চোরবাগানে পুজো মণ্ডপের বাইরে পদপিষ্ট হয়ে মৃতদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পরিজনেদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন, তুলে দিচ্ছেন ক্ষতিপূরণের চেক। পার্ক স্ট্রিটের অ্যালেন পার্কে বিজেপি নেতাদের আয়োজিত প্রথম পুজোর দশমীতে সে দিনই সিঁদূর খেলায় টলিউডের মুখেদের এনে উদযাপন চলছে। অথচ চোরবাগানের ঘটনার পরে মুখ্যমন্ত্রীই বলেছিলেন, এতগুলো মানুষের মৃত্যুর পরে সরকারি ভাবে এ বার আনন্দ অনুষ্ঠান বন্ধ, শুধু আচার পালন হবে।
রাজ্য জুড়ে বামেদের বইয়ের বিপণিতে একের পর হামলার প্রেক্ষিতে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, কোনও সুস্থ, স্বাভাবিক বিজেপি কর্মী এমন কাজ করতে পারেন না। বিজেপি এমন কাজ অনুমোদনও করে না। রাজ্যেরই অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত ‘গেরুয়া পরে গুন্ডামি’ হচ্ছে বলে প্রতিবাদ জানিয়ে মনে করিয়ে দিয়েছেন, বই নিয়ে বিতর্কের পরে সলমন রুশদির ভিসা ফেরত দিয়েছিল অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকার, আর এক বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়ে তাঁকেও সমর্থন করেছে বিজেপি। কোনও বইয়ে বিরুদ্ধ মত আছে বলেই তার উপরে আক্রমণ সমর্থনযোগ্য নয়। অথচ মুখ্যমন্ত্রী বলে দিয়েছেন, ‘‘যারা সনাতন, গীতা মানে না, তারা পুজোয় স্টল দেবে কেন?’’
শুধু পুজোর কয়েক দিনের ঘটনা পাশাপাশি রাখলে বিরোধীদের প্রশ্ন, কোনটা মুখ আর মুখোশই বা কোনটা? তবে শাসক শিবিরের অন্দরের খবর, টানাপড়েন বেশ তীব্র। দল ও সরকারের কাজের সমন্বয় হচ্ছে না। দল ও সরকারের শীর্ষ দুই মুখের কথার মিল হচ্ছে না। বিধায়কদের একাংশের আচরণ নিয়ে নানা প্রশ্ন। কে কোথায় কার রাশ টানবে, তার উত্তর নেই। আর এই পরিস্থিতিতে ফাঁপরে পড়েছে দিল্লিও। পশ্চিমবঙ্গে বিজয় ধ্বজা ওড়ানোর লক্ষ্যে এ বার সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ছিলেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তার পরে সরকার প্রতিষ্ঠার পরে সমন্বয়ের ব্যবস্থাপনার চেষ্টাও হয়েছিল। কিন্তু ঘটনার অভিঘাতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে কোনও পক্ষেই অবস্থান নিতে আপাতত দেখা যাচ্ছে না বলে শাসক শিবির সূত্রের বক্তব্য।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ছেড়ে বেরিয়ে বিরোধী দল বিজেপিতে যোগ দেওয়া শুভেন্দুই ছিলেন ২০২৬ সালের নির্বাচনে বাংলায় ভোট টানার জন্য পদ্ম শিবিরের প্রধান মুখ। তাঁর হাতেই সরকারের ভার তুলে দিয়েছে দল। মুখ্যমন্ত্রী হয়ে তিনি কার্যত বিদ্যুৎ বেগে দৌড়চ্ছেন। একার কাঁধেই সরকারকে টানছেন। কিন্তু তাঁরই আবার নানা মন্তব্যে এমন বিতর্ক তৈরি হচ্ছে, যার আঁচ পোহাতে হচ্ছে দলকে। অন্য দিকে, রাজ্য সভাপতি হিসেবে শমীক ‘বাঙালি ভদ্রলোক’ ভাবমূর্তি রাখা এবং ভারসাম্যের কৌশল নেওয়ার চেষ্টা করছেন। যার অনেক কিছুই শেষে ধোপে টিকছে না! সূত্রের খবর, বাংলায় অল্প সময়েই বিজেপির রথ যে গর্তে পড়ছে, সেই বিষয়ে অবহিত দলের সর্বভারতীয় সভাপতিও। যথাসময়ে তাঁরা হস্তক্ষেপ করতে পারেন। দলের এক কেন্দ্রীয় নেতার কথায়, ‘‘বিজেপি কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস নয়! দলের একটা আদর্শ আছে, সুস্পষ্ট নীতি আছে, শৃঙ্খলাও আছে। সে সব মাথায় রেখেই চলতে হবে।’’
এরই মধ্যে জল আরও ঘোলা করে তুলেছে মুখ্যমন্ত্রীর আচমকা ২৭৫ বিধায়কের সমর্থন পাওয়া সংক্রান্ত বক্তব্য। সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই, বিধানসভায় কেউ কোনও অনাস্থা প্রস্তাব জমা দেয়নি। তা হলে বিধানসভায় শক্তি পরীক্ষা এবং বিরোধী দল (ইঙ্গিত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের গণতান্ত্রিক তৃণমূলের দিকেই) থেকে ৬৪ জন বিধায়কের তাঁর পক্ষে ‘হাত তোলা’র কথা এল কেন, এর কোনও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা কোনও মহল খুঁজে পায়নি। বরং, শাসক ও বিরোধী, দুই শিবিরেরই অন্দরে জল্পনা তৈরি হয়েছে, তা হলে কি অনাগত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে কোনও পরিকল্পনা ভেবে রাখা হচ্ছে? বিরোধীদের দিকে নিশানা করে মুখ্যমন্ত্রী কি আসলে নিজের দলের উদ্দেশেও বার্তা দিয়ে রাখলেন যে, যে যা-ই মনে করুক, সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিয়ন্ত্রণ কেবল তাঁর হাতেই?
ক্ষমতা হারানো তৃণমূল এমনিতেই ছত্রভঙ্গ। এই অবস্থায় অন্য দল থেকে সাংসদ, বিধায়ক বা পুর-প্রতিনিধি টেনে আনার চেয়ে ভোটের সময়ে ‘সঙ্কল্প-পত্রে’ দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে মনোযোগ দেওয়া ভাল বলেই দলীয় পরিসরে মত বিজেপি নেতাদের বড় অংশের। কলকাতা ও বিধাননগর পুরসভায় টিকিট-প্রত্যাশী কেউ কেউ চোরবাগানের বিজেপি নিয়ন্ত্রিত পুজো কমিটিতেও ঢুকেছিলেন বলে বিতর্ক হচ্ছে। যে যাঁর মতো ‘নেতা ধরে’ চলে আসবেন, তার পরে অঘটন ঘটলেই ‘৪ মে-র পরে আসা বাহিনী’কে দেখিয়ে দেওয়ার কৌশল কত দিন চলবে, সে প্রশ্নও আছে বিজেপির অন্দরে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অবশ্য বলছেন, আশ্বাস বা সরকারের দায়িত্ব থেকে বিচ্যুতির প্রশ্ন নেই। তাঁর মতে, ‘‘আমরা ৬ মাস কাজ করেছি, আরও ৫৪ মাস পাব। মানুষ যা চেয়েছেন, তার চেয়ে বেশিই দিতে পারব বলে আশা করা যায়।’’