রাজ্যের কোষাগারের হাল যে খারাপ তা নিজেই বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। টাকা জোগাড়ে নানা পথ ধরছে সরকার। এ বার জেলা প্রশাসনগুলিকে কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) প্রকল্পকে যথাযথ ভাবে কাজে লাগানোর নির্দেশ দিল নবান্নের সর্বোচ্চ মহল। আধিকারিকদের ধারণা, এই পদ্ধতি ঠিক মতো কার্যকর করা গেলে রাজ্যে বছরে অন্তত ২০০০ কোটি টাকার কাজ করা সম্ভব। যেখানে সরকারের পক্ষে অর্থ খরচ করা সমস্যার, সেখানে আশার আলো দেখাতে পারবে এই প্রকল্প।
প্রশাসনিক সূত্রে খবর, বিগত সরকারের আমলে সরকারের একটি বিভাগকে সিএসআরের আওতায় উল্লেখযোগ্য অঙ্কের সহায়তা করতে চেয়েছিল একটি বড় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক। কিন্তু ফাইল চালাচালিতে সেই উদ্যোগ দিনের আলো দেখেনি। অথচ কাজটি করা গেলে সরকারকে ওই খাতে অতিরিক্ত খরচ নিজের কোষাগার থেকে করতেই হত না। আধিকারিকদের মতে, এমন আরও উদাহরণ রয়েছে। এখনকার সরকার এই মানসিকতারই বদল চাইছে।
দেশের কোম্পানি আইনের (২০১৩ সালের) ১৩৫ ধারা অনুযায়ী কোনও বাণিজ্যিক সংস্থার (যারা প্রধানত কোম্পানি আইনের অধীনে পড়ে) কাছে সিএসআর প্রকল্প বাধ্যতামূলক। ৫০০ কোটি টাকার বেশি মোট সম্পদ, বছরে ১০০০ কোটি টাকা বা তার বেশি আয় এবং লাভের অঙ্ক ৫ কোটি টাকা বা তার বেশি হলেই সিএসআর করা কার্যত বাধ্যতামূলক। তাতে তিনটি অর্থবর্ষে গড় লভ্যাংশের অন্তত ২% খরচ করার কথা সিএসআর খাতে। বড় প্রায় সব সংস্থাই এই কাজ করে থাকে সামাজিক দায়বদ্ধতার স্বার্থে। সরকারকেও এই খাতে নানা কাজে তারা সহযোগিতা করতে পারে। প্রশাসনিক সূত্রের বক্তব্য— যে সব ক্ষেত্রে সরকারের অর্থ দেওয়া মুশকিল, সেগুলিতে সিএসআরের মাধ্যমে কাজ করানো গেলে তা মানুষের উপকারে আসবে। একই সঙ্গে বাঁচবে সরকারি কোষাগারের অর্থ। তাই সম্প্রতি জেলাকর্তাদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট এলাকায় থাকা এমন সংস্থাগুলি যাতে সিএসআর কার্যকর করে, তা খেয়াল রাখতে।
এক কর্তার কথায়, “সরকারের আর্থিক বোঝা অনেক। তাতে তৃণমূল স্তরে সব কাজ করাতে অর্থ জোগাড়ে বেশ সমস্যা হয়। তখন সিএসআরের সহযোগিতা থাকলে, অর্থ সমস্যা হয় না। দেখা গিয়েছে প্রশাসনিক লালফিতের কারণেই অতীতে ইচ্ছা থাকলেও অনেক বড় সংস্থা এমন সহায়তা করতে পারত না। সর্বভারতীয় স্তরের সংস্থাগুলি তুলনায় বেশি সিএসআর করত অন্যান্য রাজ্যে। ফলে এই দিকটি বাধাহীন করার চেষ্টা করতে হবে জেলাকর্তাদের।”
প্রসঙ্গত, রাজনৈতিক পালাবদলের পরে এখন রাজ্যের ঘাড়ে প্রায় ৮ লক্ষ কোটি টাকার দেনা (প্রধানত বিগত সরকারের সময়কালের) রয়েছে। তার পরেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রাখতে রয়েছে বিপুল খরচ। বিনিয়োগ অনুকুল পরিবেশ তৈরিতে রয়েছে পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রত্যাশা। সব মিলিয়ে খরচের বোঝা কম নয়। প্রসঙ্গত, সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী একাধিক বার জানিয়েছেন, রাজ্যের আর্থিক স্বাস্থ্য বেশ খারাপ। তা মেরামতের চেষ্টা হচ্ছে রাজস্ব লোকসান-চুরি ঠেকিয়ে। কিন্তু এ কাজ যে কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ, তা-ও জানিয়েছেন তিনি। নবান্নের খবর, এখনকার সরকারের লক্ষ্য শুধু অনুদান দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিকাঠামো ইত্যাদি ক্ষেত্রেও বরাদ্দ বাড়ানো হবে সমান ভাবে। তাতে অর্থনীতির চাকা ঘোরানো যাবে ক্রমশ। কিন্তু এই কাজ শুরুর আগে সমান্তরালে সন্ধান করা হচ্ছে আয়ের বিকল্প রাস্তাগুলিও। সিএসআর এর অন্যতম একটি রাস্তা বলে মনে করছে প্রশাসন।