তৃণমূল কংগ্রেস আমলের আমপান-‘দুর্নীতি’-সহ নানা অভিযোগের তদন্তে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) ২৮টি রিপোর্ট বিধানসভায় পেশ করেছে বিজেপি সরকার। আর ওই রিপোর্টকে হাতিয়ার করে দুর্নীতি ও রাজ্যের আর্থিক হাল নিয়ে তীব্র হল রাজনৈতিক তরজা। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলকে তীব্র নিশানা করলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য থেকে বিদ্রোহী তৃণমূল শিবিরের বিধায়ক তথা বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। রিপোর্টের ভিত্তিতে এর পরে এফআইআর দায়ের হবে বলে সরকারি সূত্রের খবর। উল্টো দিকে, কালীঘাটপন্থী তৃণমূল বলছে, সিএজি কেন্দ্রীয় সংস্থা। তাই তাদের রিপোর্ট ঠিক বলে মনে করার কারণ নেই!
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক রবিবার বলেছেন, “২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের সিএজি রিপোর্ট পশ্চিমবঙ্গের অর্থ-ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছে। রাজস্ব ঘাটতি ৩৯ হাজার ৭২৭ কোটি, রাজকোষ ঘাটতি ৬৪ হাজার ৪৮৮ কোটি এবং রাজ্যের নেওয়া মোট ঋণ, ৭.৩৫ লক্ষ কোটিরও বেশি। সিএজি রিপোর্ট বলছে, ২০১৫-১৬ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত টানা ১০ বছর রাজ্যে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। রাজস্বের ৫২% এসেছে কেন্দ্রের কাছ থেকে। তৃণমূল আমলে ঋণ বাড়লেও সেই অর্থ উৎপাদনশীল বিনিয়োগে যথাযথ ব্যবহার হয়নি।” বিজেপি সরকার প্রতিটি টাকার ঠিক মতো ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ করবে বলেও শমীকের দাবি।
মুখ্যমন্ত্রীর দফতর সূত্রের বক্তব্য, সিএজি স্বশাসিত সংস্থা। তাদের রিপোর্টে দুর্নীতি-সহ রাজ্য কোষাগারের অপচয়ের যে তথ্য উঠে এসেছে, তার ভিত্তিতে এফআইআর দায়ের হবে এবং দোষীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার পথে যাওয়া হবে।
সিএজি রিপোর্টে ২০২০-তে আমপান ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে হওয়া ‘অনিয়মে’র কথা বিশেষ ভাবে বলা হয়েছে। সূত্রের খবর, রিপোর্টে বলা হয়েছে, ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতি ‘অতিরঞ্জিত’ ভাবে দেখিয়ে এনডিআরএফ তহবিল থেকে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার ৩৫ হাজার ১৮ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় সহায়তা চেয়েছিল। অথচ, এনডিআরএফ ২ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা সহায়তার সুপারিশ করেছিল। জেলা-ভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন রিপোর্ট না-থাকা, ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়ি তৈরির জন্য অনুদান, ৯২২৬ জন উপভোক্তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে একাধিক বার বাড়ি তৈরির অনুদান দেওয়ার মতো নানা ক্ষেত্রে অনিময়ের কথাও বলেছে সিএজি রিপোর্ট।
এই প্রেক্ষিতেই বিরোধী নেতা ঋতব্রত বলেছেন, “সিএজি রিপোর্ট দেখে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে! রিপোর্ট অনুযায়ী, মমতা-সরকার আমপানের সময়ে অতিরিঞ্জিত ভাবে বেশি টাকা চেয়েছিল। এটা কি ভানুয়াতু, ইউরোপে পাঠাতে বা মাফিয়ার চার্টার্ড বিমানের জন্য দরকার ছিল? কার সঙ্গে প্রবঞ্চনা করা হয়েছে? এটা পুকুর নয়, সাগর চুরি হয়েছে! এতে নেতৃত্ব দিয়েছে সরকার। যাঁরা সরকারের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের পর্যন্তই রাস্তা কিন্তু পৌঁছবে।” পাশাপাশি, তৃণমূলে থাকা সৎ নেতা-কর্মীরা এই দুর্নীতির দায় কেন নেবেন, সেই প্রশ্নও তুলেছেন ঋতব্রত।
যদিও কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল ঘোষ পাল্টা বলেছেন, “সিএজি বলছে মানেই সব ঠিক, এটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই। সিএজি কেন্দ্রীয় সংস্থা। এখন তারা কোনটা হিসাব করেছে, কোনটা করেনি, সেটা একটা বিষয়।” পাশাপাশি, তাঁর প্রশ্ন, “অনেকে তৃণমূল থেকে বিজেপি, আবার অনেকে ‘ভাল তৃণমূল’ হয়েছেন। তাঁদের দফতরগুলোর হিসাব হয়েছে তো?”
সূত্রের খবর, সিএজি রিপোর্টে এ-ও বলা হয়েছে, নদিয়ার হরিণঘাটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে একটি ই-কমার্স সংস্থাকে জমি বরাদ্দ করতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গ শিল্প উন্নয়ন নিগম লিমিটেডের (ডব্লিউবিআইডিসিএল) ১২.৮৬ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। কারণ, প্রকল্প এলাকার মধ্যে থাকা বড় জলাশয়গুলিকে হিসাবের মধ্যে না-রেখেই জমির ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, মাঝারি শিল্পোদ্যোগ ও বস্ত্র দফতরের বিরুদ্ধে ৩.৪৫ কোটি ‘অনিয়মিত ব্যয়’, ৮.৭৮ কোটি টাকা অযোগ্যদের অনুদান দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে সিএজি রিপোর্টে। পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর, ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরের কাজেও বেশ কয়েকটি অনিয়মের কথা তুলে ধরা হয়েছে রিপোর্টে।