এক দিকে চলছে ২১ জুলাই ‘শহিদ দিবস’ পালনের প্রস্তুতি। তারই পাশাপাশি ঘটে চলেছে কালীঘাটপন্থী তৃণমূল কংগ্রেসে বিদ্রোহ। আর এর মধ্যে টানাপড়েন বাড়ছে ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই মহাকরণ অভিযানে পুলিশের গুলিতে নিহতদের (‘শহিদ’) পরিবারকে ঘিরে!
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে এ বার শহরে তিনটি ‘শহিদ সমাবেশ’ হতে চলেছে ২১ তারিখ। হাই কোর্টের নির্দেশে মমতার তৃণমূল ‘শহিদ স্মরণে’র বাৎসরিক কর্মসূচি করবে বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের বিদ্রোহী তৃণমূলের সমাবেশ হবে মেয়ো রোডে গান্ধীমূর্তির পাদদেশে। তার অদূরেই শহিদ মিনার ময়দানে কংগ্রেসের সমাবেশ। শহিদ মিনার ময়দানে মাইক ও দলের পতাকা ব্যবহারে পুলিশ বাধা দিচ্ছে বলে সরব হয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব। কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের নেতারা তাঁদের সমাবেশ নিয়ে রবিবার ফের বৈঠক করেছেন পুলিশ-কর্তাদের সঙ্গে। বিদ্রোহীদের তরফে অরূপ রায়, ফিরহাদ হাকিম, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, সন্দীপন সাহারা মেয়ো রোডে প্রস্তুতি খতিয়ে দেখেছেন। তিন কর্মসূচির উদ্যোক্তা তিন পক্ষই যোগাযোগ করেছেন ‘শহিদ’ পরিবারদগুলির সঙ্গে।
হুগলির সাহাগঞ্জের বাসিন্দা অসীম দাসের পরিবারকে যেমন তিন পক্ষই আমন্ত্রণ জানিয়েছে। অসীম সেই ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন। অসীমের ভাই শিবু বলেছেন, ‘‘৩৩টা বছর যিনি আমাদের দেখলেন, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বেইমানি করতে পারব না। দিদির সঙ্গ ত্যাগ যাঁরা করেছেন, তাঁরা নির্লজ্জ বেইমান! তাঁদের সঙ্গে থাকতে পারব না। আমার মনে হয়, সব শহিদ পরিবারের সদস্যেরাই ওই দিন দিদির ডাকে সভায় যাবেন।’’ কালীঘাটপন্থী নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষেদের দাবিও সেই রকমই। যদিও আর এক ‘শহিদ’, বরানগরের বিশ্বনাথ রায়ের পরিবারের অভিযাগ, এত দিন মমতা তাঁদের নিয়ে রাজনীতি করেছেন, এখন অন্যেরাও করতে চাইছেন। এই টানাপড়েনে তাঁরা কোনও সভাতেই যেতে চান না।
বিদ্রোহী তৃণমূলের নেতা ফিরহাদ বলেছেন, ‘‘আমরা শহিদ পরিবারগুলিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। আশা করি, সবাই আসবেন। সে দিন আমরা যারা শহিদ হতে পারতাম, তাদের বেশির ভাগ মানুষই ওই দিন এখানে থাকব। শহিদ পরিবারেরা থাকবে, যারা শহিদদের পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছে, তারা থাকবে।’’ তৃণমূলত্যাগী কাকলি ঘোষ দস্তিদারদের এনসিপিআই অবশ্য কাল, মঙ্গলবার দিল্লির রাজঘাটে ‘শহিদ স্মরণ’ করবে।
কংগ্রেসের ‘শহিদ মিনার চলো’র প্রচার-গাড়ির সূচনায় ‘শহিদ’ পরিবারের প্রতিনিধি ছিলেন। এ বারের কর্মসূচির দায়িত্বপ্রাপ্ত কংগ্রেস নেতা অমিতাভ চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘আমরা কোনও প্রতিযোগিতায় নেই। শহিদ পরিবারগুলিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আমরা বলেছি, তাঁদের প্রিয়জনের মৃত্যুর সময়ে কংগ্রেস বা যুব কংগ্রেসেরই পতাকা হাতে ছিল। বাকিটা তাঁরা বিবেচনা করবেন।’’
এমতাবস্থায় তৃণমূল নেত্রীকে চিঠি পাঠিয়ে দল ছেড়েছেন হুগলির বর্ষীয়ান নেতা তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তপন দাশগুপ্ত। চিঠিতে তিনি নীতিগত অবস্থান, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং তৃণমূলে বিভাজনের পরিস্থিতির কারণে দল ছাড়ার কথা জানিয়েছেন। পরে তপন বলেছেন, ‘‘অভিষেকের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ আর তোলাবাজির জন্য আই-প্যাক তোলাপ্যাকে পরিণত হওয়াতেই তৃণমূলের ভরাডুবি ঘটেছে! এখন চার ধরনের তৃণমূল! দিদি (মমতা) আমাকে বিধায়ক থেকে জেলা সভাপতি— সবই করেছিলেন। আই-প্যাকের কথা শুনে এ বার টিকিট দেননি।’’ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর কাজের প্রশংসাও করেছেন তপন।
মমতার মঞ্চেই ২১ তারিখ থাকবেন জানিয়ে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ বাবুল সুপ্রিয় মন্তব্য করেছেন, ‘‘বিজেপিতে যাব না, এই কথাটা আমি কেন বলব? ওরা কি আমার জন্য মালা নিয়ে অপেক্ষা করছে নাকি আমি মালা কিনেছি? রাঘব চাড্ডা হওয়ার কোনও ইচ্ছা নেই আমার!’’
বঙ্গ রাজনীতিতে ২১-এর বাতাবরণ এ বার নাটকীয়!