এক সময় দেশের তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র হয়ে ওঠার দৌড়ে প্রবল ভাবে ছিল অন্ধ্রপ্রদেশ। এ বারে সেই রাজ্যের সঙ্গেই প্রতিযোগিতায় নামল পশ্চিমবঙ্গ। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে সংশ্লিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীগুলির বিনিয়োগ টানতে আপাতত জোর টক্কর বিজেপি শাসিত পশ্চিমবঙ্গ ও এনডিএ শাসিত অন্ধ্রের মধ্যে। কোয়ান্টাম প্রযুক্তির বাড়বাড়ন্তের কথা মাথায় রেখেই এখন দুই রাজ্য সংশ্লিষ্ট শিল্পমহলের মনোভাব বুঝতে মাঠে নামছে। সেই লক্ষ্যে তৈরি করছে ‘কোয়ান্টাম মিশন’ নীতিও।
এখন যে কম্পিউটার প্রযুক্তি চলছে, তা মূলত কোড-নির্ভর। কোয়ান্টাম প্রযুক্তি তার থেকে বড় ধরনের উত্তরণ। এই প্রযুক্তি সুপার-কম্পিউটারের চেয়েও অনেক বেশি দ্রুত গতির এবং নিখুঁত। তাই গোটা বিশ্বে এ নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই প্রযুক্তিই ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত হবে। ফলে তাকে কেন্দ্র করে তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসাবিজ্ঞান-সহ বহু ক্ষেত্রের অগ্রগতি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। তথ্যপ্রযুক্তিতে সব থেকে অগ্রণী রাজ্য, কংগ্রেস শাসিত কর্নাটক এর মধ্যেই কোয়ান্টাম প্রযুক্তি নিয়ে উৎসাহী। এখন পশ্চিমবঙ্গও এই বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে। বেশ কিছু দিন আগে কোয়ান্টামের অন্যতম অগ্রগণ্য সংস্থা ‘কোয়ান্টিনাম’-এর প্রেসিডেন্ট এবং সিইও রাজীব হাজরার সঙ্গে এ নিয়ে বৈঠক করেছে রাজ্য সরকার। তাঁকে জানানো হয়েছে রাজ্যের আগ্রহের কথা। সঙ্গে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে সল্টলেকে আট হাজার বর্গফুট এলাকা জুড়ে কোয়ান্টাম গবেষণা কেন্দ্র তৈরি করেছে টিসিজি ক্রেস্ট। ফলে কোয়ান্টাম প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসাবে এ রাজ্য এগিয়ে থাকছে অনেকটাই। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্যের প্রস্তাব প্রাথমিক ভাবে পছন্দ হয়েছে কোয়ান্টিনাম-কর্তার। সেই সূত্রেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার কোয়ান্টাম নিয়ে যাতে একটি নীতি তৈরি করে, তার উপর জোর দেওয়া হয়েছে বৈঠকে। রাজ্যও পাল্টা এ নিয়ে শিল্পমহলেরমনোভাবের কথা জানতে চেয়েছে। তার ভিত্তিতেই আগামী দিনে তৈরি হতে পারে এই সংক্রান্ত নীতি।
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, এই ক্ষেত্রে সরকার, শিল্প এবং গবেষণা সংস্থাগুলি একত্রে অংশীদার হিসাবে কাজ করবে। মিশন-নীতি তৈরির আগে কার কী ভূমিকা থাকবে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। শিল্প এবং গবেষণা সংস্থাগুলি রাজ্যের থেকে কী প্রত্যাশা করে এবং তাদের কী প্রয়োজন, তা জানতে চাইছে নবান্ন। কারণ, সব কিছু জেনে এই সংক্রান্ত নীতি তৈরি হলে, তবেই তা বাকিদের আকৃষ্ট করবে। একবার কোয়ান্টাম গবেষণা বা সংশ্লিষ্ট শিল্পক্ষেত্রের চাকা এ রাজ্যে গড়াতে শুরু করলে, তাকে কেন্দ্র করে আরও বহু ধরনের সংস্থা আগ্রহী হবে বিনিয়োগে। ফলে একে কেন্দ্র করে পুরোদস্তুর একটি ‘হাব’ তৈরি করে ফেলা অসম্ভব নয়। প্রযুক্তির সূচনালগ্নে পশ্চিমবঙ্গ যুক্ত থাকলে ভবিষ্যতে আরও বড় সুফল রাজ্য পেতে পারে। ঘটনাচক্রে, অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নায়ডুও রাজীব হাজরাকে সে রাজ্যে টানতে মরিয়া। সূত্রের দাবি, তিনি চাইছেন, সে রাজ্যে ‘অন্ধ্র কোয়ান্টাম ভ্যালি’ তৈরি করতে। এই দৌড়ে পশ্চিমবঙ্গের পিছিয়ে পড়া কাঙ্ক্ষিত নয়। কারণ, মেধা এবং কর্মদক্ষতার প্রশ্নে এ রাজ্য কোনও অংশে পিছিয়ে নেই। শুধু প্রয়োজন সঠিক সরকারি নীতি।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানাচ্ছেন, এ দেশে কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের উপর পুরোদস্তুর গবেষণা পাঠ্যক্রম (পিএইচডি) চালু হয়েছে। দেশের জাতীয় কোয়ান্টাম মিশনের আর্থিক সুবিধাও পাওয়া যেতে পারে। জাতীয়-আন্তর্জাতিক স্তরে গবেষণা অনুদানের সুবিধাও রয়েছে সেই সঙ্গে। কোয়ান্টাম বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির উপর গত পাঁচ বছরে এ দেশের বিজ্ঞানীরা ৬৫টি ‘পেপার’ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে। পাশাপাশি, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে অন্তত ৩০টি সম্মেলনে এ দেশের বিজ্ঞানীদের উপস্থাপনা নথিবদ্ধ হয়েছে। তাই এই গতির সঙ্গে তাল মেলাতেচাইছে পশ্চিমবঙ্গ।