অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে প্রাক্তন বনাম বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর তরজা গড়াল একেবারে অন্য খাতে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশে শুভেন্দু অধিকারীর ‘ফেসবুকে থাকুন, বাড়ি থেকে বেরোতে হবে না’ মন্তব্যের পর ফেসবুক থেকেই তাঁকে নিশানা করলেন তৃণমূলনেত্রী। শুভেন্দুর ‘ব্যবস্থা করব’ মন্তব্যের প্রেক্ষিতে দেশের রাষ্ট্রপতি, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, সর্বোপরি জনতার দরবারে তিন বারের মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন, সংবিধান কি এমন ভারতের কল্পনা করেছিল?
অন্নপূর্ণা যোজনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ নিয়ে সোমবার ফেসবুক লাইভে বিজেপি সরকারের কড়া সমালোচনা করেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে প্রত্যুত্তরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বিভিন্ন কথার মাঝে বলেন, ‘‘ফেসবুকেই থাকুন... আপনাকে রাস্তায় আর বেরোতে হবে না। রাস্তায় আপনি যাতে না বেরোতে পারেন, তার ব্যবস্থাও আমি করব।’’ এর কয়েক ঘণ্টা পর ফেসবুক এবং অন্যান্য সমাজমাধ্যমে দীর্ঘ পোস্ট করেছেন মমতা। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন স্তরের রাজনীতি হল। শুভেন্দু সরকারি দফতরে বসে প্রকাশ্যে তাঁকে হুমকি দিয়েছেন এবং ঘোষণা করেছেন যে, তিনি নিশ্চিত করবেন যেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বাড়ি থেকেও বার হতে না পারেন। মমতা লেখেন, “আমি ভারতের মাননীয় রাষ্ট্রপতি, ভারতের মাননীয় প্রধান বিচারপতি এবং ভারতের জনগণের কাছে প্রশ্ন রাখছি, এই কি আমাদের সংবিধানের কল্পিত ভারত?’’ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সংযোজন, “একজন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী— যিনি সংবিধান রক্ষার জন্য শপথ নিয়েছেন, তিনি দেশের প্রধান বিরোধী দল, সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রীর চলাফেরার স্বাধীনতা হরণ করার প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছেন!’’ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, শুভেন্দুর উচ্চারিত শব্দগুলো স্পষ্ট ও দ্বিধাহীন: ‘আমি নিশ্চিত করব যাতে আপনি বাড়ি থেকে বের হতে না পারেন।’ মমতা লেখেন, “এর আসল অর্থ কী? গৃহবন্দি? ভয় দেখানো? না কি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা? একটি সাংবিধানিক গণতন্ত্রে কে স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করতে পারবেন, তা ঠিক করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?”
আসলে মমতার আমলে যা ছিল লক্ষ্মীর ভান্ডার, শুভেন্দুর আমলে তা হয়েছে অন্নপূর্ণা যোজনা। প্রকল্পের লক্ষ্য, মহিলাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া। সোমবার সেই প্রকল্প নিয়েই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিঁধেছিলেন বর্তমান রাজ্য সরকারকে। পাল্টা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি তোপ দাগেন তিন বারের মুখ্যমন্ত্রীকে। দুই তরফই একে অপরকে অভিযুক্ত করেছে তোষণ এবং ভাগাভাগির রাজনীতি করার জন্য। শুভেন্দুর সরকারের অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে জেলায় জেলায় মহিলাদের বিক্ষোভ দেখা গিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের জন্য যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও প্রতিশ্রুতিমাফিক তিন হাজার টাকা পাচ্ছেন না। সরকারি অফিসে গিয়ে হয়রানি হতে হচ্ছে। আবার এ প্রশ্নও উঠেছে যে, ভোটের প্রচারে তো যোগ্যতার মানদণ্ডের কথা বলা হয়নি। তখন বিজেপি বলেছিল, যাঁরা লক্ষ্মীর ভান্ডার পেয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকে অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা পাবেন। আর্থিক বরাদ্দও হবে ‘ডবল’।
সোমবার ফেসবুক লাইভে ঠিক এই বিষয়ই তুলে ধরেন তৃণমূলনেত্রী মমতা। তাঁর অভিযোগ, অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা ‘বাছাই’ করে দেওয়া হচ্ছে। মমতা বলেন, ‘‘দেখে, দেখে, চেখে চেখে দিচ্ছেন। বর্ণ দেখে দিচ্ছেন।’’ তার কিছু ক্ষণ পরে নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে বসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। এই প্রসঙ্গে পাল্টা তাঁর খোঁচা, ‘‘বাছাবাছি উনি করতেন। আমি করি না।’’ শুভেন্দুর ব্যাখ্যা, ‘‘উনি (মমতা) আবার ধর্ম নিয়ে ইঙ্গিত করছেন। এর আগে বলেছিলেন, ‘আমি আছি বলে আছো, নইলে একটা কমিউনিটি এক সেকেন্ডে শেষ করে দেবে।’ ওঁর ইঙ্গিত তো পরিষ্কার!’’ তার পর পূর্বসূরির বিরুদ্ধে তোষণের রাজনীতির অভিযোগ করেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী। উদাহরণ দিতে গিয়ে নিজের বিধানসভার একটি পঞ্চায়েতের তথ্য তুলে ধরেন তিনি। কাগজ উঁচিয়ে বলেন, ৮৬ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী রয়েছেন ওই এলাকায়। কিন্তু মমতার আমলে আবাস যোজনার সুবিধা পেয়েছিলেন মাত্র দু’জন। এমন ভূরি ভূরি উদাহরণ তাঁর কাছে আছে। ওই প্রসঙ্গেই তিনি তথ্য দেন, এ পর্যন্ত অন্নপূর্ণা যোজনায় ১ কোটি ৪৫ লক্ষ ৬৪ হাজার ৪৭২ জনের অ্যাকাউন্টে টাকা ট্রান্সফার হয়ে গিয়েছে। তাঁদের মধ্যে ‘মুসলিম বেনিফিশিয়ারি’ রয়েছেন ১৯ লক্ষ ২০ হাজার। শুভেন্দুর কথায়, ‘‘যাঁরা যোগ্য, তাঁরা হিন্দু না মুসলমান, বিজেপি না তৃণমূল, দেখি না।’’
মমতা এবং তাঁর দলের বিরুদ্ধে শুভেন্দুর অভিযোগ, কেবল বিজেপি করা এবং হিন্দু হওয়ার ‘অপরাধে’ মতুয়া, নমশূদ্র, রাজবংশী, আদিবাসী থেকে পাহাড়ের মহিলাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। এখন তাঁরাও অন্নপূর্ণা যোজনায় টাকা পাচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রী জানান, এ জন্য তাঁরা পোর্টাল চালু করেছিলেন। যেখানে সাড়ে চার লক্ষ অভিযোগ এসেছে। অভিযোগকারীদের বেশির ভাগই জানিয়েছেন, যোগ্য না হয়েও তাঁদের চেনা লোক মহিলাদের আর্থিক সহায়তার প্রকল্পের সুবিধা নিচ্ছেন। আগামী ৩১ অগস্ট এ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
অন্য দিকে, মমতা ঘোষণা করেছেন, যাঁরা অন্নপূর্ণা যোজনা থেকে বাদ পড়েছেন তাঁদের ভার নেবেন। বঞ্চিতদের নাম-ঠিকানা, পেশা, যোগ্যতা ইত্যাদির তথ্য সংগ্রহ করবেন। তার পর আবার বিজেপি সরকারকে দুষে তিনি মন্তব্য করেছেন, কোনও প্রকল্প ঠিক করতে হলে, তার জন্য আগে থেকে টাকার বন্দোবস্ত করতে হয়। সাংবাদিক বৈঠক ওই প্রসঙ্গ উঠতেই তোপ দাগেন শুভেন্দু। তিনি মমতাকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘‘উনি বিরাট বাজেট বোঝেন! ওই জন্য আট লক্ষ কোটি টাকা ঋণের বোঝা রেখে দিয়ে গিয়েছেন। কর্মচারীদের ডিএ দেননি। এরিয়ার পেনশন দেননি। নিয়োগ আটকে রেখেছিলেন! আর আমি ৩০০০ কোটি টাকা স্থায়ী কর্মচারীদের রিটায়ার্ড পেনশনারস্ এবং সুপ্রিম কোর্টের অর্ডারে পেমেন্ট করে কমপ্লিট করে দিয়েছি।’’
কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি।
মমতার ফেসবুক লাইভ করা নিয়েও খোঁচা দেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, ‘‘ফেসবুকেই থাকুন আপনি, বিকেলবেলায়। আপনাকে রাস্তায় আর বেরোতে হবে না। রাস্তায় আপনি যাতে না বেরোতে পারেন, তার ব্যবস্থাও আমি করব।’’ বারুইপুর ধর্ষণ এবং হত্যাকাণ্ড এবং হালিশহরে প্রাক্তন তৃণমূলের কাউন্সিলরের স্বামীর জেলে মৃত্যু প্রসঙ্গ টেনে তৃণমূলনেত্রীকে খোঁচা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘আপনি বারুইপুর নিয়ে খেলতে গিয়েছিলেন। গোল খেয়ে বাড়ি ফিরেছেন। হালিশহর নিয়েও চেষ্টা করেছিলেন, সেখানেও ডবল গোল খেয়েছেন। কথা কম বলুন। বিশ্রাম করুন। অনেক বয়স হয়েছে।’’
রাতে শুভেন্দুর নবান্নে বসে বলা মন্তব্য তুলে ধরেন মমতা এবং চ্যালেঞ্জের সুরে লিখেছেন, “সম্ভবত উনি আমাকে সেই সব নেতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন, যাঁরা স্বৈরাচারের সামনে মাথা নত করতে অভ্যস্ত। কিন্তু আমি স্পষ্ট বলতে চাই, এটি ওঁর মারাত্মক ভুল ধারণা।’’ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জানান, বিষয়টি শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলে নয়। শুভেন্দু যে মন্তব্য করেছেন তা ‘তাৎপর্যপূর্ণ’। মমতার কথায়, ‘‘এটা বিজেপির তৈরি করতে চাওয়া সেই ভবিষ্যতের ভারত, যেখানে রাজনৈতিক বিরোধীদের হুমকি দেওয়া হয়। ভিন্নমতকে শাস্তি দেওয়া হয় এবং সাংবিধানিক অধিকারকে শাসকদলের অনুদান হিসেবে গণ্য করা হয়।’’
দীর্ঘ পোস্টের শেষাংশে মমতা লিখেছেন, ‘‘ইতিহাস একটি চিরন্তন শিক্ষা দেয়: ক্ষমতা হয়তো কিছু সময়ের জন্য ভয় দেখাতে পারে, কিন্তু ঔদ্ধত্যকে শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছে জবাবদিহি করতেই হয়।’’