Advertisement
E-Paper

রাজ্যের ৩২ জন পর্যটকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি! জানান মুখ্যমন্ত্রী, বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজে গিয়ে নিখোঁজ বাঁকুড়ার যুবকও

নেপালের রুশাইয়ে জলস্রোতে সেতু ভেঙে পড়ার পর থেকেই নিখোঁজ বাঁকুড়ার ইন্দপুরের বাসিন্দা অশোক পাল। পূর্ব বর্ধমানে থাকতেন বোনের বাড়িতে। যে এলাকায় সেতুটি ভেঙে পড়েছে, গত ১০ বছর ধরে সেখানে একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পে সুপারভাইজ়ার হিসেবে কাজ করেন তিনি।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৭ অগস্ট ২০২৬ ২২:৫৮
বিপর্যস্ত নেপাল।

বিপর্যস্ত নেপাল। ছবি: সংগৃহীত।

নেপালে হড়পা বানের পরে কেটে গিয়েছে ৩৬ ঘণ্টারও বেশি সময়। এ রাজ্য থেকে নেপালে বেড়াতে যাওয়া পর্যটকদের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করতে পারছে না পরিবার। ক্রমে তাদের উদ্বেগ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানালেন, পশ্চিমবঙ্গ থেকে নেপালে যাওয়া ৩২ জন পর্যটকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। এক জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা গিয়েছে। একই কথা জানাল যে পর্যটন সংস্থার সঙ্গে ওই ৩২ জন কৈলাস যাত্রার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন, তারাও। নেপাল হয়েই কৈলাসে যাওয়ার কথা ছিল তাঁদের। পথে হয় বিপত্তি। বাঁকুড়ার বাসিন্দা এক যুবকেরও খোঁজ নেই। গত ১০ বছর ধরে তিনি কাজ করছেন নেপালের এক বিদ্যুৎ প্রকল্পে। দু’বছরের সন্তানকে নিয়ে উদ্বেগে স্ত্রী।

মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, নেপালে বিপর্যয়ের খবর মেলার পরে ভবানী ভবনে একটি এবং তাঁর সচিবালয়ে একটি পুলিশ কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। সেখানে মেলা খবর থেকেই জানা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের ৩৩ জন নেপালে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘স্বরাষ্ট্রসচিব জানান, এক জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা গিয়েছে। বাকি ৩২ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।’’ ওই ৩২ জনের মধ্যে পাঁচ জনের বাড়ি কলকাতা পুলিশের অধীনস্থ এলাকায়। বাকি ২৭ জনের বাড়ি পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের অন্তর্গত থানা এলাকায়। তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে স্থানীয় থানা, প্রশাসন। শুভেন্দু জানান, প্রধানমন্ত্রীর দফতর (পিএমও)-এর সঙ্গে কথা হয়েছে। নেপালে ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে মুখ্যসচিবের দফতর কথা বলছে। তাঁর কথায়, ‘‘নেপাল আমাদের বন্ধু-দেশ। ভারত তাদের সাহায্য করছে। আমাদের খুব বেশিকিছু করতে হবে না। তবে আমরা সজাগ।’’

অন্য দিকে, যে পর্যটন সংস্থার সঙ্গে ৩২ জন কৈলাস যাত্রায় গিয়েছিলেন, তারা জানিয়েছে, চার জনকে নেপালে পাঠানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার তাঁরা পৌঁছে গিয়েছেন। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে মিলে কৈলাস যাত্রার ব্যবস্থাপনা করেছিল তারা। সেই সংস্থার সঙ্গেও যোগাযোগ রয়েছে। ৩২ জনের খোঁজ মেলেনি। তাঁদের মধ্যে কেউ গিয়েছিলেন স্বামী, সন্তানকে রেখে একাই। এক দম্পতি আবার সন্তান হারানোর শোক ভুলতে গিয়েছিলেন ভ্রমণে।

কলকাতা

বুধবার সকাল ৭টা ২০ মিনিটে শেষ বার মিতালি মিত্রের সঙ্গে কথা হয়েছিল স্বামী প্রবীর মণ্ডলের। সে সময় হোটেল থেকে চেকআউট করেছিলেন তিনি। প্রবীর জানালেন, তার দেড়া ঘণ্টা পরে নেপালের হড়পা বানের সময় মিতালি ঠিক কোথায় ছিলেন, তা জানেন না। এখনও স্ত্রীর সঙ্গে কোনও যোগাযোগই করতে পারেননি। আর তাতেই উদ্বেগ বেড়েছে বলে জানালেন প্রবীর। মিতালির বাড়ি দক্ষিণ ২৪ পরগনার মৌখালিতে। বেহালার কাছে একটি স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন। প্রবীর জানিয়েছেন, বুধবার বৃষ্টির জন্য মোবাইলের নেটওয়ার্ক দুর্বল ছিল। হোটেলের ওয়াইফাইও ঠিকমতো কাজ করছিল না। মিতালি তাঁকে চেকআউটের সময় ফোন করে জানিয়েছিলেন, সীমান্তে যাওয়ার জন্য বেরিয়েছেন। তার পর থেকেই খোঁজ নেই। যে ভ্রমণসংস্থার সঙ্গে তিনি গিয়েছিলেন, তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন প্রবীর। ভবানী ভবনেও যোগাযোগ করেছেন।

সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে মঙ্গলবার রাতে শেষ বার কথা হয়েছিল পরিবারের। কন্যা গার্গী বসু জানান, ২৬ তারিখ সকালে সমাজমাধ্যমে একটা পোস্ট দিয়েছিলেন তাঁর বাবা। বুধবার সকাল ৬টা নাগাদ পোস্ট করা সেই স্টেটাসে তিনি জানিয়েছিলেন যে, সীমান্তের দিকে যাচ্ছেন। এখনও তাঁর সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করা যায়নি। সুভাষ আদতে দুর্গাপুরের বাসিন্দা। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন।

হুগলি

কলকাতার এক পর্যটন সংস্থার সঙ্গে চন্দননগরের দম্পতির নেপাল যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বয়সের কারণে ছাড়পত্র পাননি স্বামী রবীন পাটারী। তাই একাই গিয়েছিলেন শিপ্রা রায় পাটারী। সিঙ্গুর গোলাপ মোহিনী স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষিকা শিপ্রার ৬ সেপ্টেম্বর ফেরার কথা ছিল। কিন্তু বুধবার থেকে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যায়নি। শিপ্রার ভাই অখিল রায় জানান, বুধবার সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা অনুমান করছি, হড়পা বানের সময় চিনা সীমান্তে অনুমতি আদায়ের জন্য ওঁরা বাসে চেপে গিয়েছিলেন। এখনও পর্যন্ত কোনও খবর পাচ্ছি না, দুশ্চিন্তা রয়েছে।’’

উত্তরপাড়ার ভদ্রকালী পানপাড়া বাই লেনের বাসিন্দা ক্ষিতীশ বিশ্বাস এবং তাঁর স্ত্রী মমতা বিশ্বাসও নেপালে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন। তাঁদের বাড়িতে তালা ঝুলছে। প্রতিবেশীরা জানান, দম্পতির একমাত্র মেয়ে ১৮ বছর বয়সে দুর্ঘটনায় মারা যান। তার পর থেকে পুজো নিয়েই থাকতেন রেলকর্মী ক্ষিতীশ এবং তাঁর স্ত্রী। দু’জনে ঘুরে বেড়াতেন। গত ২১ অগস্ট কলকাতার ভ্রমণসংস্থার সঙ্গে কৈলাস মানস সরোবর ঘুরতে গিয়েছিলেন। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, পুলিশ পাড়ায় এসে খবর নিয়ে গিয়েছে।

পূর্ব বর্ধমান

নেপালের রুশাইয়ে জলস্রোতে সেতু ভেঙে পড়ার পর থেকেই নিখোঁজ বাঁকুড়ার ইন্দপুরের বাসিন্দা অশোক পাল। পূর্ব বর্ধমানে থাকতেন বোনের বাড়িতে। যে এলাকায় সেতুটি ভেঙে পড়েছে, গত ১০ বছর ধরে সেখানে একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পে সুপারভাইজ়ার হিসাবে কাজ করেন তিনি। ঘটনার পর থেকে তাঁর সঙ্গে কোনও ভাবে যোগাযোগ করতে না পেরে উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তাঁর আত্মীয়-পরিজনেরা। অশোকের বোন কবিতা দাস জানান, বুধবার সকাল ৮টা ২০ মিনিট নাগাদও অশোকের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। তার পরে আর খোঁজ মেলেনি। অশোকের স্ত্রী তাঁদের দু’বছরের শিশুপুত্রকে নিয়ে বীরভূমের মল্লারপুরে বাপের বাড়িতে থাকেন। অশোকই পরিবারের একমাত্র রোজগেরে। পরিবারের সদস্যেরা জানান, দুর্গাপুজোর সময়ে তাঁর বর্ধমানে ফেরার কথা ছিল। অশোকের এক আত্মীয় জানান, ওই বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ৪০ জন কর্মী কাজ করছিলেন। দুর্ঘটনার পর থেকে তাঁদের কারও সঙ্গেই যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।

পশ্চিম মেদিনীপুর

৬২ বছরের স্বপনকুমার সিংহের সঙ্গে গত মঙ্গলবার রাতে শেষ বার কথা বলেছিল পরিবার। তিনি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার খড়্গপুরের হিজলির প্রেমবাজার এলাকার বাসিন্দা। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, কলকাতার একটি পর্যটন সংস্থার সঙ্গে গত ২১ অগষ্ট মানস সরোবরের উদ্দেশে একাই রওনা হয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী। স্ত্রী স্কুল শিক্ষিকা, পুত্র শিক্ষক। স্বপনের দাদা মিলনকুমার সিংহ বলেন, ‘‘বুধবার যখন টিভিতে নেপালের ঘটনা দেখি, তার পর থেকে উদ্বেগে রয়েছি। আমরা যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সম্ভব হয়নি। কলকাতার ওই পর্যটন সংস্থার সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারিনি।’’ ভারতীয় দূতাবাস, ভবানী ভবন কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করেছেন বলে জানান তিনি।

পুরুলিয়া

পুরুলিয়া শহরের কুকস কম্পাউন্ড এলাকার বাসিন্দা অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রী মৌসুমী গঙ্গোপাধ্যায় কর্মসূত্রে থাকেন দুর্গাপুরে। সেখান থেকেই তাঁরা নেপালের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্যোগের পর থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যেরা। অরিন্দমের কাকিমা ভারতী গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘‘ওদের জন্য খুবই চিন্তা হচ্ছে। দু’জনকেই ফোন করেছি। এক জনের ফোন বন্ধ এবং আর একজনের ফোনেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। খুবই দুশ্চিন্তায় রয়েছি আমরা।’’

Nepal flood

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy