ভুয়ো চিকিৎসক অভিযোগে ধরা পড়েছিলেন। বছর পাঁচেক আগে এক বার গ্রেফতারও হয়েছিলেন। তার পরে কিছু দিন সব ‘চুপচাপ’। অভিযোগ, ফের নতুন রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে শুরু করেছেন রোগী দেখা। তাঁর দাবি অনুযায়ী ওই রেজিস্ট্রেশন দিল্লির। আবার, প্রেসক্রিপশনে নামের আগে ডাক্তারের সঙ্গে রয়েছে দেশ-বিদেশের একাধিক ডিগ্রি। লিখছেন মডার্ন মেডিসিনের ওষুধ। এটাও দাবি করছেন, তিনি ‘কমিউনিটি অ্যালোপ্যাথি’-র চিকিৎসক!
যদিও মডার্ন মেডিসিনের চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, ‘কমিউনিটি অ্যালোপ্যাথি’ বলে কোনও বিষয় নেই। ভুয়ো চিকিৎসক হিসেবে কল্যাণী থানায় ফের এ আর ফারুকি নামের ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছে। ২০২১-এ কল্যাণী থানা ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছিল। সেই সময় তিনি যে রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছিল, সেটি অন্য এক চিকিৎসকের বলেও পুলিশি তদন্তে জানিয়েছিলেন রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের তৎকালীন রেজিস্ট্রার। পাশাপাশি, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, তামিলনাডু, অন্ধ্রপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশের মেডিক্যাল কাউন্সিলেও ওই নম্বরে যে চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন রয়েছে তিনি ওই ব্যক্তি নন বলেও জানিয়েছিল এ রাজ্যের কাউন্সিল। সূত্রের খবর, গ্রেফতার হলেও পরে জামিনে ছাড়া পেয়ে কিছু দিন অন্তরালে থাকার পরে ফের ডাক্তারি শুরু করেছেন কল্যাণীতে প্র্যাকটিস করা হুগলির বাসিন্দা ওই ব্যক্তি।
সম্প্রতি ১৫ জন ভুয়ো চিকিৎসকের খোঁজ পেয়েছে স্বাস্থ্য দফতর। অভিযোগ, ভুয়ো চিকিৎসক ধরা পড়ে, আবার জামিন মুক্ত হয়ে ফের ডাক্তারি শুরু করে। প্রশ্ন হল, যেখানে মানুষের জীবনের প্রশ্ন সেখানে এমন ভুয়ো ডাক্তাররা বার বার পার পেয়ে যায় কী ভাবে? কেন দ্রুত মামলার নিষ্পত্তি হয়ে শাস্তির ব্যবস্থা হয় না? অকুতোভয় মনোভাবের নেপথ্যের কারণ কী? তা হলে কি ভুয়ো-ডাক্তার দুর্নীতি চক্রের শিকড় অনেক গভীরে?
ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরাম (ডব্লিউবিডিএফ)-এর সভাপতি কৌশিক চাকী বলেন, ‘‘এক জন ভুয়ো চিকিৎসক জামিন পেয়ে গেলেন! সবটা জানার পরেও তৎকালীন মেডিক্যাল কাউন্সিল বা স্বাস্থ্য দফতরও কেন কোনও পদক্ষেপ করেনি, সেটাও অজানা।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘চিকিৎসার নামে মানুষের প্রাণ নিয়ে খেলা খুনের সমতুল্য। কড়া শাস্তির জন্য আইনের সংশোধন বা নতুন ভাবে আইন প্রণয়নে সরকারের নজর দেওয়া প্রয়োজন।’’ না হলে ভুয়ো ডাক্তার ধরেও আখেরে কোনও লাভ নেই বলে দাবি চিকিৎসকদেরই।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী চিকিৎসক শারদ্বত মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘কমিউনিটি অ্যালোপ্যাথি বলে কিছু হয় না। এরা সব ভুয়ো ডাক্তার। আর, এ রাজ্যে অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসার জন্য রেজিস্ট্রেশন না নেওয়া ফৌজদারি অপরাধ। আইনে গ্রেফতারির কথা বলা আছে। ভুয়ো চিকিৎসক-দুর্নীতি চক্রের বিষয়ে নজর রাখা হচ্ছে।’’
২০২১-এ গ্রেফতারির বিষয়ে এ আর ফারুকির দাবি, ‘‘ভুল রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছিল।’’ এখন অবশ্য যে রেজিস্ট্রেশন নম্বর (০০১/ ডিএল /১০৮৪) প্রেসক্রিপশনে রয়েছে সেই বিষয়ে তাঁর দাবি, ‘‘ওটা কমিউনিটি অ্যালোপ্যাথির, দিল্লির রেজিস্ট্রেশন। ছ’বছর আগে পেয়েছি। আমার সবই বাইরে থেকে করা।’’ কিন্তু নিয়মানুযায়ী ভিন্ রাজ্য থেকে পাশ করলে, এ রাজ্যে প্র্যাকটিসের জন্য ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিল থেকে রেজিস্ট্রেশন নিতে হয়। গ্যাস্ট্রোএন্ট্রেরোলজি এবং ডায়াবিটিসের চিকিৎসক পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তির দাবি, ‘‘না ওটা করা হয়নি। আবেদন করেছি।’’ আরও দাবি, চেন্নাই থেকে এমবিবিএস পাশ করেছেন। যদিও প্রেসক্রিপশনে সেই রেজিস্ট্রেশন নম্বরের উল্লেখ নেই।‘ডব্লিউবিডিএফ’-এর তরফে শুক্রবার কল্যাণী থানায় দায়ের হওয়া অভিযোগের সঙ্গে যে প্রেসক্রিপশন দেওয়া হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে যকৃতের আলসার, টাইপ-২ ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ, দীর্ঘ দিনের ব্যাথা এবং অ্যালার্জির ওষুধ লেখা হয়েছে।