ হাকিম, মালা রায়, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের মতো একদা অনুগত নেতা-নেত্রীরাও ‘বিমুখ’ হয়েছেন। তার পরেও যাঁরা প্রায় মমতার সঙ্গেই রয়েছেন, নিয়মিত যান তাঁর বাড়ি, সব বৈঠকে যোগ দেন— সেই তালিকার উপরের দিকেই রয়েছেন কল্যাণ। তৃণমূলের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে প্রায়ই চাঁছাছোলা ভাষায় আক্রমণ করেন তিনি। মাঝেমধ্যে বেসুরো যে হননি, তা নয়। অভিষেকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। কলকাতা হাই কোর্টে অভিষেকের মামলা থেকে সরে দাঁড়িয়ে তাঁকে কটাক্ষ করেছেন। সই জাল কাণ্ডে রক্ষাকবচ চেয়ে হাই কোর্টে মামলাটি করেছিলেন অভিষেক। সেই মামলা থেকেই সরে দাঁড়িয়ে কল্যাণ বলেছিলেন, ‘‘মমতাদিকে বেছে নিতে হবে, দলে কে থাকবে, আমি না অভিষেক!’’
পরে যদিও বরফ গলে যায়। অভিষেক জানান, কল্যাণের বিরুদ্ধে তাঁর কোনও ক্ষোভ নেই। কল্যাণও বলেন, ‘‘অভিষেক আমার সন্তানসম।’’ এ বার ২১ জুলাইয়ের মঞ্চে খোদ নেত্রীর সঙ্গে কথা কাটাকাটি হল কল্যাণের। যদিও সাংসদ নিজে তা স্বীকার করেননি। তার পরেও প্রশ্ন উঠছে, এই টানাপড়েনে কি আগের মতোই ইতি পড়বে, না কি অন্য সহকর্মীদের এ বার অনুসরণ করবেন কল্যাণ!