আসন্ন পুরভাটের আগে কলকাতা পুর-নিগমের ওয়ার্ড-সংখ্যা বাড়িয়ে ২০৯ করা হয়েছে। চলমান জনগণনার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই কলকাতা পুর-এলাকার পুনর্বিন্যাস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা। সে সব প্রশ্নের ফয়সালা হওয়ার আগেই কলকাতার ওয়ার্ডগুলির সংরক্ষণের খসড়া তালিকাও তৈরি হয়ে গেল। সব বিরোধী দলের এক সুরে অভিযোগ, কোনও আলোচনার পথে না-গিয়ে শাসক দলের ‘ইচ্ছামতো’ পুর-ওয়ার্ডের ভাঙা-গড়া চলছে! বিজেপির অবশ্য পাল্টা বক্তব্য, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনেই সরকারি কাজ চলছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নেই।
বিধানসভায় কলকাতা ও হাওড়া পুর-নিগম সংক্রান্ত আইন সংশোধন করে প্রথম ক্ষেত্রে ১৪৪ ওয়ার্ডের বদলে ২০৯ এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ৫০ ওয়ার্ড থেকে বাড়িয়ে ৬৮ করা হয়েছে। এর পরে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত প্রতিনিধি হিসেবে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা শাসক অভিষেক কুমার তিওয়ারি ওয়ার্ডের সংরক্ষণের খসড়া জানিয়ে নির্দেশিকা জারি করেছেন। এক-তৃতীয়াংশ আসন মহিলাদের জন্য থাকবে, এই নিয়ম মেনে কলকাতার মোট ২০৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে সব মিলিয়ে ৭০টি মহিলা সংরক্ষিত হচ্ছে। তার মধ্যে ৬৬টি সাধারণ এবং চারটি তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষণের তালিকাভুক্ত। আর সার্বিক ভাবে ১২টি ওয়ার্ড থাকছে তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত। তবে এই সূত্র মানতে গিয়ে কয়েকটি ক্ষেত্রে পরপর দু’টি ওয়ার্ড মহিলা সংরক্ষণের আওতায় চলে যাচ্ছে। সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন সংরক্ষণ তালিকার উপরে আপত্তি বা প্রস্তাব জানানো যাবে।
কলকাতায় মেয়রের পদত্যাগের পরে আপাতত প্রশাসক বসানো হয়েছে। আগামী ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন নির্বাচিত পুর-বোর্ডের দায়িত্ব নেওয়ার কথা। পুর কমিশনার তথা প্রশাসকের নেতৃত্বে পুর কর্তৃপক্ষ যে ভাবে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস করে ভোটের প্রস্তুতিতে এগোচ্ছেন, তা নিয়ে ভূরি ভূরি আপত্তি তুলেছে বিরোধীরা। রাজ্য নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে অবশ্য রাজনৈতিক দলগুলির নেতৃত্বের এখনও কোনও আদান-প্রদান হয়নি। মমতা-তৃণমূলের (এমএআইটিসি) নেতা ও বিধায়ক কুণাল ঘোষের বক্তব্য, ‘‘একটার পরে একটা সরকারি বিজ্ঞপ্তি বেরিয়ে যাচ্ছে! কীসের ভিত্তিতে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস হচ্ছে, তার উপরে কোন সূত্রে সংরক্ষণের তালিকা তৈরি হয়ে যাচ্ছে, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আমরা নানা আপত্তি ও দাবি জানানোর পরে কোনও পদক্ষেপ হয়নি। বিজেপি যা চাইছে, সেই ভাবে সরকারি প্রক্রিয়া সেরে নেওয়া হচ্ছে।’’ একই সুরে প্রদেশ কংগ্রেস নেতা আশুতোষ চট্টোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) পরে বহু মানুষের ভোটাধিকারের প্রশ্ন এখনও ঝুলে। আমরা বারবার দাবি জানিয়েছি, সর্বদল বৈঠক করে এগোনো হোক। কিন্তু ওয়ার্ডের সীমানা পুনর্বিন্যাস, সংরক্ষণ সবই আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় করে ফেলা হচ্ছে, কোনও মত শোনা হচ্ছে না।’’
প্রশাসনিক সূত্রের ব্যাখ্যা, ওয়ার্ডের ১,৪,৭ ধরা হবে মহিলা সংরক্ষণের জন্য— এই সূত্রে এ বার এগোনো হয়েছে। কিন্তু সংরক্ষণের আগে সীমানা পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নেরই যে নিষ্পত্তি হয়নি, সে কথা স্মরণ করিয়ে গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেসের (ডিটিসি) বিধায়ক ও প্রাক্তন মেয়র পারিষদ সন্দীপন সাহার বক্তব্য, ‘‘ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ভোটার-সংখ্যার সাযুজ্য এখনও হয়নি। তার উপরে একটা পুরনো ওয়ার্ডের অংশ কেটে অন্য ওয়ার্ডে যে ভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাতে বিধানসভা এলাকার সীমানা বদলে যাচ্ছে! অথচ বিধানসভা কেন্দ্রের পুনর্বিন্যাসের এক্তিয়ার পুর-কর্তৃপক্ষ বা রাজ্য নির্বাচন কমিশনের নেই।’’
আর এক বিরোধী দল সিপিএমের অভিযোগ, বিগত নির্বাচনে যে সমস্ত অঞ্চলে বিজেপি ভোট কম পেয়েছে, সেই ওয়ার্ডগুলি থেকে যাতে বেশি প্রতিনিধি নির্বাচিত না-হন, সে দিকে লক্ষ রেখে সেই অঞ্চলে বেশি ভোটার-সংখ্যা রেখে পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। সিপিএম যাকে বলছে ‘জেরিম্যান্ডারিং’ (রাজনৈতিক স্বার্থে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্বিন্যাসে কারচুপি)। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ও কলকাতা জেলা সিপিএমের নেতা দেবেশ দাসের মতে, ‘‘ভোটে কে কেমন ফল করবে, সেটা মূল কথা নয়। কিন্তু এক বার অযৌক্তিক পুনর্বিন্যাস হলে তার ফল ভোগ করতে হবে অনেক বছর। এর আগে সীমানা পুনর্বিন্যাস হয়েছিল ৪০ বছরেরও বেশি আগে। সেই সময়ের মধ্যে বামফ্রন্ট, তৃণমূল, বিজেপি এসেছে। বিজেপি নিশ্চয়ই ৪০ বছর ধরে রাজ্যে ক্ষমতায় থাকবে না! কিন্তু আশু ফল লাভের আশায় বিজেপি যা করতে চাইছে, তার ফল ভোগ করতে হবে আপামর নগরবাসীদের, বিজেপির সমর্থকও বাদ যাবেন না।’’
বিজেপির বিধায়ক এবং কলকাতার পুরভোট সংক্রান্ত কমিটির সহ-আহ্বায়ক রীতেশ তিওয়ারি অবশ্য বলছেন, ‘‘প্রশাসন তাদের সূত্র মেনে কাজ করছে। আমাদের দলের মধ্যে নানা রকমের প্রস্তাব ও মত জমা পড়েছে। এখনও দলীয় স্তরে আমরা সে সব পর্যালোচনা করছি।’’