Advertisement
E-Paper

প্রসবের পরেই নাড়ি না কাটলে বেশি সুস্থ থাকছে শিশু, কমছে মৃত্যুহার! তার পরেও বিকল্প ভাবনা প্রসারের উদ্যোগ নেই রাজ্যে

প্রসব পদ্ধতির এই বিকল্প ভাবনার নাম ‘ফিজিওলজিক্যাল কর্ড ক্ল‌্যাম্পিং’ (পিসিসি)। সেই ভাবনা কতটা কার্যকরী তা খতিয়ে দেখার জন্য দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে পরীক্ষামূলক ভাবে পিসিসি পদ্ধতি চালু করা হয়।

সৌরভ দত্ত

শেষ আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২৬ ১০:১৫
physiological cord clamping pcc west bengal newborn health

জন্মের পরপরই নাড়ি কেটে না দিয়ে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করলে শিশুর শরীরে কী প্রভাব পড়ে? ছবি: সংগৃহীত।

শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার এক মিনিটের মধ্যে মায়ের সঙ্গে তার নাড়ির যোগ ছিন্ন করে ফেলাই চলতি চিকিৎসাপদ্ধতির দস্তুর। সেই ব্যবস্থায় বদল আনার পক্ষে সওয়াল করছেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞদের একাংশ। বলছেন, তড়িঘড়ি নাড়ি না-কেটে স্বাভাবিক ভাবে মায়ের গর্ভফুল (প্লাসেন্টা) বার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা দরকার। নবজাতকের স্বাস্থ্যের পক্ষে সেটা ভাল। দক্ষিণ ২৪ পরগনার একাধিক সরকারি হাসপাতালে এই পদ্ধতিতে প্রসব করিয়ে সুফল পেয়েছেন চিকিৎসকেরা। অনেকটাই কমেছে নবজাতকের অসুস্থতার হার। এমনকি কম ওজনের সদ্যোজাতদের ক্ষেত্রেও। এই বিষয়ে বাংলার গবেষণার কথা গত অগস্টে প্রকাশিত হয়েছে ‘ইউরোপিয়ান জার্নাল অফ পেডিয়াট্রিকস’-এ। এই সাফল্যের পরেও কেন রাজ্যের অন্যান্য জেলায় এই ব্যবস্থা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না, প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের।

সন্তান প্রসবের তিনটি পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে গর্ভযন্ত্রণা শুরু হলে মায়ের যোনিপথ প্রশস্ত হয়। এর পর ভূমিষ্ঠ হয় নবজাতক। তৃতীয় পর্যায় হল, নাড়ি কাটার পর্ব। এই পর্যায়ে স্বাভাবিক ভাবে গর্ভফুল বার হতে অনেক ক্ষেত্রে আধ ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়। কিন্তু রক্তক্ষরণের জেরে মায়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঠেকাতে অনেক চিকিৎসকই তত ক্ষণ অপেক্ষা করেন না। আগেই গর্ভফুল টেনে বার করে রক্তক্ষরণ বন্ধের ওষুধ দিয়ে দেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় যা ‘ডিলেইড কর্ড ক্ল‌্যাম্পিং’ (ডিসিসি) নামে পরিচিত।

‘‘কেউ ভাবে না, কেন গর্ভফুলের নিজে থেকে বার হতে সময় লাগে!’’ বলছেন প্রবীণ শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অরুণ সিংহ। তাঁর মতে, গর্ভাবস্থায় নাড়ি দিয়ে যাওয়া রক্তের মাধ্যমে মা তাঁর সন্তানকে অক্সিজেন সরবরাহ করেন। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে সেই সন্তানকে বাতাস থেকে অক্সিজেন নিতে হয়। সম্পূর্ণ অচেনা পরিবেশে সন্তান যাতে ভয় না-পায়, সে জন্য নাড়ির বন্ধন আশ্বাসের কাজ করে। ‘‘এই সময় মা নবজাতককে বলেন, ভয় পেয়ো না। এই যে লম্বা দড়ি দেখছ, এর মাধ্যমে আমি তোমার হাত ধরে রেখেছি। মা সন্তানের হাত তখনই ছাড়বেন, যখন তিনি বুঝবেন সন্তান ধাতস্থ হয়েছে। সে আর হোঁচট খাবে না। তখনই গর্ভফুল বার হবে।’’ বলেন রাষ্ট্রীয় বাল সুরক্ষা কার্যক্রমের রূপকার চিকিৎসক। গর্ভফুল বার না-হওয়া পর্যন্ত সন্তানকে মায়ের বুকের উপরে শুইয়ে রাখার পক্ষপাতী তিনি। তাঁর মতে, এই পর্বে নাড়ির মাধ্যমে অক্সিজেন মিশ্রিত যে রক্ত মায়ের দেহ থেকে সন্তানের দেহে আসে, তাতে অ্যান্টিবডি, স্টেমসেল ইত্যাদি থাকে, যা মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের ‘সঞ্জীবনী’।

প্রসব পদ্ধতির এই বিকল্প ভাবনার নাম ‘ফিজিওলজিক্যাল কর্ড ক্ল‌্যাম্পিং’ (পিসিসি)। বছরখানেক আগে স্বাস্থ্যভবনের কর্তাব্যক্তিদের সামনে যা তুলে ধরেছিলেন অরুণ সিংহ। সেই ভাবনা কতটা কার্যকরী তা খতিয়ে দেখার জন্য দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে পরীক্ষামূলক ভাবে পিসিসি পদ্ধতি চালু করা হয়। ফল ভাল পাওয়া যাচ্ছে দেখে তা সম্প্রসারিত করা হয় জেলার আরও ৯টি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে— বারুইপুর মহকুমা হাসপাতাল, এম আর বাঙুর হাসপাতাল, বিদ্যাসাগর স্টেট জেনারেল হাসপাতাল, সোনারপুর গ্রামীণ হাসপাতাল এবং কুলতলি, নিমপীঠ, পদ্মেরহাট, বাসন্তী, মাঠেরদিঘি ও নলমুড়ি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের অগস্ট পর্যন্ত পিসিসি পদ্ধতিতে মোট ২৮৬৫৭ জন মায়ের সন্তান হয়েছে।

মা ও শিশুর স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়ল কি পিসিসি পদ্ধতিতে? গত বছরের জুন থেকে ডিসেম্বর, এই ৬ মাসের হিসেব বলছে, স্বাভাবিক প্রসবের (নর্মাল ডেলিভারি) ক্ষেত্রে ৯৩৪ জন মায়ের ডিসিসি পদ্ধতিতে নাড়ি কাটা হয়েছিল। তাঁদের সন্তানদের মধ্যে ১৮ জন, অর্থাৎ ২ শতাংশ, জন্ডিসে আক্রান্ত হয়। অন্য দিকে, পিসিসি পদ্ধতিতে নাড়ি কাটা ৮৭২২ জন মায়ের সন্তানদের ৪০ জন, অর্থাৎ ০.৪৫ শতাংশের জন্ডিস হয়েছিল। এর পাশাপাশি, ডিসিসি পদ্ধতিতে জন্মানো শিশুদের স্পেশ্যাল নিউবর্ন কেয়ার ইউনিটে (এসএনসিইউ) ভর্তির হার যেখানে ৬ শতাংশ, সেখানে পিসিসি পদ্ধতিতে জন্মানো শিশুদের ভর্তির হার ১ শতাংশ। কলকাতার বড় হাসপাতালে রেফারের পরিমাণও ডিসিসি পদ্ধতির ক্ষেত্রে ৯ শতাংশ। পিসিসি পদ্ধতির ক্ষেত্রে মাত্র ১ শতাংশ।

একই ছবি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রসবের (সিজারিয়ান সেকশন) ক্ষেত্রেও। ডিসিসি পদ্ধতিতে জন্ম নেওয়া ১০০৭ জন শিশুর মধ্যে যেখানে ৪৮ জন জন্ডিসে আক্রান্ত হয়েছিল, সেখানে পিসিসি পদ্ধতি জন্মানো ২০৯৩ জন শিশুর মধ্যে জন্ডিসে আক্রান্তের সংখ্যা ২৮। কলকাতায় রেফার করতে হয়েছে এমন সিজ়ার হওয়া নবজাতকের সংখ্যা ডিসিসি পদ্ধতির ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ, পিসিসি পদ্ধতিতে ২ শতাংশ। এসএনসিইউয়ে ভর্তির হারও যথাক্রমে ৪ শতাংশ এবং ২ শতাংশ!

