E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

তৃণমূলের হারে উল্লাস নয়, কৌশলী বার্তা রাহুলের

রাহুলের ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থাকা’-র বার্তায় পশ্চিমবঙ্গের প্রদেশ কংগ্রেসে বিভ্রান্তি বেড়েছে। কারণ, বিধানসভা ভোটে কংগ্রেস রাজ্যে তৃণমূল বিরোধিতার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় দু’টি আসন জিতেছে।

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৬ মে ২০২৬ ০৯:১৯
রাহুল গান্ধী।

রাহুল গান্ধী। — ফাইল চিত্র।

তৃণমূল কংগ্রেস বাংলায় ধরাশায়ী হওয়ার পরেই কংগ্রেসের একাধিক নেতা মন্তব্য করেছিলেন, ‘এ বার মমতাদিদি বুঝতে পারবেন রাহুল গান্ধীকে কোন পরিস্থিতিতে জাতীয় স্তরে বিজেপির সঙ্গে লড়তে হয়!’ আজ রাহুলই দলের ও বিরোধী শিবিরের নেতাদের বার্তা দিলেন, তৃণমূলের হারে যাঁরা উল্লাস করছেন, তাঁদের বুঝতে হবে, বাংলা ও অসমের ভোটের ফলাফল চুরি করা হয়েছে। দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করার পথে এটা বিজেপির বড় পদক্ষেপ। রাহুলের বার্তা, “ক্ষুদ্র রাজনীতি সরিয়ে রাখুন। এটা একটা দলের বিষয় নয়। দেশের বিষয়।”

রাহুলের এই ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থাকা’-র বার্তায় পশ্চিমবঙ্গের প্রদেশ কংগ্রেসে বিভ্রান্তি বেড়েছে। কারণ, বিধানসভা ভোটে কংগ্রেস রাজ্যে তৃণমূল বিরোধিতার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় দু’টি আসন জিতেছে। রাহুলও ভোটের প্রচারে গিয়ে বলেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের দুর্নীতি ও ভুল নীতির ফলেই বাংলায় বিজেপির পায়ের তলার জমি শক্ত হয়েছে। অথচ এখন ভোটের ফলের পরে রাহুল তৃণমূলের প্রতি সদর্থক বার্তা দিচ্ছেন।

কংগ্রেস শিবিরের ব্যাখ্যা, রাহুল বার্তা দিচ্ছেন যে নিজেদের রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এম কে স্ট্যালিন, অরবিন্দ কেজরীওয়ালদের পরাজয়ের পরে তিনিই ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিরোধী শিবিরের প্রধানমন্ত্রী-মুখ হওয়ার একমাত্র দাবিদার। তাই বাকি সব বিরোধী দলের নেতানেত্রীদের উচিত, রাহুলের নেতৃত্বেই নরেন্দ্র মোদীকে হারানোর জন্য একজোট হওয়া। একই সঙ্গে তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে সাহায্য নিয়ে ‘ভোট চুরি’-র অভিযোগ তুলেও নতুন করে প্রচারে নামতে চাইছেন। সোমবার রাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ১০০টি আসন চুরির অভিযোগ তোলার পরেই সহমত জানিয়ে রাহুল বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের আগে মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনেও একই ‘খেলা’ হয়েছে।

