E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

কোথায় নজর, গুলিয়ে গিয়ে গোল খেল সরকার

কোন প্রশ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে, কাকে কোথায় দায়িত্ব দিতে হবে— সে সব গুলিয়ে ফেলেই প্রথম পুজোয় বিশ্রী গোল খেয়ে বসেছে রাজ্য সরকার ও প্রশাসন!

সন্দীপন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৫৫
লালবাজারে ট্রাফিক কন্ট্রোল রুমে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

লালবাজারে ট্রাফিক কন্ট্রোল রুমে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। — নিজস্ব চিত্র।

উত্তরে যখন পুজোর ভিড়ে মানুষ পদপিষ্ট হচ্ছেন, দক্ষিণে তখন পুরসভার কর্মীদের সঙ্গে বুলডোজ়ার নিয়ে বইয়ের বিপণি ভাঙতে হাজির পুলিশ বাহিনী! এমনকি, চোরবাগানের পুজো মণ্ডপে বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যখন হাসপাতালে বসে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছেন, মধ্যরাতেও যাদবপুরে আবার বইয়ের স্টল তুলে দিতে গিয়েছিল পুলিশ। এমন দৃশ্য কলকাতা দেখেনি আগে!

কলকাতায় পুজোয় ‘থিম’, ঠাকুর দেখতে কাতারে কাতারে মানুষ, হঠাৎ বৃষ্টি— এ সব কোনও কিছুই নতুন নয়। তবু রাজ্যে নতুন সরকারের আমলে প্রথম দুর্গা পুজোয় অব্যবস্থার ছবি এমন প্রকট কেন? যার মর্মান্তিক পরিণতিতে চোরবাগানে এখনও পর্যন্ত হারাতে হয়েছে ১৯টি প্রাণ। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শিবিরের একাংশের মত, কোন প্রশ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে, কাকে কোথায় দায়িত্ব দিতে হবে— সে সব গুলিয়ে ফেলেই প্রথম পুজোয় বিশ্রী গোল খেয়ে বসেছে রাজ্য সরকার ও প্রশাসন!

কে কোথায় দুধ গরম করতে পারবেন, উড়ালপুলে কেমন রং দিলে খোলতাই হবে, পুজোকে দুর্গা পুজো না শারদোৎসব কী নামে ডাকা যাবে, সংবাদের শিরোনামে কী লেখা যাবে, পুজোয় আমিষ না নিরামিষ খাওয়া বিধেয় হবে, কে কোথায় কোন বই বিক্রি করতে পারবেন— এই রকম অজস্র বিষয়ে অনবরত ‘পরামর্শ’ দিয়ে গিয়েছেন সরকার তথা শাসক দলের মাথারা। কিন্তু শহরে পুজোর সময়ে মানুষ ও গাড়ির ভিড় সামলাতে কী করণীয়, সেটা ঠিক করতেই তাঁরা যেন ভুলে গিয়েছিলেন! অন্তত চোরবাগানের ঘটনার পরে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাতেই স্পষ্ট যে, আগে সব ঠিক ছিল না। শহরের একাধিক পুজোর উদ্যোক্তারা জানাচ্ছেন, ভিড় ব্যবস্থাপনায় গাফিলতির কথা কয়েক দিন ধরেই তাঁরা প্রশাসনের নজরে আনার চেষ্টা করে গিয়েছেন। কিন্তু টনক নড়েছে চোরবাগানে বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার পরে।

উৎসবের মধ্যে এমন গুরুতর ঘটনার ‘দায়’ সরকারকেই নিতে হবে বলে দাবি তুলেছে বিরোধীরা। শাসক বিজেপি নেতারা পাল্টা দাবি করছেন, এখন ‘রাজনীতি করা’র সময় নয়। সেই সঙ্গেই বিগত জমানায় পথে জমা জলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু বা পাহাড়ে বানে প্রাণহানির কথা নিজেরাই তুলে এনে বিরোধীদের উদ্দেশে তাঁরা বলছেন, কাসুন্দি ঘাঁটবেন না! বিরোধীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অতীতে ওই সব ঘটনার সময়েই বিজেপি নেতারা তৎকালীন সরকারকে কাঠগড়ায় তুলে মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েছিলেন। ক্ষমতায় থাকাকালীন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা এখানে কিছু ঘটলে উত্তরপ্রদেশের ঘটনা টেনে আনতেন, বিজেপি নেতারা এখন উত্তর কোরিয়ায় চলে যাচ্ছেন! বিজেপির এক প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি আবার অতীতচারী হয়ে বানতলা-ধানতলা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছেন!

রাজনৈতিক চাপানউতোর সরিয়ে শহরে গত কয়েক দিনের ছবির দিকে নজর দিলেই অব্যবস্থা বোঝা যাবে। দক্ষিণ কলকাতায় দেশপ্রিয় পার্ক, হিন্দুস্তান ক্লাব, হিন্দুস্তান পার্ক, সিংহী পার্কের মতো পুজোয় বরাবরই ভিড় থাকে। প্রতি বছর পরিস্থিতির আগাম মূল্যায়ন করে পুলিশি বন্দোবস্তও থাকে। কিন্তু এই বছর টি-শার্ট পরা অস্থায়ী কর্মীরা বাদে পুলিশ আধিকারিকদের দেখা পাওয়া যায়নি শনিবার পর্যন্ত। অভিজাত একটি পুজো কমিটির সঙ্গে যুক্ত বর্ষীয়ান এক কর্তার কথায়, ‘‘শুধু উদ্যোক্তাদের ঘাড়ে দায় চাপালে চলবে কী করে? সব জায়গা থেকে ছাড়পত্র (এনওসি) নিয়েই পুজো হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত গার্ড রেল নেই, পুলিশ আধিকারিক নেই, এই রকম অবস্থা দেখিনি আগে। ভিড় বাড়ছে দেখে আমরা বারবার পুলিশ-প্রশাসনকে জানিয়েছি। কয়েকটা দিন কার্যত মা দুর্গার ভরসায় কেটেছে! শেষ পর্যন্ত শনিবার বেশি রাতে পুলিশ আধিকারিকেরা এসে পরিস্থিতি জরিপ করেছেন।’’

প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক শিবিরের একাংশ একবাক্যে বলছে, কলকাতায় পুজো সামলানোয় বরাবরই পুলিশ অতুলনীয়। দক্ষ হাতে তারা গাড়ি ও ভিড় সামাল দেয়। এ বার সরকারি হিসেবে কলকাতা পুলিশ এলাকায় ৪০০ এবং রাজ্য পুলিশ এলাকায় ১২ হাজার পুজো বেড়েছে। বাড়তি পুজো মানে বাড়তি ভিড়ও। অথচ পুলিশি বন্দোবস্ত এত ঢিলেঢালা থাকল কেন, সিনিয়র আধিকারিকদের কেন অন্য বারের মতো গোড়া থেকে ময়দানে দেখা যায়নি, সেই প্রশ্ন ভাবাচ্ছে অনেককেই। চোরবাগানের ঘটনার পরে পুজো সামলানোয় অভিজ্ঞ ৯ জন আইপিএস-কে কলকাতায় ফেরোনার কথা বলেছেন পুলিশমন্ত্রী। প্রশ্ন উঠেছে, দক্ষ পুলিশ-কর্তা যে অপ্রতুল হয়ে যাচ্ছে, পুজোর আগে ভাবা হল না? ‘ভিআইপি কার্ডে’র নামে বিশৃঙ্খলাও কি নজরে আসেনি?

চোরবাগান নিয়ে প্রশ্ন আরও বেশি এই কারণে যে, অনেক আমন্ত্রণে সাড়া দিতে না-পারলেও সে পুজোর উদ্বোধনে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। পুরনো কমিটি খুঁটি পুজো করে ফেলার পরে বিজেপি নেতাদের হস্তক্ষেপে সেই পুজোর কার্যত ‘রাজনৈতিক অধিগ্রহণ’ হয়েছিল। রাস্তা অপরিসর, থিমের কারণে আলো অপর্যাপ্ত, এ সব বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্বোধনের সময়ে কেউ নজর দেয়নি কেন, সে প্রশ্ন এড়ানোর উপায় নেই। বরং, ঘটনার পরে সরকারের ভাবগতিক দেখে পুজো উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, ‘‘এর পরে না বলা হয়, থিমই বাতিল! পুরোপুরি সনাতনী কায়দা চলবে শুধু।’’ দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের পরামর্শ প্রায় বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দিয়ে বিজেপির নানা স্তরের নেতারা বিভিন্ন কমিটির রাশ নেওয়ার পরে পুজো সামলানোয় দক্ষ পুজো-কর্তাদের একাংশ যে এ বার আসরে নেই, সে কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন কেউ কেউ।

সরকার না-চাইলেও সরকারের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে নানা মহল থেকেই। মমতা-তৃণমূলের সাংসদ মহুয়া মৈত্র যেমন বলছেন, ‘‘পুজো মণ্ডরে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার চেয়ে সিপিএমের বইয়ের বিক্রি বন্ধ করতে বিজেপির সরকার বেশি উদগ্রীব!’’ সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর মতে, ‘‘পুলিশ চিরকালই মসৃণ ভাবে পুজোর ব্যবস্থা করতে সহায়ক হয়। এখন পুলিশকে যদি শাসক পক্ষকে ভোটে জেতাতে বা অন্য দলের বইয়ের স্টল ভাঙতে ব্যস্ত রাখা হয়, তা হলে যা হওয়ার, তা-ই হচ্ছে। হিন্দু হিন্দু করে নানা রকম জ্ঞান দিয়ে বাংলার এবং বিশেষত, হিন্দুদের শ্রেষ্ঠ উৎসবে নিরানন্দ নিয়ে এসেছে এই সরকার!’’ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারেরও অভিযোগ, ‘‘বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বাঙালির ধর্মাচরণ, বাঙালির সাংস্কৃতিক গতিবিধি, বাঙালির পুজো-পার্বণ নিয়ে লম্বা-চওড়া কথা বলেন! অথচ একটা পুজোয় ভিড় সামলানোর যে পদ্ধতি, তাতেই তাঁর প্রশাসন সম্পূর্ণ ব্যর্থ।’’

বিরোধীদের সমালোচনা বন্ধ রাখতে বলে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অবশ্য বলছেন, তাঁদের সরকার কাউকে ‘আড়াল’ করতে চায় না বলেই বিচারবিভাগীয় তদন্ত হচ্ছে। তাঁর কথায়, ‘‘ত্রুটি তো আছেই। আয়োজকদের ত্রুটি আছে। স্থানীয় পুলিশেরও দেখা উচিত ছিল। সে জন্য তথ্য অনুসন্ধানকারী দল হচ্ছে। যারা ছাড়পত্র দিয়েছে, সেই পুরসভা, পুলিশ, দমকলকে তার থেকে বাদ রাখা হবে। কর্তব্যরত বিচারপতির নেতৃত্বে তথ্য অনুসন্ধানকারী দল করতে চাই।’’

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Suvendu Adhikari Lal Bazar

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy