E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

কর্ম মিশে ধুলোয়, মন মজে ধর্মেই

নদীর এক পারে শক্তিপুর। অন্য পারে রেজিনগর। গঙ্গার দু’পারই এক বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে। দু’পারের বাসিন্দা ফয়জল, গোকুলেরা জানেন, রাস্তা-জল-আলোর প্রশ্নে তাঁরা পিছিয়ে আছেন।

সন্দীপন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:১৭

—প্রতীকী চিত্র।

সামনে চলে আসেন। পেছনে হ্যাচাল পাবেন।

হাতের ইশারায় পাশের আসনে বসতে বলেন ফয়জল মণ্ডল। ‘‘গাড়ি লাফাবে তো, তাই বললাম।’’ গঙ্গাপাড়ের রাস্তা থেকে শক্তিপুরের বাজারের দিকে টুকটুক (বাকি বাংলা যাকে টোটো বলেই ডাকে) চলতে শুরু করে ফয়জলের, সঙ্গে চলে জীবনের রোজনামচা। নানা দিকে মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, মসজিদের মাইক খুলে নিতে হচ্ছে, দুর্বিপাকের গল্প বলেন প্রৌঢ়। আর বাজারের, রাস্তার হাল? ‘‘সে তো যেমন দেখছেন। মুখ্যমন্ত্রীও এই রাস্তা দিয়ে গেলেন তো।’’ পাহাড়ের খাদ বেয়ে নুড়ি গড়ানোর মতো লাফাতে লাফাতে টুকটুকে সওয়ারি বহনই ভবিতব্য বলে যেন ধরে নেওয়া আছে ফয়জলের। ধর্ম-জীবনের সমস্যাটা ভাবাচ্ছে বেশি।

বাজারে পেঁপের বস্তা বাঁধতে বাঁধতে গোকুল ঘোষের জীবনও এক তারেই বাঁধা। ‘‘চিনির দাম, ডালের দাম একটু বেশি যাচ্ছে, অসুবিধা আছে ঠিকই। কিন্তু এই দিকে না, ওই ওরা একটু চাপে সোজা হয়েছে। রাস্তায় মুরগি মরলে আর টাকা দিতে হচ্ছে না!’’

নদীর এক পারে শক্তিপুর। অন্য পারে রেজিনগর। গঙ্গার দু’পারই এক বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে। দু’পারের বাসিন্দা ফয়জল, গোকুলেরা জানেন, রাস্তা-জল-আলোর প্রশ্নে তাঁরা পিছিয়ে আছেন। কিন্তু পরিষেবা পাওয়া যে অধিকার, সে সব ভাবনা কোথায় লুটিয়ে আছে ভাঙা পথের ধুলোয়! ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে জীবন বেঁধে ফেলেছে মুর্শিদাবাদের এই তল্লাট!

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের কয়েক মাসের মধ্যে প্রথম উপনির্বাচন রাজ্যের যে দুই বিধানসভা কেন্দ্রে, তার মধ্যে রেজিনগরে বাকি সব কথা ও চরিত্রই যেন গৌণ। এক দল যত সংখ্যাগুরুর বিশ্বাসের দাপট দেখাবে, সংখ্যালঘু মন তত পাল্টা বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরবে। এই সার কথা যেন রেজিনগরের পাড়া-গ্রামে ফলিত রূপে দেখা যায়। রেজিনগরে প্রায় ৬৫%-এর বেশি সংখ্যালঘু ভোট। তার সিংহভাগ পকেটে পুরে গত বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবীর। নিজে বিধায়ক-পদ ছেড়ে ছেলে গোলাম নবি আজাদকে (রবীন) প্রার্থী করেছেন বটে, তবে ছেলে নেহাতই নিমিত্ত। আসলে লড়াইটা হুমায়ুনেরই। কংগ্রেস প্রার্থী মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদের বিরোধী দলনেতা আবদুল্লাহিল কাফি, মমতা-তৃণমূলের প্রার্থী প্রাক্তন বিধায়ক রবিউল আলম চৌধুরী, গণতান্ত্রিক তৃণমূলের প্রার্থী জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ সফিউফজ্জামান শেখ (হাবিব মাস্টার) এবং সিপিএমের প্রার্থী (অন্য শরিকদের সরিয়ে এই প্রথম বার সিপিএম রেজিনগরে নিজেরা লড়ছে) আইনজীবী মহম্মদ সইদ— প্রত্যেকেই সাধ্যমতো বিজেপির ‘বিপদ’ বোঝাচ্ছেন এবং উপনির্বাচন থেকে একটা বার্তা পাঠানোর ডাক দিচ্ছেন। আর বিজেপি অঙ্ক কষছে, ভোট যত ভাগ হয়, ততই লাভ!

