Advertisement
E-Paper

শরীর অসুস্থ ছিল, তাই প্রাণ বাঁচল দ্বিতীয় শ্রেণির শ্রেয়ার, কাতর বন্ধু বিচ্ছেদের বেদনায়

গোবিন্দপুর থেকে যদুপুরের বেসরকারি স্কুলে যে পুলকারে করে শ্রেয়া যায় ট্রেনের ধাক্কায় সেই পুলকারটিই দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছে। দুর্ঘটনার সময়ে গাড়িতে ছিল সাত জন পড়ুয়া।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬ ০২:৩৪
শ্রেয়া দত্ত।

শ্রেয়া দত্ত। — নিজস্ব চিত্র।

শুক্রবার মুর্শিদাবাদের ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে চার স্কুল পড়ুয়া ও এক সাইকেল আরোহীর। তবে শারীরিক অসুস্থতার জন্যই প্রাণে বেঁচে গেল দ্বিতীয় শ্রেণির পড়ুয়া শ্রেয়া দত্ত।

গোবিন্দপুর থেকে যদুপুরের বেসরকারি স্কুলে যে পুলকারে করে শ্রেয়া যায় ট্রেনের ধাক্কায় সেই পুলকারটিই দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছে। দুর্ঘটনার সময়ে গাড়িতে ছিল সাত জন পড়ুয়া। তার মধ্যে তামান্না পারভিন (৭), ইসানুর রহমান (৯), জেসিকা শবনম (৮), ফারহানা বেগিন (৬) নামের চার জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে তিন পড়ুয়ার বাড়ি গোবিন্দপুরে ও ফারহানার বাড়ি ডাবকাই গ্রামে। শ্রেয়া জানাচ্ছে, প্রথমে ফারহানার বাড়ির সামনে গাড়ি পৌঁছোয়। ফারহানা ওঠার পরে গাড়িতে ওঠে জেসিকা, শবনম। পরে তামান্না ও ইনসারুলকে বাড়ি থেকে নিয়ে গাড়ি এসে দাঁড়ায় তার বাড়ির সামনে। সে ওঠার পরে বাড়ি থেকে তোলা হয় বিশ্বেশ্বর মণ্ডলকে। এর পরে বিদ্যালয়ের উদ্দেশে রওনা দেয় পুলকার। শ্রেয়া বলে, ‘‘রোজ আনন্দ করে খেলতে খেলতে আমরা স্কুলে যাই।’’ তবে দুর্ঘটনার খবর শোনার পর থেকেই দ্বিতীয় শ্রেণির পড়ুয়ার চোখে-মুখে ভয়। শ্রেয়ার মা বলেন, ‘‘মেয়ের আজকে শরীর খারাপ ছিল। মন চায়নি শ্রেয়া স্কুলে যাক।’’ তিনি জানান, মেয়ে যে গাড়িতে যায় সেই গাড়িতে এত বড় বিপর্যয় ঘটে যাবে তা কল্পনাও করা যায়নি।

কয়েক ঘণ্টা আগেও যে সন্তানকে খাইয়ে, স্কুলের পোশাক পরিয়ে গাড়িতে তুলে দিয়েছিলেন, তার নিথর দেহ পড়ে রয়েছে হাসপাতালে। এই দৃশ্যে শোকে কাতর মৃতের মা-বাবা-পরিজন। শোকের ছায়া গ্রামেও। জেসিকার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল পড়শিরা ভিড় করেছেন বাড়িতে। জেসিকা নেই এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না তার মা। কাঁদতে কাঁদতে বিড়বিড় করে জানালেন, তাঁর হাত থেকে জল খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল মেয়ে। বেরোনোর সময় মাকে বলেছিল, ‘‘মা মনটা কেমন করছে, একটু জল দাও না।’’

ফারহানার মা রিনা বেগম বলেন, “ মেয়ে এক ডাকেই উঠে পড়ে। তার পরে মোবাইল দেখছিল। ৬টা বাজতেই আমার শাশুড়ি গিয়ে তাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে আসে।” রিনার শাশুড়ি ফারহানাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে এসেছিলেন। ফারহানার বাবা ভিন্‌রাজ্যে কাজ করেন। বৃহস্পতিবারই গ্রাম থেকে ফিরে গিয়েছেন তিনি। ফারহানার ঠাকুমা জানান, নাতনিকে গাড়িতে তোলার কিছুক্ষণ পরেই তাঁর অন্য এক ছেলে তাঁকে ফোন করে জানান, একটা লাল রঙের পুলকার দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়েছে।

তামান্নার মা বলেন, ‘‘সকালবেলা হাত-পা ধুচ্ছিলাম। হঠাৎ মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা শুনলাম ট্রেন লাইনে স্কুলের গাড়ির অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। আমার বুকের ভিতরটা কেমন চিনচিন করে উঠল। ঘটনাস্থলে গিয়ে শুনতে পেলাম আমার বাবুর গাড়িতেই অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। সবাই মিলে মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। ওখানে গিয়ে মেয়ে মারা গিয়েছে।’’

দুর্ঘটনায় জখম অবস্থায় মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তৃতীয় শ্রেণির পড়ুয়া ইসানুর রহমানকে। চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই মৃত্যু হয় তার। মৃতের মা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “স্কুলে যাওয়ার আগে বলল মা ম্যাগি করে দাও, তাড়াহুড়োতে ছেলে খাওয়ার সময় টুকু পায়নি। টিফিন বাক্স ভরে দিয়েছিলাম। আর কোনও দিন খাওয়াই হবে না।”

প্রসঙ্গত চার পড়ুয়ার সঙ্গে মৃত্যু হয়েছে গোবিন্দপুরের বাসিন্দা জামশেদ শেখ (৭৩) নামে এক সাইকেল আরোহীরও। তাঁর স্ত্রী বলেন, “রেল লাইনের ও পারে ধানের জমিতে জল আছে কি না দেখবে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। কিছু ক্ষণ বাদে গ্রামের লোক দেখছি ছুটছে, সবাই বলাবলি করছে আমাদের বাড়ির লোক মারা গিয়েছে। গিয়ে দেখি রেল লাইনের উপরে দলা পাকিয়ে পড়ে আছে।’’

দুর্ঘটনায় আহতেরা মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আহতদের দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ ও জেলাশাসক আর অর্জুন। প্রাথমিক ভাবে রেলের ধারণা, সিগন্যাল ব্যবস্থায় কোনও ত্রুটি ছিল না। গেটম্যান ও সুপারভাইজ়ারের গাফিলতির কারণেই দুর্ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পর পরই গেটম্যানকে আটক করে বহরমপুর থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদের পরে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। রেলের তরফে ইতিমধ্যেই গেটম্যান ও সুপারভাইজ়ারকে নিলম্বিত (সাসপেন্ড) করা হয়েছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে বিশেষ কমিটি গঠন করে তদন্ত শুরু করা হয়েছে।

Train accident pool car

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy