মঞ্চে বিধায়কের বক্তৃতায় ১৯৪৬-এর গোষ্ঠী সংঘর্ষ নিয়ে কিছু কথায় অস্বস্তি বোধ করেছিলেন অশীতিপর অধ্যাপক। বিধায়ক নামার সময়ে সবিনয় তাঁকে শুধু বলেন, ‘দেখবেন, কোনও সাম্প্রদায়িক গোলযোগ না বাধে।’ অভিযোগ, তার জেরে ওই বিধায়কের সামনেই কটূক্তি শুনতে হয় ওই শিক্ষককে। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্কের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মিহির চক্রবর্তী। শুধু তাই নয়, বিধায়ককে অপমান করার ‘দোষে’ মধ্যরাতে বাড়িতে চড়াও হয়ে প্রবীণ অধ্যাপক ও তাঁর স্ত্রী নমিতা চৌধুরীকে হুমকি-শাসানিও দেয় এক দল লোক।
অভিযোগের তির যাদবপুরের বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায় ও তাঁর অনুগামীদের দিকে। শর্বরী নিজে কিছু না-বললেও, তাঁর অনুগামীরা ৮১ বছরের অধ্যাপককে পাকিস্তান চলে যেতে বলেন। এককাঠি উপরে উঠে আরও কেউ কেউ ‘আপনার তো পিতৃ-পরিচয়ের ঠিক নেই’ বলেও কটাক্ষ করেছেন। গত স্বাধীনতা দিবসের রাতের সেই ঘটনার জেরে কোথাও কোনও প্রতিবাদ, প্রতিকার হয়নি। এ বার শিক্ষক-শিক্ষিকা সমাজের তরফে মুখ খুলেছেন রাজ্যেরবিশিষ্ট শিক্ষাবিদেরা। যদিও ঘটনা প্রসঙ্গে রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, ‘‘এমন কোনও ঘটনা আমি জানি না। এই নিয়ে আমি কোনও মন্তব্য করব না।’’
সমাজমাধ্যমেই বিষয়টি নানা জনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির প্রাক্তন অধ্যাপক শুভেন্দু দাশগুপ্ত, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সুকান্ত চৌধুরী, যাদবপুরের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অমিতা চট্টোপাধ্যায়, ইনস্টিটিউট অব ডেভলপমেন্ট স্টাডিজ়ের প্রাক্তন অধ্যাপক অচিন চক্রবর্তী, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৌমেন চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ অনেকেই বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন। শিক্ষক-সমাজের প্রতি অশ্রদ্ধার নানা ঘটনার তালিকায় গণিতজ্ঞ, পরিবেশপ্রেমী, সমাজ সচেতন অধ্যাপক মিহিরের অপমানিত হওয়ার ঘটনাটি নিয়েতাঁরা ব্যথিত।
যাদবপুর এলাকার ১০৫ নম্বর ওয়ার্ডে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে একটি সান্ধ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্থানীয় বাসিন্দা, শিশুরাই প্রধানত শামিল হয়েছিলেন। এলাকায় সর্বজনপ্রিয় অধ্যাপক মিহির ছিলেন সভাপতির ভূমিকায়। মিহির রাজনৈতিক মতাদর্শে নিজেকে বামপন্থী বললেও কোনও নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে তাঁর যোগ নেই। বিধায়ক আচমকাই অনুষ্ঠানস্থলে এসে তাঁর বক্তব্যে ১৯৪৬-এর ঘটনাবলি নিয়ে তাঁর মত ব্যক্ত করতে থাকেন। মিহির বলেছেন, ‘‘বিধায়কের বক্তৃতার সময়ে কোনও বাধা দিইনি। পরে তিনি নামার সময়ে ব্যক্তিগত ভাবেইকথা বলি।’’ সেই রাতে সাড়ে ১১টা নাগাদ ৫-৬ জন ফের অধ্যাপকের বাড়িতে চড়াও হয়ে বিধায়ককে অপমান করার কথা বলতে থাকেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয় তিনি কি হিন্দু না মুসলিম? প্রবীণ অধ্যাপক কোনও ধর্ম মানেন না বলে জানান। তাঁদের সব কথা রেকর্ড করে বলা হয়, অন্য আমল হলে তাঁদের ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হত। মিহির আগন্তুকদের বাড়িতে বসে কথা বলতে অনুরোধ করেছিলেন বলেও জানা গিয়েছে।