সরকার গড়ার পরে প্রথম উপনির্বাচনে জোড়া কেন্দ্রেই জয় নিয়ে আসার বাড়তি দায়িত্ব নিজের উপরে তুলে নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। প্রচারে যাচ্ছেন, দলের কৌশল বেঁধে দিচ্ছেন। আর মুখ্যমন্ত্রীর তৎপরতা দেখে পুলিশ-প্রশাসন ধরে আনার বদলে বেঁধেই আনছে! পুলিশি ধরপাকড়ের বিরুদ্ধে হুমায়ুন থানায় ধর্না দিয়েছেন, মানবাধিকার কমিশনে গিয়েছেন। হুমায়ুনের সঙ্গে আর সব বিষয়ে ভিন্নমত হলেও অধীর চৌধুরী থেকে কুণাল ঘোষ, মহম্মদ সেলিম থেকে আখরুজ্জামান— সকলেই উপনির্বাচনে প্রশাসনিক ‘জবরদস্তি’র বিরুদ্ধে সরব। বিজেপির প্রার্থী এবং দলের সাংগঠনিক জেলার প্রাক্তন সভাপতি শাখারভ সরকার অবশ্য তাতে আমল দিতেই নারাজ। তাঁর মতে, ‘‘এটা সরকার গড়ার ভোট নয়। সরকারের সঙ্গে থাকার ভোট। এত বছর এত রকম সরকার এসেও রেজিনগরে রাস্তা, কলেজ, হাসপাতালের মতো বিষয়ে নজর দেয়নি। মানুষ সেই কারণেই বিজেপির উপরে ভরসা রাখবেন।’’

স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীও বলে গিয়েছেন, ভোটে পদ্ম ফুটলেই উন্নয়নকে দুয়ারে হাজির করানো হবে। হুমায়ুনের নাম না-করে বলেছেন, ‘‘অধীর চৌধুরীকে ছুরি মেরেছিলেন। মন্ত্রী হয়ে এখানে দাঁড়িয়েছিলেন (২০১৩ সালের উপনির্বাচন), মানুষ হারিয়ে দিয়েছিল। মুকুল রায় আশ্রয় দিয়েছিলেন। বিজেপির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তৃণমূলে গিয়ে শুধু ধর্মীয় বিভাজন করেছেন।’’

নদীর এ’পার থেকে মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারির পাল্টা ও’পারে বসে হুমায়ুন বলছেন, ‘‘যে দলটার উত্থান হয়েছে মসজিদ ভেঙে, সারা দেশে শুধু হিন্দু-মুসলিম করছে, সেই দলের নেতা এখানে বলছেন হিন্দু-মুসলিম করবেন না! দ্বিচারিতারও একটা সীমা থাকে!’’ এমনিতেই হুমায়ুনের কথার প্যাঁচ কখন কোথায় গিয়ে কাটবে, কেউ জানে না! কয়েক দিন আগে মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে তাঁর বিচিত্র, কুৎসিত মন্তব্য আদতে বিজেপিরই মদত করেছে বলে চর্চা চলছে। বিধানসভা ভোটের আগে ছেতিয়ানিতে বাবরি মসজিদের শিলান্যাস করেছিলেন। এখন আবার বলে রাখছেন, উপনির্বাচনে জিতুন বা হারুন, বাপ-ব্যাটায় গিয়ে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে পড়বেন। নালিশ করবেন, বাংলার বিজেপি ঠিক পথে চলছে না!

ধুলো-গরম সামলে, কখনও টুকটুকে উঠে কাফিকে নিয়ে এলাকায় এলাকায় ঘুরছেন প্রাক্তন সাংসদ অধীর। কংগ্রেস নেতার কথায়, ‘‘এই ভাগাভাগি-কাটাকাটির মধ্যে যতটা পারা যায়, করছি। যদি ধরেও নেওয়া হয়, হুমায়ুন বিজেপির সাঙ্ঘাতিক বিরোধী, তা হলেও এই একটা-দু’টো কেন্দ্রের বাইরে কোথায় কী করবেন! কংগ্রেস সারা দেশে বিজেপির সঙ্গে লড়ছে।’’ একই চেষ্টায় দলীয় প্রার্থীকে নিয়ে দৌড়চ্ছেন সিপিএমের বিধায়ক মোস্তাফিজুর রহমান (রানা)। তিনি বলছেন, ‘‘বিজেপির বিরোধিতার হাওয়া তো আছেই। কিন্তু প্রশাসনকে দিয়ে ভোট করানোর যে কৌশল তৃণমূলের ছিল, বিজেপি সেটাই শুরু করছে।’’

এক দিকে উন্নয়নের ‘টোপ’ আর অন্য দিকে বিজেপিকে রুখতে সংখ্যালঘুদের কোনও এক পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনার চর্চা। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক শিবিরে আলোচনা বিস্তর। তবে তকিপুরের দুলাল ঘোষ নির্বিকার বলে দিচ্ছেন, ‘‘ভোট হয়ে গেলে কেউ তো খোঁজ নেয় না। গেল বার বিধানসভা ভোটের পরে আমাদের শনি মন্দিরটা বাঁধিয়েছে, এটা ভাল হয়েছে।’’

গঙ্গা সাক্ষী, জীবনের মাপ মন্দির-মসজিদে হচ্ছে!

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Rejinagar Mamata All India Trinamool Congress Democratic Trinamool Congress BJP CPIM Congress

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy