E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

‘বলির পাঁঠা’ নয়, মাথা ধরতে হবে, দাবি বিরোধীদের

দুর্গা পুজো দর্শন করতে শনিবার রাতেই কলকাতায় এসে গিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। কিন্তু চোরবাগানের ঘটনায় তাঁর পুজো সফর স্থগিত হয়ে গিয়েছে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:২৩
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। রয়েছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমও।

প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। রয়েছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমও। — নিজস্ব চিত্র।

দুর্গাপুজোর মধ্যে শহরে বেনজির বিপর্যয় ঘিরে চড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ। চোরবাগানের পুজো মণ্ডপের বাইরে ভিড়ের মধ্যে হুড়োহুড়িতে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের, জখম অন্তত ২৫ জন। ঘটনার জেরে পুজোর উদ্যোক্তা-সহ ৭ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বিরোধীদের সম্মিলিত দাবি, ‘লোক-দেখানো তদন্ত’ না-করে পুজো কমিটির মাথায় বসে থাকা ‘প্রভাবশালী’দের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। বিগত তৃণমূল কংগ্রেসের জমানার একাধিক ঘটনা মনে করিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য বলেছেন, গাফিলতি কাদের ছিল, তদন্তে সবই খতিয়ে দেখা হবে। সেই জন্যই বিচারবিভাগীয় তদন্ত চাইছে রাজ্য সরকার।

দুর্গা পুজো দর্শন করতে শনিবার রাতেই কলকাতায় এসে গিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। কিন্তু চোরবাগানের ঘটনায় তাঁর পুজো সফর স্থগিত হয়ে গিয়েছে। শাহ রবিবার হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসকদের সঙ্গেও কথা বলেছেন তিনি। শাহের সঙ্গে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও। পরিস্থিতি সামাল দিতে সব রকম কেন্দ্রীয় সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন শাহ। এমন ‘দুঃসময়ে’ তাঁরা পশ্চিমবঙ্গের মানুষের পাশে আছেন জানিয়ে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীনও বলেছেন, ‘‘কলকাতায় মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সকলকে গভীর ভাবে শোকাহত করেছে। বাংলার উৎসবমুখর পরিবেশে এই দুঃখজনক ঘটনা সকলের মনে গভীর বেদনার সৃষ্টি করেছে।’’

চোরবাগানের ওই পুজোর পুরনো কমিটিকে খুঁটিপুজোর পরে ‘চাপ’ দিয়ে পদত্যাগ করিয়ে বিজেপি নেতারা মাথায় বসেছিলেন বলে অভিযোগ এখন সামনে এসেছে। সেই সময়ে পুজো কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন জোড়াসাঁকোর বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা, পৃষ্ঠপোষক করা হয়েছে দেবদীপ অধিকারীকে। যিনি মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো বলে ‘প্রভাবশালী’দের আড়ালের চেষ্টা হচ্ছে, একযোগে এমনই দাবি করছে বিরোধীরা। রাজ্য সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের ঘোষিত একাধিক পুরস্কারও এ বার পেয়েছে ওই পুজো। তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর রয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর হাতেই।

জমানা বদলের পরে কলকাতার কয়েকটি পুজোয় এ বার দেবদীপের নাম রেখে সংশ্লিষ্ট কিছু মহল কাজ গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে রাজনৈতিক শিবিরে চর্চা শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাদা কৃষ্ণেন্দু অধিকারীর একমাত্র ছেলের নাম দেবদীপ, কাঁথি শহরের ‘শান্তি কুঞ্জে’র বাসিন্দা। সমাজমাধ্যমে দেবদীপের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে অবশ্য লেখা রয়েছে ‘কলকাতার বাসিন্দা’। কী ভাবে তিনি জড়ালেন চোরবাগানের পুজোর সঙ্গে? এই বিষয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া অবশ্য জানা যায়নি। ফোনে জবাব মেলেনি, উত্তর মেলেনি মেসেজেরও। ফোন ধরেননি দেবদীপের বাবা। এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি অধিকারী বাড়ির কেউ। প্রসঙ্গত, শনিবার রাতে কাঁথিতে একটি পুজো মণ্ডপে গিয়েছিলেন দেবদীপ।

তবে চোরবাগানের পুজোর প্রধান পৃষ্ঠপোষক মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো, বিরোধীদের এই সংক্রান্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক বলেছেন, “এই ধরনের কোনও ঘটনা আমার জানা নেই। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভাইপো নাবালক না সাবালক, আমি জানি না। সে তো থাকে কাঁথিতে। সে এখানে কোথা থেকে এল, আমার জানা নেই এবং বিশ্বাস করুন, আমি মানসিক ভাবে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। আমি কোনও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার উত্তর এই মুহূর্তে দিতে পারছি না।”