শিবসেনা (উদ্ধব)-এর নেতা সঞ্জয় রাউত কার্যত রাহুলের নেতৃত্বে সিলমোহর দিয়ে বলেছেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটের আগে রাহুল গান্ধীর (ভোট চুরি নিয়ে) কথা না শুনে ভুল করেছে। তিনি যদি রাহুলের সঙ্গে বসে এ বিষয়ে আলোচনা করতেন, আজ ভাল জায়গায় থাকতেন। রাহুল গান্ধীর দূরদৃষ্টি রয়েছে। তিনি যা বলেন, সেটাই সত্যি হয়।” রাহুলের ‘ভোট চুরি’-র অভিযোগের সঙ্গে গলা মিলিয়ে অরবিন্দ কেজরীওয়ালও অভিযোগ তুলেছেন, বিজেপি গণতন্ত্র ‘হাইজ্যাক’ করে নিয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, “যে বিজেপি প্রবল মোদী-ঝড়ের মধ্যে ২০১৫-তে দিল্লি ও ২০১৬-তে পশ্চিমবঙ্গে মাত্র তিনটি করে আসন পেয়েছিল, সেই বিজেপি নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তা পাতালে নেমে যাওয়ার পরে কী ভাবে দিল্লি ও বাংলা জিতে নিল?” উল্টো দিকে বিজেপির হয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান প্রশ্ন তুলেছেন, ‘ভোট চুরি’ হলে কেরলে কংগ্রেস জিতল কী ভাবে? তাঁর বক্তব্য, শুধুমাত্র কংগ্রেস জিতলেই রাহুল গান্ধীর চোখে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় থাকে।

সোমবার সন্ধ্যায় বাংলায় তৃণমূলের হার স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরে রাহুল ও সনিয়া গান্ধী দু’জনেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। কংগ্রেস শিবিরের বক্তব্য, এখানেই গান্ধী পরিবার আলাদা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত লোকসভা নির্বাচনের সময় ‘ইন্ডিয়া’ জোটে থেকেও কংগ্রেসকে কোনও আসন ছাড়তে চাননি। রাহুল আদানি গোষ্ঠী নিয়ে সরব হলে তৃণমূল পাশে থাকেনি। রাহুল যখন ভোটার তালিকায় কারচুপির কথা বলেছিলেন, তখন তৃণমূল চুপ থেকেছে। কিন্তু এখন সনিয়া, রাহুল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের খারাপ সময়ে তাঁর পাশে থাকছেন। এর ফলে বিরোধী শিবিরে রাহুল গান্ধীর গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।

বিরোধী শিবিরে পাল্টা প্রশ্ন উঠেছে, বিজেপির বিরুদ্ধে মুখোমুখি লড়াইয়ে কংগ্রেসের ব্যর্থতার যে ইতিহাস, তাতে কি রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোট মোদী-শাহের বিজেপির বিরুদ্ধে লড়তে পারবে? ‘টিম রাহুল’-এর পাল্টা যুক্তি, ২০১৪-য় নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পরে কংগ্রেস মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়, রাজস্থান, কর্নাটক, হিমাচলে বিজেপিকে হারিয়ে সরকারে এসেছে। জেএমএম-কংগ্রেস জোট ঝাড়খণ্ডে বিজেপিকে হারিয়েছে। বিজেপির আধিপত্য, প্রতিষ্ঠান দখল, অর্থের জোরের পরেও কংগ্রেস জিততে পেরেছে। কোনও আঞ্চলিক দলের এই রেকর্ড নেই। তাই রাহুল ঠিকই বলেন যে একমাত্র কংগ্রেসই বিজেপিকে রুখতে ও হারাতে পারে।

যদিও আম আদমি পার্টির মুখপাত্র প্রিয়ঙ্কা কক্কর অভিযোগ তুলেছেন, লোকসভার বিরোধী দলনেতা বিরোধী ঐক্য চান। কিন্তু সুযোগ পেলে তিনি দিল্লি ও বাংলায় বিজেপি বিরোধী অন্য দলকে নিশানা করতেও ছাড়েন না। শিবসেনা (উদ্ধব)-এর নেত্রী প্রিয়ঙ্কা চতুর্বেদীও বলেছেন, এখন যেমন তৃণমূল, ডিএমকে-র হারের পরে ইন্ডিয়া জোটের অনেকে উল্লসিত, তেমন অরবিন্দ কেজরীওয়াল, তেজস্বী যাদবের হার, আপ-এর ভাঙনের পরেও উল্লাস দেখা যায়। বিরোধীদের এই বিভাজনেরই সুবিধা বিজেপি নেয়।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Rahul Gandhi INDIA Alliance

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy