E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

যাদবপুরে র‍্যাগিং-মৃত্যুর সাক্ষী বিরূপ, প্রশ্ন

২০২৩-এর ৯ অগস্ট গভীর রাতে যাদবপুর মেন হস্টেলের তেতলা থেকে নীচে পোশাকহীন অবস্থায় ছেলেটির দেহ পড়ে ছিল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা স্নাতক স্তরে পড়তে এসে নদিয়ার সেই সাদাসিধে ছেলেটি র‍্যাগিংয়ের শিকার হয় বলে অভ‍্যন্তরীণ তদন্তে মেনে নিয়েছেন যাদবপুর কর্তৃপক্ষ।

ঋজু বসু

শেষ আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৩৬
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। — ফাইল চিত্র।

তিন বছর আগের মর্মান্তিক ঘটনাটির সময়ে পুরো ১৮ বছর বয়স হয়নি তার। বেঁচে থাকলে আজ, শনিবারই ২১ বছর বয়স হত সেই তরুণের। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍্যাগিংয়ের শিকার, বাংলা স্নাতক স্তরে নবাগত ছাত্রের বিচারে সাক্ষ‍্য পর্বে নতুন করে জটিলতার উদয় হয়েছে।

সেই সময়ে যাদবপুরের ছাত্র, এবং হস্টেলের আবাসিক কারও কারও বয়ানে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। আদালত সূত্রের খবর, এক জনকে বিরূপ সাক্ষী বলে চিহ্নিতও করেছেন সরকারি আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায়। ডিসেম্বরে ছেলেটিকে ফের এজলাসে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।

২০২৩-এর ৯ অগস্ট গভীর রাতে যাদবপুর মেন হস্টেলের তেতলা থেকে নীচে পোশাকহীন অবস্থায় ছেলেটির দেহ পড়ে ছিল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা স্নাতক স্তরে পড়তে এসে নদিয়ার সেই সাদাসিধে ছেলেটি র‍্যাগিংয়ের শিকার হয় বলে অভ‍্যন্তরীণ তদন্তে মেনে নিয়েছেন যাদবপুর কর্তৃপক্ষ। তবে প্রাথমিক ভাবে খুনের মামলা রুজু হলেও পরে পিছিয়ে আসে পুলিশ। আলিপুর পকসো আদালতে খুন বা অনিচ্ছাকৃত মৃত‍্যু ঘটানো নয়, আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা রুজু করেই এ মৃত‍্যুর বিচার চলছে।

ঘটনার সময়ে যাদবপুরের একাধিক ছাত্র আদালতে সাক্ষ‍্য-পর্বে বয়ান বদলেছেন। আদালত সূত্রের খবর, সরকারি আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায় একটি ছাত্রকে ‘বিরূপ সাক্ষী’ ঘোষণা করেন। ঘটনার সাক্ষী যাদবপুরে তখনকার কোনও কোনও ছাত্রকে বার বার ফোন করে বয়ান বদলাতে প্রভাবিত করা হচ্ছে বলেও বিভাস আদালতে জানিয়েছেন। জানা গিয়েছে, হস্টেলে মৃত ছাত্রটির সঙ্গে একই ঘরের আবাসিক, তখন যাদবপুরের দ্বিতীয় বর্ষের এক জন পুলিশের কাছে যা বয়ান দিয়েছিলেন, তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন বয়ান দেন আদালতে। তাঁর আগের বয়ানের ভিডিয়ো নথিও রয়েছে। সেই ছেলেটিও নদিয়া জেলার বাসিন্দা। এখন দক্ষিণ ভারতের একটি রাজ‍্যে স্নাতকোত্তর পাঠরত। সেখান থেকে এসেই তিনি এ বার ঘটনাটির বিষয়ে কার্যত কিছুই জানা নেই বলে এড়িয়ে যান। এবং ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ধৃত অভিযুক্তদের চিনতেও অস্বীকার করেন বলে সূত্রের খবর। মামলার অত‍্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ওই ছাত্র। তাঁকেই বিরূপ সাক্ষী চিহ্নিত করে ফের আদালতে ডাকা হয়েছে।

তদন্তকারী মহল মারফত জানা গিয়েছে, যাদবপুরের তখনকার আরও এক জন ছাত্রকেও দেশের একটি প্রথম সারির আইআইটির এক পড়ুয়া ফোন করে সাক্ষ‍্য এড়িয়ে যেতে চাপ দেন বলে অভিযোগ। পিতৃহারা ওই ছাত্রটিকে পরিবারের জন‍্য মোটা টাকার টোপও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি। ওই ছাত্রটি অবশ‍্য সাক্ষ‍্য মোটামুটি ঠিক দিয়েছেন। কিন্তু এজলাসে অভিযুক্তদের চিনতে অস্বীকার করেন। ধৃত ছাত্রদের মধ‍্যে তখন আনন্দে হাসাহাসি হয় বলেও আদালত সূত্রের খবর।

যাদবপুরে যে বর্ষে ওই ছেলেটি ভর্তি হয়েছিল, তার সমসাময়িকেরা এখন স্নাতক চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। তখন যাঁরা দ্বিতীয় বর্ষে, তাঁরা স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। যাদবপুরের এক শিক্ষক বলেন, “র‍্যাগিংয়ের ঘটনাটির এক বছর বাদেও হস্টেলে প্রভাব ছিল অভিযুক্তদের। তাদের মামলার জন‍্য টাকা তোলার চেষ্টাও হয়। সেটা বন্ধ করে ব‍্যবস্থা নেন কর্তৃপক্ষ।” মামলার সাক্ষীদের কারা ভয় দেখাতে পারেন, তা যাদবপুরের ভিতরের কেউ অবহিত নন বলেই ওই শিক্ষকের দাবি।

গত দু’বছরে জনা কুড়ির সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। এখনও ৭-৮ জনের বাকি। মামলাটি নিয়ে হাই কোর্টের নির্দেশের পরে অভিযুক্ত ১২ জনের জামিন রদ হওয়ায় বিচারে কিছুটা সুরাহা হয়।

অন‍্য দিকে, পুত্রহারা বাবা এবং মা একটি বৈষ্ণব মঠের দীক্ষা নিয়ে ধর্মাচরণকে আশ্রয় করে সান্ত্বনা খুঁজছেন। মৃত ছেলেটির সহোদর ভাই বিসিএ পড়ছেন। এটুকু ছাড়া তাঁর বিষয়ে কোনও তথ্য প্রকাশ নিয়ে স্পর্শকাতর ওই মা-বাবা। পালাবদলের পরে মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের সঙ্গে ব‍্যক্তিগত স্তরে তাঁদের কিছুটা যোগাযোগ হয়েছে। বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন শুভেন্দু অধিকারীও তাঁদের সঙ্গে দেখা করেন। তবে এখন যোগাযোগ নেই।

বিপর্যয় বা নিষ্ঠুরতার মাত্রায় রাজ‍্যে কোনও ঘটনার থেকে কম না-হলেও রাজনীতি বা প্রতিবাদের আবর্তে তত চর্চিত নয় এই র‌্যাগিংয়ে মৃত‍্যুর ঘটনাটি। ছেলের জন্মদিনের প্রাক্কালে পুত্রহারা বাবা বলছেন, “আদালত ও বিচার ব‍্যবস্থার উপরে ভরসা রেখেই ন‍্যায়বিচারের অপেক্ষা করছি।”

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Ragging court case

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy