তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ ভেঙে পড়ে বিপর্যয়ের জন্য পূর্বতন তৃণমূল সরকারকেই দায়ী করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত এই ঘটনায় ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১৯ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
তৃণমূলকে বিঁধে বৃহস্পতিবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘সব জায়গায় টাকা নিতে নিতে সিটি অফ জয়কে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে। এটা (এই দুর্ঘটনা) আপনাদের পাপের ফল।’’ ভেঙে পড়া গুদামের নকশায় কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমেরও সই রয়েছে বলে জানিয়েছেন শুভেন্দু। তাঁর মন্তব্য, ‘‘কাউকে ছাড়া হবে না।’’
তৃণমূল আমলে ছাড় পাওয়া সমস্ত নির্মাণকাজের নকশা খতিয়ে দেখতে কলকাতা পুরসভা এলাকায় সমস্ত বাড়ি তৈরির কাজ আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত রাখা হবে বলে বুধবারই জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বৃহস্পতিবার তিনি জানান, কলকাতা পুরসভা ছাড়াও রাজারহাট, পূজালি, বজবজ, সোনারপুর, মহেশতলা-সহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় আগামী ৪ সপ্তাহ সমস্ত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হচ্ছে। সব রিপোর্ট অডিট হওয়ার পরে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে এ দিন বিধানসভায় ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সকালেই শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলির প্রতি সমবেদনা ব্যক্ত করে পরিবারপিছু দু’লক্ষ টাকা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মুখ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, আহতদের ১ লক্ষ টাকা করে দেবে রাজ্য সরকার। কেন্দ্রের তরফে তাঁদের ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
তারাতলার ভেঙে পড়া গুদামের নকশার ছাড়পত্র গত ১৭ জানুয়ারি কলকাতা পুরসভা দিয়েছিল বলে বুধবার জানিয়েছিলে মুখ্যমন্ত্রী। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় তিনি এই সংক্রান্ত নথি দেখিয়ে তিনি দাবি করেন, তাতে কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের স্বাক্ষর রয়েছে। তাঁর মন্তব্য, “এই দেখুন মাননীয় ফিরহাদ হাকিমের সই। দেখুন আপনারা কী ভাবে, স্ট্রাকচারে ডিফেক্ট থাকা অবস্থায় ফল্টি প্ল্যান অ্যাপ্রুভ করেছেন। ফল্টি ডিজ়াইন। এই রকম কত কাণ্ড করে রেখেছেন, তার ঠিক নেই।” তৃণমূলের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে মুখ্যমন্ত্রী এ দিন আরও বলেন, “কী করেছেন আপনারা! আমরা পুরো ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং বের করেছি। কোনও ছাড়াছাড়ির সিন নেই।”
মুখ্যমন্ত্রী যখন এই অভিযোগ করছেন, ফিরহাদ হাকিম তখন বিধানসভায় উপস্থিত ছিলেন না। পরে শুভেন্দুর তোলা অভিযোগ প্রসঙ্গে কলকাতার প্রাক্তন মেয়র বলেন, “এ ব্যাপারে আমার জানা নেই। সাধারণ ভাবে পুরসভার প্ল্যান অনুমোদন হয় বিল্ডিং ডিপার্টমেন্ট থেকে। এমবিসি-তে (মিউনিসিপ্যাল বিল্ডিং কমিটি) টেকনিক্যাল লোকেরা থাকেন। আমার তাতে কোনও এক্তিয়ার নেই। কোনটা বেআইনি হল, কোনটা হল না, সেটা দেখারও এক্তিয়ার আমার নেই। এমবিসি থেকে কমিশনার হয়ে অনুমোদনের জন্য আমার কাছে আসে। ওটা শুধু একটা ফর্মালিটি, সই করার জন্য।’’ ভেঙে পড়া গুদামটির প্ল্যানের বিষয়ে তাঁর কিছুই জানা নেই বলেও দাবি করেছেন ফিরহাদ।
কলকাতা পুরসভা থেকে বিল্ডিং প্ল্যান পাশ করানোর প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী এ দিন ‘কালী’ নামে এক ব্যক্তির কথা বলেছেন। সূত্রের খবর, তিনি মেয়র ফিরহাদ হাকিমের ওএসডি ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “পুরসভায় কী হয়েছে আমরা জানি না? কালীকে তুললে সব বেরিয়ে যাবে। কলকাতা পুরসভায় কালী না-বললে কোনও প্ল্যান হয় না। সবাই জানে কালীকে নিয়োগ করেছে ক্যামাক স্ট্রিট। এই কালী বাইপাসের পাশে আপনাদের তৃণমূল ভবন বানাচ্ছে ২০০ কোটি টাকা দিয়ে। এখান থেকে টাকা তুলে ওখানে পাঠায়। আমরা সব জানি, সব বের করেছি।”
আরও পড়ুন:
কলকাতা পুরসভা এলাকায় তৃণমূল জমানায় পাশ হওয়া সমস্ত বাড়ি, বিশেষ করে বাণিজ্যিক নির্মাণের কাজ ৩১ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত রাখা হবে বলে বুধবারই জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। এ দিন সেই পরিসর আরও বাড়িয়ে তিনি বলেন, ‘‘কলকাতা পুরসভা, রাজারহাট-নিউটাউন, মহেশতলা, বজবজ, পূজালি, বিষ্ণুপুর গ্রামীণ এলাকা, সোনারপুর, বারুইপুর পুর এলাকায় জরুরি পরিষেবা ছাড়া সমস্ত নির্মাণকাজ চার সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখলাম। সমস্ত অনুমোদিত প্ল্যান অডিট হবে। এর জন্য কমিটি তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। এই কমিটির নেতৃত্ব দেবেন অতিরিক্ত মুখ্যসচিব রাজেশ পাণ্ডে। কমিটিতে থাকবেন অতিরিক্ত মুখ্যসচিব খলিল আহমেদ, বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের প্রধানসচিব রাজেশ কুমার সিংহ, কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ, কলকাতার পুর কমিশনার ও পুর প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডে, শ্রম দফতরের সচিব রচনা ভগত। এ ছাড়া পূর্ত দফতরের প্রধান ইঞ্জিনিয়ার, ডিজি বিল্ডিং (কেএমসি), ডিজি দমকলের একজন করে প্রতিনিধি থাকবেন। খড়্গপুর আইআইটি-র একজন প্রতিনিধি এবং রাইটস ও ইরকমের এক জন করে প্রতিনিধিও থাকবেন কমিটিতে।’’
বিপর্যয় মোকাবিলা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়েও এ দিন তৃণমূল জমানার দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তারাতলার গুদামটিতে ভারী ভারী লোহার বিমের উপরে ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছিল। ভার নিতে না-পেরে সবসুদ্ধ ভেঙে পড়ে। ছাদের নীচে চাপা পড়েন শ্রমিকেরা। কিন্তু লোহার বিম কাটার মতো কোনও যন্ত্রই রাজ্য সরকারের ভাঁড়ারে ছিল না বলে অভিযোগ শুভেন্দুর। তৃণমূলের পরিষদীয় দলের মুখ্য সচেতক আখরুজ্জামানের উদ্দেশে তিনি বলেন, “ভারী বিম কাটার কোনও মেশিন রাখেননি আপনারা। আপনাদের সরকার ১৫ বছরে অনেক কাণ্ড করেছেন। লোহা কাটার মেশিনটা পর্যন্ত কেনেননি। কেন এই ক্ষতিটা করে দিয়ে গিয়েছেন বাংলার? কোনও আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। কোনও পেশাদার টিম নেই।”
এই অবস্থায় ভারতীয় সেনাই ত্রাতা হয়ে আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে হাজির হয় বলে জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ভারতীয় সেনা ২১৫ জন জওয়ানকে পাঠায় উদ্ধারকাজে সাহায্যের জন্য। তিনি বলেন, “ওই লোহা পড়লে কেউ বাঁচে না। বিহার রেজিমেন্ট সমস্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে এসেছে বলে ২০টা লোককে জীবিত বের করতে পেরেছি।” মুখ্যমন্ত্রী জানান, বুধবারের দুর্ঘটনার পর ৩০ মিনিটের মধ্যে উদ্ধারকাজ শুরু হয়। কলকাতা পুলিশ, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, সেনা এবং সিভিল ডিফেন্স একযোগে উদ্ধারকাজে হাত লাগায়। সেই উদ্ধারকাজ এখনও চলছে।
অন্য দিকে, বিকেলে বিধানসভায় অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত জানান ভবিষ্যতে তারাতলার মতো ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধারকাজের জন্য ২০০ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের নিয়ে একটি বিশেষ বাহিনী তৈরি করা হবে। তার মধ্যে ৫০ জন করে থাকবেন পাহাড় ও সুন্দরবনে। বাকি ১০০ জনকে রাজ্যের বিভিন্ন অংশে মোতায়েন করা হবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- বুধবার দুপুরে তারাতলার ওই নির্মীয়মাণ গুদাম আচমকাই ভেঙে পড়ে। সেই গুদাম তৈরির কাজ করছিলেন বেশ কয়েক জন শ্রমিক।
- দুর্ঘটনার কারণে ভেঙে পড়া গুদামের ধ্বংসস্তূপের তলায় আটকে পড়েন তাঁরা।
- তারাতলা বিপর্যয়ে গুদামের মালিক শম্ভুনাথ বেহরাকে পাকড়াও করেছে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে খবর, বুধবার মধ্যরাতে তারাতলা এলাকারই একটি আবাসন থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
-
অনুমোদনে গাফিলতির কথাই উঠে আসছে তারাতলা বিপর্যয়ে, মেয়র ফিরহাদের প্রাক্তন ওএসডি কালীচরণের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
-
তারাতলা-কাণ্ড: নির্মাণে ছাড়পত্র, বির্তকে ফিরহাদের সই, প্রশ্ন তুললেন দুই প্রাক্তন মেয়র
-
তারাতলায় ভেঙে পড়া গুদামের নকশা পুলিশের হাতে! কোথায় ত্রুটি, খতিয়ে দেখবেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞেরা
-
তিন ভাইয়ের মৃত্যু, সঙ্গে অর্থসঙ্কট! নিজে বাঁচলেও মুঙ্গের থেকে তারাতলায় কাজে আসা মানিকের চোখেমুখে হতাশা
-
ফিরহাদের গ্রেফতারি চেয়ে সুর চড়াচ্ছে কালীঘাট-তৃণমূল, বাম, কংগ্রেসও! ‘নিরাপত্তার’ প্রশ্নে কি বিপাকে ঋতব্রতের শিবির?