অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়ের মামলায় এ বার ‘লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডসের’ প্রসঙ্গ টানল রাজ্য। সুমিতের বিরুদ্ধে তদন্তে একটি রাজনৈতিক দলের অ্যাকাউন্টে লক্ষ লক্ষ টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গিয়েছে। আবার সেই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডসের প্রায় ৩০ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার রাজ্যের তরফে এমনটাই জানানো হয় সুপ্রিম কোর্টে। তা শুনে ‘লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডসের’ বিরুদ্ধে তদন্তে ‘শ্লথগতি’ নিয়ে মন্তব্য করে আদালতও।
পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনিতে সরকারি জমি ভুয়ো নথির মাধ্যমে দখল এবং বিক্রির অভিযোগ উঠেছে সুমিতের বিরুদ্ধে। জমি দুর্নীতির ওই মামলায় সুমিতের রক্ষাকবচ আগামী সোমবার পর্যন্ত বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্ট। পাশাপাশি সুমিতকে জিজ্ঞাসাবাদের লিখিত নথি (ট্রান্সস্ক্রিপ্ট)-ও চেয়েছে আদালত। পরবর্তী শুনানির দিন তা আদালতে জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে রাজ্যকে।
এ দিনের শুনানিতে সুমিতের আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণ সওয়াল করেন, “আমার মক্কেলের সই করা একটিও নথি তদন্তে দেখানো হয়নি। ১১ দিন ধরে জিজ্ঞাসাবাদেও লেনদেন সংক্রান্ত সঠিক প্রশ্ন করা হয়নি। তদন্তে যা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, তা ভি়ডিয়ো রেকর্ড করা হয়েছে।” রাজ্যের আইনজীবী জানান, ভিডিয়ো রেকর্ড এবং লিখিত নথি দেখাতে তাঁরা প্রস্তুত। এ দিন রাজ্যের হয়ে আদালতে উপস্থিত ছিলেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাও। তিনি বলেন, “তাঁকে (সুমিতকে) যে প্রশ্নই করা হয়েছে, তিনি হয় বলেছেন ‘জানি না’, না হলে বলেছেন ‘মনে করতে পারছি না’। লেনদেনের বিষয়ে যে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তা আমরা দেখিয়ে দিতে পারি।”
সুমিতকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলেও এ দিন আদালতে সওয়াল করেন মেহতা। তাঁর বক্তব্য, “তদন্তে লক্ষ লক্ষ টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গিয়েছে। একটি রাজনৈতিক দলের অ্যাকাউন্টে তা জমা হয়েছিল। সেই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডসের প্রায় ৩০ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য উঠে আসছে। এই বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখছি। এসএসসি দুর্নীতির মামলায় লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডসের বিরুদ্ধেও চার্জশিট জমা হয়েছে।”
আরও পড়ুন:
মেহতা লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডসের প্রসঙ্গ তুললে তা নিয়ে মন্তব্য করেন বিচারপতি বাগচীও। তিনি বলেন, “লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডসের বিরুদ্ধে তদন্ত নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের একাধিক বিচারপতি প্রশ্ন তুলেছিলেন। আপনাদের তদন্ত অত্যন্ত ধীরগতিতে হচ্ছিল। ইডির তদন্তের ইচ্ছা ছিল কি না, সে নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।” সলিসিটর জেনারেল অবশ্য জানান, এখনও পর্যন্ত যে তথ্য উঠে এসেছে তা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। সুমিতকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আরও তথ্য উঠে আসবে। এ অবস্থায় সুমিতকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কী কী তথ্য উঠে এসেছে, তাঁকে কী কী প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি কী উত্তর দিয়েছেন— তা আদালতে জানানোর জন্য বলেছে সুপ্রিম কোর্ট।
গত শুনানিতে রাজ্য সরকার আদালতে জানায়, তদন্তে সহযোগিতা করছেন না সুমিত। তাই তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার বলে আদালতে সওয়াল করেন রাজ্যের আইনজীবী সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। অন্য দিকে সুমিতের আইনজীবী পাল্টা সওয়াল করেন, তাঁর মক্কেল তদন্তকারীদের তলবে হাজিরা দিচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি এ-ও জানান, সংবিধান তাঁকে নীরব থাকার অধিকার দিয়েছে। কোনও প্রশ্নের উত্তর না দেওয়ার অধিকার তাঁর রয়েছে। এটি তাঁর সাংবিধানিক অধিকার।
দু’পক্ষের বক্তব্যের পর আদালত বলেছিল, ‘‘সংবিধান একজন ব্যক্তিকে নীরব থাকার অধিকার দিয়েছে। আবার সংবিধান তদন্তকারী সংস্থাকেও গ্রেফতার করার অধিকার দিয়েছে। এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।’’
পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনিতে টাকার বিনিময়ে সরকারি জমি বিক্রি করা হত বলে অভিযোগ। তার জন্য বানানো হত ভুয়ো নথিও। অভিযোগ, এর সবটাই হত অভিষেকের আপ্তসহায়কের সম্মতিতে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে নামে পুলিশ। তাঁর খোঁজ শুরু হয়। কিন্তু সুমিতের কোনও ঠিকানাতেই তাঁর খোঁজ না-পাওয়ায় আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল পুলিশ।
পুলিশের আবেদনের ভিত্তিতে মেদিনীপুরের মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত সুমিতের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল। তার পরেই আইনজীবীর মাধ্যমে আগাম জামিন চেয়ে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন সুমিত। হাই কোর্ট তাঁর আর্জি খারিজ করে দেওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন সুমিত। তাঁকে অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত নির্দেশ দেয়, এই মামলায় তদন্তকারীদের সহযোগিতা করতে হবে সুমিতকে। একই সঙ্গে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ জানায়, সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সুমিতকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে পুলিশ।