ভিত গড়ে দিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার! তার উপরে ইট গাঁথার কাজ আরও একটু এগিয়ে দিল জোড়া বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচন। ভোটারের অধিকার রক্ষার দাবি ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার প্রতিবাদে ‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য’ গড়তে চাইছে এই রাজ্যের বিরোধী শিবির।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশের অপসারণ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) বাদ যাওয়া ‘বৈধ’ ভোটারদের অধিকার ফেরানোর দাবিতে দিল্লিতে একজোট হয়েই পথে নেমেছে ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের শরিকেরা। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও কমিশন এবং বিজেপিকে নিশানা করে সূক্ষ্ম কৌশলে আন্দোলনের তীব্রতা বাড়াতে চাইছে সিপিএম, মমতা-তৃণমূল এবং কংগ্রেস। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের বিধানসভা উপনির্বাচনে যে ভাবে পুলিশ-প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে ভোটারদের বাধা দেওয়ার ভূরি ভূরি অভিযোগ উঠেছে, সেই ঘটনা কমিশনের ভূমিকার দিকে বিরোধীদের বর্শাফলক নিবদ্ধ করতে সহায়ক হচ্ছে।
পৃথক রাজনৈতিক সত্তা ও অবস্থান ধরে রেখেও ভোটার এবং কমিশন-প্রশ্নে কৌশলে বিরোধীদের দূরত্ব ‘কমে’ আসার ইঙ্গিত মিলছে উপনির্বাচনের দিন থেকেই। মমতা-তৃণমূল, সিপিএম এবং প্রদেশ কংগ্রেস একই সুরে এই উপনির্বাচনকে প্রহসন আখ্যা দিয়েছে। রাজ্যে উপনির্বাচনের দিনই রাজধানী দিল্লিতে বিরোধীদের প্রতিবাদে শামিল হয়েছিলেন মমতা-তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তার প্রেক্ষিতে রাজ্য বিজেপির তরফে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্রের বুথে বৈদ্যুতিন ভোট-যন্ত্রের (ইভিএম) ছবি দিয়ে দেখানো হয়েছিল, সেখানে বিজেপি প্রার্থীর নামের পাশে টেপ আটকানো ছিল। বিজেপির তোপ, ডায়মন্ড হারবারে যিনি এই ভাবে ভোটে জিতেছেন, তিনিই দিল্লিতে ‘ভোট-চুরি’র প্রতিবাদ করতে গিয়েছেন! ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক সমাজমাধ্যমে এর পাল্টা বলেন, এই ঘটনা সত্যিই ঘটে থাকলে তার দায় কমিশনকে নিতে হবে। সেই সময়ের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পরে একটি ব্যাঙ্কের কর্তা হয়ে চলে গিয়েছেন। এই অভিযোগ থাকলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? এর পরে আসরে নেমে বিজেপির উদ্দেশে সিপিএম এবং দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের মন্তব্য, ‘এই ভোট-চুরিও একই নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানেই ডায়মন্ড হারবার মডেলের নামে নিখুঁত ভাবে করা হয়েছিল’। অর্থাৎ অভিষেক ও সেলিমের নিশানায় একই ভাবে উঠে এসেছে কমিশনের ভূমিকা।
এর আগে কমিশনের ভূমিকার বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিবাদের প্রস্তাব দিয়ে সব বিরোধী দলকে চিঠি দিয়েছিলেন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, চিঠি পেয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে ফোন করেছিলেন। মমতা বলেছেন, এই প্রতিবাদে তিনি লাল-নীল রঙের বিচার চান না। উপনির্বাচনের প্রচারে গিয়ে মমতা-তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল ঘোষ ডাক দিয়েছিলেন, ‘‘ভোট যার যার কিন্তু বুথ সবার। বুথ রক্ষা করতে বিজেপি-বিরোধী সকলে এগিয়ে আসুন।’’ আর এখন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সেলিমের মত, ‘‘সংবিধান, গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার আক্রান্ত। গোটা দেশ জুড়ে যে প্রতিবাদ হচ্ছে, সেখানে বহু স্বর উঠে আসছে। পশ্চিমবঙ্গও তার বাইরে নয়। আমরা বলছি, বৈচিত্রের মধ্যেই ঐক্য থাকবে। সিদ্ধান্ত আলাদা ভাবেই হবে, কিন্তু আঘাত হানা হোক একত্রে (‘ডিসাইড ডিফারেন্টলি বাট স্ট্রাইক টুগেদার’)! তাঁর সংযোজন, দুই কেন্দ্রের উপনির্বাচনে ‘কারচুপি’ (সব বিরোধী দলই আলাদা ভাবে বিস্তর অভিযোগ জমা দিয়েছে কমিশনে) দেখিয়ে দিচ্ছে, বিজেপি সরকারের সঙ্গে ‘হাত মিলিয়ে’ কমিশন কী ভূমিকা পালন করছে! তবে একই সঙ্গে সিপিএম, মমতা-তৃণমূল বা কংগ্রেস নেতারা বলছেন, প্রতিবাদ এক সুরে বাঁধা মানেই রাজ্যে এখনই নির্বাচনী আঁতাতের কথা ভাবা হচ্ছে না।
‘ভোট চুরি’র প্রতিবাদ এবং জ্ঞানেশের ইস্তফার দাবিতে বুধবারই উত্তর, মধ্য, বড়বাজ়ার ও দক্ষিণ কলকাতা জেলা কংগ্রেস মিলিত ভাবে লোকভবন অভিযানের ডাক দিয়েছিল। বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে জমায়েত করে লোকভবনের দিকে এগোচ্ছিলেন দলের কর্মী-সমর্থকেরা। লোকভবনের সামনের রাস্তায় ব্যারিকেড ভেঙে মিছিল এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি বাধে কংগ্রেস কর্মী-সমর্থকদের। টেনে-হিঁচড়ে বিক্ষোভকারীদের ভ্যানে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। কংগ্রেস নেতৃত্ব অবশ্য জানিয়ছেন, জ্ঞানেশ না-সরলে এবং ‘ভোট চুরি’র কিনারা না-হলে কোনও দমন-পীড়নেই তাঁদের থামানো যাবে না। দিল্লিতে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী-সহ বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের নেতা-সাংসদদের বিরুদ্ধে পুলিশি নিপীড়নের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সব রাজ্যে জেলা ও ব্লক স্তরে ‘কালা দিবস’ পালনের ডাক দিয়েছে এআইসিসি।