একটি নবজাতককে এসএনসিইউয়ে রাখতে প্রতিদিন আন্দাজ দু’হাজার টাকা খরচ হয়। স্বাস্থ্যভবনের এক কর্তার কথায়, ‘‘আমরা যে ছ’মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করেছিলাম, তাতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাতটি কেন্দ্রে ৩ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা সাশ্রয় হয়েছিল। সারা রাজ্যে এটা চালু হলে বছরে প্রায় ৬০৯ কোটি টাকা বাঁচানো সম্ভব।’’ রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের আর এক আধিকারিক বলেন, ‘‘আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, পিসিসি পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়া মায়ের সংখ্যাও কমেছে।’’

পিসিসি সংক্রান্ত যে গবেষণা ‘ইউরোপিয়ান জার্নাল অফ পেডিয়াট্রিকস’-এ প্রকাশিত হয়েছে, সেটি করেছে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ। নবজাতকের, বিশেষ করে কম ওজনের শিশুর হৃৎস্পন্দন কম হওয়ায় অনেক সময় বাইরে থেকে অক্সিজেন দিতে হয়। এই গবেষণায় ১৫০০ গ্রামের কম ওজনের ৬৪টি শিশুর নাড়ি না-কেটে অক্সিজেন দেওয়া হয়। ৬৩ জনকে দেওয়া হয় নাড়ি কাটার পরে। দেখা যায়, প্রথম ক্ষেত্রে শিশুমৃত্যুর হার ২৬.৬ শতাংশ। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ৪১.৩ শতাংশ। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের হারও পিসিসি পদ্ধতির ক্ষেত্রে ৯.৪ শতাংশ। অন্য ক্ষেত্রে ২০.৬ শতাংশ। পাশাপাশি, স্বাভাবিক ওজনের ৯৮ জন নবজাতককে নাড়ি না-কেটে বাইরে থেকে অক্সিজেন দেওয়ার পরে দেখা যায় মৃত্যুর হার ৮ শতাংশ থেকে কমে ২ শতাংশ হয়েছে। প্রসবে জটিলতার কারণে নবজাতকের মস্তিষ্ক আঘাত পাওয়ার হারও ১৬ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৪ শতাংশ।

এই চমকপ্রদ সাফল্যের পরেও পিসিসি পদ্ধতিতে প্রসব এখনও কেন মূলত দক্ষিণ ২৪ পরগনাতেই সীমাবদ্ধ, সেই প্রশ্ন উঠছে। তাঁদের হাসপাতালে বিক্ষিপ্ত ভাবে কিছু প্রসব হয়েছে বলে জানাচ্ছেন এনআরএসের স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান রুণা বল। তাঁর কথায়, ‘‘এখানে যে ক’জন মায়ের গর্ভফুল বার না-হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়েছে, তাতে খারাপ কিছু ঘটেনি। তবে বড় আকারে কিছু হচ্ছে না।’’ স্বাস্থ্যভবন সূত্রের খবর, এই প্রক্রিয়ায় প্রসব করানোর চেষ্টা বাধা পেয়েছে এমনকি এসএসকেএম হাসপাতালেও। স্রোতের বিপরীতে হেঁটে নতুন কিছুকে গ্রহণ করতে সময় লাগে বলে মনে করেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ দীনেশ মুনিয়ান। ‘‘এখন অনেকে বিরোধিতা করছেন। আগামী দিনে দেখবেন ফিজিওলজিক্যাল কর্ড ক্ল‌্যাম্পিং পদ্ধতিতেই সকলে প্রসব করাচ্ছেন।’’ বলেন তিনি।

মঙ্গলবার স্বাস্থ্যভবনে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন অরুণ সিংহ। ক্যানিংয়ে প্রয়োগ করা প্রসব পদ্ধতির সাফল্যের কথা মন্ত্রীকে জানিয়েছেন। সারা রাজ্যে তা চালু করার অনুরোধ জানিয়েছেন। মন্ত্রী নিজেও চিকিৎসক। ‘‘উনি শুনেছেন। দেখি কী হয়।’’ বৈঠক সেরে বেরিয়ে মন্তব্য অরুণ সিংহের। আর মন্ত্রী বলছেন, ‘‘অরুণ সিংহকে আমি ব্যক্তিগত ভাবে খুবই শ্রদ্ধা করি। তিনি অবসর নিয়েছেন। ফলে তাঁকে আনার ক্ষেত্রে কিছু আইনগত পদক্ষেপ আছে। আমি তো একা সরকার চালাচ্ছি না। আমার পরিকল্পনাগুলো মুখ্যমন্ত্রীকে জানাব। শেষ কথা তিনিই বলবেন।’’

Umbilical cord Newborn Babies Newborn Death

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy