পঞ্চায়েতগুলির নিজস্ব আয় বাড়াতে এ বার ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর’ (এসওপি) জারি করল রাজ্যের পঞ্চায়েত দফতর। পঞ্চায়েতের কর সংগ্রহ কী ভাবে হবে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কী ভাবে করদাতাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে হবে এবং কর আদায়ে ব্যর্থ হলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে— এসওপিতে তার বিস্তারিত নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, পঞ্চায়েতের নিজস্ব আয় বাড়াতে বিকল্প একাধিক পথেরও সন্ধান করতে বলা হয়েছে।
মে মাসে রাজ্যে সরকার বদলের পর পঞ্চায়েত দফতরের কাজকর্ম পর্যালোচনা করতে গিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশ কিছু সমস্যা নজরে আসে বলে প্রশাসনিক সূত্রের খবর। সমস্যার কথা জানানো হয় পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষকে। বিশেষ করে, বহু গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান নিয়মিত অফিসে না আসায় দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে। এর ফলে পঞ্চায়েতের পরিষেবা প্রদান থেকে শুরু করে রাজস্ব আদায়— বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তার প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছে দফতর। এই পরিস্থিতিতে পঞ্চায়েতের আর্থিক পরিকাঠামো শক্তিশালী করার উপর বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই এসওপিতে বলা হয়েছে, গ্রামবাসীদের কর জমা দেওয়ার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার পর তিন সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েতকে কর সংগ্রহের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে হবে। প্রয়োজনে করদাতাদের সুবিধার জন্য অফলাইনে টাকা জমা নেওয়ার ব্যবস্থাও করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যাঁরা কর জমা দেবেন না, তাঁদের তালিকা তৈরি করতে হবে পঞ্চায়েতকে। সেই তালিকা প্রকাশের ১৫ দিন পরেও যদি কেউ বকেয়া কর না মেটান, তা হলে সংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েত নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করবে। অর্থাৎ, বকেয়া কর আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে ধারাবাহিক ভাবে নজরদারির ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।
কর সংগ্রহ বাড়াতে পঞ্চায়েত এলাকায় একাধিক শিবির করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে এই কাজে স্থানীয় বিধায়কদেরও যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। প্রশাসনের ধারণা, জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় ভাবে যুক্ত করা গেলে সাধারণ মানুষের মধ্যে কর প্রদানের বিষয়ে সচেতনতা বাড়বে এবং রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে। পঞ্চায়েত দফতরের এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছে আরও বড় আর্থিক লক্ষ্য। দফতর সূত্রে খবর, ষোড়শ অর্থ কমিশনের মাধ্যমে ২০২৮-২৯ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবর্ষ পর্যন্ত রাজ্যকে প্রায় ২৫২১ কোটি টাকা দেওয়ার কথা রয়েছে। এই অর্থ মূলত ‘পারফরম্যান্স গ্রান্ট’ হিসেবে পাওয়া যাবে। তবে সেই অর্থ পাওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হল, পঞ্চায়েতগুলিকে নিজেদের আয় উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়াতে হবে। বর্তমানে একটি বাড়ি থেকে বছরে গড়ে প্রায় ২৩৩ টাকা আয় করে পঞ্চায়েতগুলি। সেই আয় বাড়িয়ে বাড়িপিছু বছরে ১২০০ টাকা করার লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন:
শুধু কর আদায় নয়, বিকল্প উৎস থেকেও আয় বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে। যে সব রাস্তা, সেতু বা ফেরিঘাট থেকে টোল আদায় সম্ভব, সেগুলির তালিকা তৈরি করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি, পঞ্চায়েত এলাকায় বিজ্ঞাপন বা হোর্ডিং দেওয়ার জন্য আগ্রহী বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পর্যটন এবং হোমস্টে প্রকল্পের মাধ্যমেও পঞ্চায়েতের আয় বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছে দফতর। একই সঙ্গে পঞ্চায়েতের নিজস্ব স্থাবর সম্পত্তি— যেমন হোটেল, কমিউনিটি হল, ফেরিঘাট, ল্যাবরেটরি-সহ বিভিন্ন সম্পত্তি লিজ় দিয়ে আয় বাড়ানোর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখতে উল্লেখ করা হয়েছে। পঞ্চায়েতের নিজস্ব আয় দিয়ে গ্রামোন্নয়নে কী কী কাজ হচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার উপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের মতে, উন্নয়নের সঙ্গে কর প্রদানের সরাসরি সম্পর্কের বিষয়টি প্রচার করা গেলে পঞ্চায়েতের রাজস্ব সংগ্রহ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগে রাজ্যের পঞ্চায়েতগুলিকে সচল করতে বিধানসভায় বিল পাস করে গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে আর্থিক লেনদেনের ক্ষমতা, প্রধানদের হাত থেকে সরিয়ে তা সরকারি আধিকারিকদের হাতে দেওয়া হয়েছে। আর এ বার সরাসরি এসওপি জারি করে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও নতুন পন্থা অবলম্বন করল শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। মনে করা হচ্ছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এ বিষয়ে সুফল পেতে পারবে পঞ্চায়েত দফতর। তবে পঞ্চায়েতের এক আধিকারিক বলছেন, ‘‘বিগত ১৫ বছর একরকম ভাবে রাজ্যের পঞ্চায়েতগুলি চলেছে। নতুন পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ দায়িত্ব নিয়েই বুঝিয়ে দিয়েছেন যে এ ক্ষেত্রে তিনি পুরনো নিয়ম নয়, বরং পঞ্চায়েত অফিসগুলিকে সক্রিয় করে কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্পগুলিকে বেশি করে কার্যকর করতে চান। কারণ, রাজ্য সরকার বদলের পরেও জিরামজি প্রকল্প চালু করতে পঞ্চায়েত দফতরকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। তাই কোনও ক্ষেত্রেই আর রেয়াত না করে কড়া পদক্ষেপ করার পক্ষপাতী মন্ত্রীমশাই।’’