মুখ্যমন্ত্রী এ দিনই বলেছেন, উদ্যোক্তা, পুলিশ বা বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থা, গাফিলতি পাওয়া গেলে কাউকেই ছাড়া হবে না। তবে একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ‘‘মূল অভিযোগ অস্থায়ী হোমগার্ডডের বিরুদ্ধে। আগে দু’বছর ডিউটি করেছে, এ বার তৃতীয় বছর। পুরো তালিকা চেয়ে পাঠিয়েছি।’’ তাঁর আরও মন্তব্য, ‘‘ওরা কারা? অনেক আবর্জনা নিয়ে চলছি!’’

বিরোধীরা অন্য দিকে চাপ বাড়াচ্ছে। চোরবাগানের ঘটনায় সব ‘প্রভাবশালী’র বিরুদ্ধে পদক্ষেপের দাবিতে এ দিন গিরিশ পার্ক থানায় একই সময়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করেছে মমতা-তৃণমূলের উত্তর কলকাতার যুব শাখা, সিপিএম তথা বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস। ছিলেন কুণাল ঘোষ, মৃত্যুঞ্জয় পাল, শ্বেতা ইন্দোরিয়া, উপাসনা চৌধুরী, মৌসুমী দে, শতরূপ ঘোষ, মৌসুমী ঘোষ, সুমন রায়চৌধুরী, মানস সরকারেরা। সংশ্লিষ্ট সকলের গ্রেফতার চেয়ে থানায় দাবিপত্রও দিয়েছেন তাঁরা।

সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর দাবি, ‘‘চোরবাগান পুজোর তালিকায় প্রভাবশালীদের আড়াল করা যাবে না। সরকারি ‘সেরার সেরা’ পুরস্কার কার বদান্যতায়? তাঁরা ছাড় পাবেন কেন?’’ মমতা-তৃণমূলের বিধায়ক কুণালও বলেছেন, ‘‘কমিটিতে এত বড় বড় নাম, তাদের ছাড়া হবে কেন?’’ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের বক্তব্য, ‘‘যাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাঁরা কারা? যাঁরা মাইকে ঘোষণা করছিলেন, সিকিউরিটি গার্ড, কিংবা যাঁরা ভিড় সামলাতে ওখানে ছিলেন—পুজো কমিটির সাধারণ কর্মী। তাঁদের বলির পাঁঠা করা হচ্ছে। দায়বদ্ধতা তো তাঁদের, যাঁরা পুজো কমিটির চেয়ারম্যান, সভাপতি, দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। তাঁদের কেন গ্রেফতার করা হবে না?’’ প্রদেশ সভাপতির সংযোজন, ‘‘আমরা বিভিন্ন সূত্রে এমন খবর পাচ্ছি, যদিও তা ভুলও হতে পারে, যে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর কোনও এক ভাইপো নাকি এই পুজোর অন্যতম কর্তা। এর সত্যতা মুখ্যমন্ত্রীকেই সামনে আনতে হবে।’’ সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের মতে, “এই ঘটনা এড়ানো যেত। যে পুজোর উদ্বোধন করছেন মুখ্যমন্ত্রী, যে পুজো কমিটি ছিনিয়ে নিয়েছে বিজেপি, যে পুজোর চেয়ারম্যান বিজেপি বিধায়ক, যে পুজোর পৃষ্ঠপোষক মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো, এই ঘটনার দায় তাঁরা এড়াতে পারেন না।’’

তবে গণতান্ত্রিক তৃণমূলের নেতা তথা বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “এটা বিপর্যয়ের সময়। ঘটনার পর থেকে কালীঘাট-তৃণমূল ও সিপিএমের নেতৃত্বে বামেরা যে ভাবে নখ-দাঁত বার করেছেন, তা দুর্ভাগ্যজনক। কারা দায়ী, সেটা কাটাছেঁড়া করার সময় পাওয়া যাবে।’’

চোরবাগানে দুর্ঘটনার পরেই সাহাষ্যে এগিয়ে এসেছে নানা সংগঠন। এসএফআই মেডিকেল কলেজ ইউনিটের তরফে আহতদের চিকিৎসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনের জন্য চার জনের একটি স্বেচ্ছাসেবক দল রাতভর কাজ করেছে। সকালে সক্রিয় হয় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস)। বিপর্যস্ত পরিবারগুলি যেখানে ভিড় করে আছে, সেখানে গিয়ে জল এবং শুকনো খাবার পৌঁছে দিয়েছেন আরএসএসের স্বেচ্ছাসেবকেরা।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
CPIM Md. Salim

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy