কানে আসছিল কিন্তু স্পষ্ট হচ্ছিল না গানের কথা— ‘শুভেন্দু’দা বস্’, নাকি ‘শুভেন্দু, দ্য বস্’?
চার চাকার মালবাহী যে গাড়িকে আমরা ‘ছোট হাতি’ বলে জানি, তাতে ডিজে বক্সে এই রকমই একটি গান বাজিয়ে ভরদুপুরে নন্দীগ্রাম মাথায় করছেন গলায় আর মাথায় গেরুয়া গামছা জড়ানো জনা বারো-পনেরো তরুণ। ভোটের চার দিন আগেই সকলের শরীরী ভঙ্গিতে হালকা নাচের ভাব, জয়েরই উচ্ছ্বাস!
নন্দীগ্রামে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে নিয়ে বাঁধা এই গান অস্বাভাবিক কিছু নয়। কম-বেশি দুই দশক ধরে এখানকার রাজনীতিতে নিজেকে ‘বস্’ প্রমাণ করে চলেছেন তিনি। গত ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে জয়যাত্রা এক ধাক্কায় ওই স্তরেই নিয়ে গিয়েছেন তাঁরই একদা সঙ্গী। এ বার ভবানীপুরে মমতাকে হারানোর পরে নন্দীগ্রাম ছেড়ে দিয়েও নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনের সর্বত্র ‘বস্’ শুভেন্দুর উপস্থিতিই স্পষ্ট। বিজেপি প্রার্থী হিসেবে ভোট-যন্ত্রে শুধু নামেই আছেন শুভেন্দুর প্রাক্তন ব্যক্তিগত সহায়ক, দুষ্কৃতীদের গুলিতে নিহত চন্দ্রনাথের মা, হাসিরানী রথ।
প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কংগ্রেসের ‘হাত’, বামেদের ‘কাস্তে আর ধানের শিস’ রয়েছে। কংগ্রেস একটু এগিয়ে তবে প্রচার আর প্রস্তুতির তুলনায় দুই বিরোধীকে বিক্ষিপ্ত, বিচ্ছিন্ন মনে হতেই পারে। গোটা নন্দীগ্রাম ছেয়ে আছেন শুভেন্দু, তাঁর সঙ্গে বিজেপি আর প্রতীক পদ্ম। একপ্রান্ত রেয়াপাড়া থেকে পারুলবাড়ি, সামসাবাদ, তেখালি ব্রিজ পর্যন্ত, আবার দাউদপুর, বাঁশুলি চক, নন্দীগ্রাম বাজার— যেখানে চোখ যায়, সেখানে শুধু শুভেন্দু। বাজারের ভিড়ে, ধানিজমির ধারে, পুকুরের পাড়ে সাদা পাজামা- পাঞ্জাবি আর ঘিয়ে জহরকোটে হাসিমুখে নমস্কারের ভঙ্গিতে, কোথাও ছবিতে, কোথাও কাট-আউটে। এ সব তো আছেই, সেই সঙ্গেই ক’দিন আগে ‘ভোট করতে’ জানেন বলে বিরোধীদের উদ্দেশে যে বার্তা শুভেন্দু দিয়েছিলেন, তা যথার্থ প্রমাণ করছে ‘নন্দীগ্রাম বিজেপি পরিবার’। শুভেন্দু যখন তৃণমূলের নেতা তখনও যেমন ছিল, তিনি এখন বিজেপিতেও তেমনই। বিধায়ক হিসেবে যে দফতর চালু করেছিলেন, এখন সেখানে নির্বাচনী কাজের ব্যস্ততা, টানটান। এখন মুখ্যমন্ত্রী, তাই এখানকার ভোট-যন্ত্রের তার আরও একটু টান করে বেঁধেছেন।
মমতার ২০২১ সালের ভোটে হারের পরে ২০২৬ সালে একটু গুছিয়ে নেমেছিল কালীঘাট। শুভেন্দুর বিরুদ্ধে নন্দীগ্রামের কৌশল সাজিয়েছিলেন তৎকালীন তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং। সেই ‘যুদ্ধে’ বদলের ভাবনা নিশ্চয়ই ছিল, তবে আগের ভোটে হারের বদলা নেওয়ার ভাবনাই ছিল বেশি। শেষ পর্যন্ত তা কাজে আসেনি। এই অবস্থায় এ বারের লড়াই অনেকটাই সহজ শুভেন্দু তথা বিজেপির। দলীয় প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান সরে দাঁড়ানোর পরে মমতা কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ভোটের আলোচনায় সামান্য নাড়াচাড়া শুরু হয়েছে। কারণ, হেরে গেলেও ২০২১ ও ২৬ -এ মমতার তৃণমূলের ভোট ছিল ৪৮ ও ৪৭%-এর মতো। সে দিক থেকে ব্যবধানের অঙ্কই যেন এ বারের ভোটের আকর্ষণ আর জয়কে ‘বস্’- সুলভ করাই চ্যালেঞ্জ শুভেন্দুর।
ভোটের নিয়ম মেনে জয়ের দাবি করলেও ভোট বাড়ানোর মূল লক্ষ্যও গোপন করছে না কংগ্রেস। নন্দীগ্রামে কংগ্রেসের ভারপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক রণজিৎ মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘বিজেপি তো বটেই, ধারাবাহিক ভাবে ভোট নিয়ে মানুষকে হতাশ করেছেন শুভেন্দুও। এ বার তৃণমূলের ভোট আমরা পাব, সেই সঙ্গে সেই হতাশার প্রতিফলনে অঘটনও ঘটতে পারে।’’ সেই সঙ্গে জমি আন্দোলনের মামলায় বহু বছর পরে ভোটের মুখে মিলনকে গ্রেফতার করার ফলও তাঁদের দিকে আসবে বলেও দাবি কংগ্রেসের। এই অবস্থায় তৃণমূলের অন্য অংশ (গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস) বা আইএসএস প্রার্থী দিলেও তাঁদের উপস্থিতি কম। হাতছাড়া পুরনো ঘাঁটিতে বামফ্রন্টকে প্রাসঙ্গিক রাখতে চেষ্টা করছেন পরিচিত সিপিআই প্রার্থী শান্তিগোপাল গিরি। প্রচারে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি। পাড়ায় পাড়ায় নন্দীগ্রামের ‘গণতান্ত্রিক আর ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার কথা বলছেন তিনি। কিন্তু ‘জমি’র লড়াইয়ে এখনও দুর্বলই বামেরা। মিছিল করে চিকিৎসা, স্বাস্থ্য পরিষেবা আর কর্মসংস্থানের কথা বলছেন বটে, স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর গড় রক্ষার আয়োজনের সামনে তা বড় ফিকে।
নন্দীগ্রামের মাটিতে ইঙ্গিত স্পষ্ট, এ বারের ভোটও শুধু রাজনৈতিক শক্তি আর ভিত্তির দলিল হয়ে থাকবে। কারণ, জমি আন্দোলনের পর থেকে সেই লড়াই-ই সব কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে। নন্দীগ্রাম বাজারে দাঁড়িয়ে এই উপলব্ধির কথা বলছিলেন গত ১০ বছর ধরে শিক্ষকতার চাকরির অপেক্ষায় থাকা তরুণ। ঠিক ২০২১ সালে যা শুনেছিলাম চণ্ডীপুরের থেকে নন্দীগ্রামের টেঙ্গুয়ামুখী ট্রেকারের সহযাত্রী তরুণীর মুখে।
ভোটের ফল নিয়ে প্রশ্ন করলে ‘বস্’ বলছেন— আর কত বার পরীক্ষায় বসাবেন নন্দীগ্রামের মানুষকে?
জয় হয়তো নিশ্চিত তবে শুভেন্দুই বোঝেন, নন্দীগ্রামে মমতা-তৃণমূলের ‘নাম’, ‘নিশান’ নিশ্চিহ্ন হওয়ার গুরুত্ব ঠিক কী। কারণ, তৃণমূল প্রার্থী হিসেবে ২০১৬ সালের ভোটে তিনিই তখনকার দলীয় প্রতীক (জোড়াফুল) ও ব্যক্তিগত প্রভাবে জয়ের ব্যবধান নিয়ে গিয়েছিলেন ৮১ হাজারে। আর ‘ফুল’ বদলের প্রভাব গত দুই নির্বাচনে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। এ বার প্রতীক না-থাকলেও মেরুকৃত হয়ে থাকা এখানকার কম-বেশি ২৫% সংখ্যালঘু ভোটের অভিমুখও একমাত্র ভাবতে পারেন তিনিই। তাই তৃণমূলের সেই সমর্থনে ভাগ বসাতে সভায় সভায় সংখ্যালঘুদের উদ্দেশেও ‘বন্ধুত্বের’ প্রস্তাব দিয়ে চলেছেন। প্রচারের শেষ লগ্নে মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, ‘‘বন্ধুত্বের ডাকে কিছু জায়গায় সাড়া মিলবে, বাকিটা দেখা যাক। নন্দীগ্রামে ৭২ হাজার সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন। আগে তিনটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, প্রত্যেকটা বুথে এক শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটও আমরা পাইনি। ওঁদের বোঝানো হয়েছিল, বিজেপি হিন্দুদের পার্টি। কিন্তু এ বার ওঁরা নিজেরাই আমাদের সংখ্যালঘু বুথে প্রচারের সুযোগ করে দিয়েছেন।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘না-আঁচালে বিশ্বাস নেই। তবে মনে করছি, নন্দীগ্রামের মানুষ এ বার রাজ্য সরকারের সঙ্গেই থাকবেন।’’
আপাতত বিজেপি-ময় রাজ্যে এই উপনির্বাচন আর দলের নয়, নিজেকে ‘বস্’ প্রমাণের পরীক্ষা শুভেন্দুরই। প্রশ্নও নির্দিষ্ট, প্রতিপক্ষকে এ বারও কি ভারেই কাটতে হবে? না ব্যবধানে ধারের প্রমাণও দিতে পারবেন তিনি?