দু’জন আলাদা ব্যক্তি। অথচ, তাঁদের ডাক্তারি পাশের রেজিস্ট্রেশন নম্বর এক। একই তারিখে একই সংস্থা দু’জনকে একই রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিল কী ভাবে? আবার ভিন্ রাজ্যের সেই নথির ভিত্তিতে ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিল ওই দু’জনকে এ রাজ্যে প্র্যাক্টিসের অনুমতি দিয়েছে বলেও অভিযোগ। বিষয়টি সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসার পরে, ভিন্ রাজ্যের মেডিক্যাল কাউন্সিল জানিয়ে দিয়েছে ওই রেজিস্ট্রেশন ভুয়ো!
অথচ, সেই ভুয়ো রেজিস্ট্রেশন নিয়েই দীর্ঘ দিন ধরে কেউ করলেন অস্ত্রোপচার, আবার কেউ করলেন স্ত্রী-রোগের চিকিৎসা! সমস্ত তথ্য-সহ দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ এবং তাঁদের এ রাজ্যের প্র্যাক্টিসের অনুমতি দেওয়ার নেপথ্যে ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিলের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ দায়ের হয়েছে।
রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘ দিন ধরেই। এ বার অভিযোগ উঠল ভুয়ো নথির ভিত্তিতে রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, নিয়ম অনুযায়ী, ভিন্ রাজ্য থেকে পাশ করে এ রাজ্যে এসে ডাক্তারি করতে হলে প্রথমে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলে সমস্ত নথি জমা করতে হয়। এর পরে এখানকার কাউন্সিলের তরফে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের কাউন্সিলের সঙ্গে যোগাযোগ করে জমা নথির সত্যতা দেখা হয়।
চিকিৎসকদের প্রশ্ন, সেই প্রক্রিয়া যদি যথাযথ ও স্বচ্ছ ভাবেই হয়ে থাকে, তা হলে ‘বিহার কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশন’-এর থেকে ২০০৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ‘৩৬৪৪২’— এই রেজিস্ট্রেশননম্বর কী ভাবে দু’জনকে দেওয়া হল? এবং সেটা এ রাজ্যের মেডিক্যাল কাউন্সিলের স্ক্রুটিনিতে ধরাপড়েনি কেন?
জানা যাচ্ছে, ওই নথি জমা দিয়ে এক জন ২০১৮ সালে এবং অন্য জন ২০২২ সালে ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিল থেকে রেজিস্ট্রেশন নিয়েছেন। ওই দুই সময়কালে সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার ছিলেন মানস চক্রবর্তী। এ বিষয়ে জানতে তাঁকে ফোন করা হলে তিনি ধরেননি, মেসেজেরও উত্তর দেননি। রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের সরকার মনোনীত সদস্য-চিকিৎসক মৃন্ময় অধিকারী বলেন, ‘‘গুরুতর অভিযোগ। যা বিগত সরকারের আমলে কাউন্সিলের দুর্নীতি চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণ করছে। সভাপতি এর দায় এড়াতে পারেন না। নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।’’ কাউন্সিলের সভাপতি, প্রাক্তন বিধায়ক তথা চিকিৎসক সুদীপ্ত রায় বলেন, ‘‘বিষয়টি খতিয়ে দেখে বলতে পারব।’’
সম্প্রতি এই দুই ‘ভুয়ো’ চিকিৎসকের বিষয়ে স্বাস্থ্য দফতরে অভিযোগ দায়ের করেছেন অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড নার্সিংহোমের সম্পাদক, চিকিৎসক রাজীব পাণ্ডে। তিনি জানান, ওই দু’জনের এক জন বর্ধমানে শল্য এবং স্ত্রী-রোগ ও প্রসূতি চিকিৎসক হিসেবে প্র্যাক্টিস করছেন। অন্য জন উত্তর ২৪ পরগনায় ‘কসমেটিক গাইনোকোলজিস্ট’ হিসেবে প্র্যাক্টিস করেন। সম্প্রতি বর্ধমানে অস্ত্রোপচারের পরে চার বছরের একটি শিশুর মৃত্যু হয়। তার পরেই ওই চিকিৎসকেরবিষয়ে চিকিৎসক মহলেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
রাজীব বলেন, ‘‘দু’টি বিষয়ই জানার পরে বিহার মেডিক্যাল কাউন্সিলে চিঠি পাঠিয়ে সত্যতা জানতে চাই। এক দিনের মধ্যেই তারা জানায়, দু’জনের রেজিস্ট্রেশনই ভুয়ো। ওই নথি-সহ স্বাস্থ্য দফতরে অভিযোগ করেছি।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল কি আদৌনথি খতিয়ে দেখেছিল? না কি, এই রকম ভুয়ো রেজিস্ট্রেশন পাইয়ে দেওয়ার নেপথ্যে বড় কোনও চক্র রয়েছে, তা তদন্ত করে দেখার আবেদনও করেছি।’’
খোদ স্বাস্থ্য দফতরের অন্দরের খবর, বর্ধমানের অভিযুক্ত শেখ সইদুল হক স্থানীয় প্রায় ২৬টি নার্সিংহোমে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে অস্ত্রোপচারের তালিকাভুক্ত। এ দিন তাঁকে ফোন করা হলে ধরেননি, মেসেজের উত্তর দেননি। অন্য দিকে উত্তর ২৪ পরগনার জুলফিকার মোল্লার দাবি, ‘‘কার সঙ্গে আমার রেজিস্ট্রেশন নম্বর মিলছে বলতে পারব না। ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিলে নথি জমা দিয়েছিলাম, তারা সব খতিয়ে দেখে এখানকার রেজিস্ট্রেশন দিয়েছেন। যা বলার ওরা বলতে পারবেন।’’
বিহারের কাউন্সিলের তরফে এ রাজ্যের কাউন্সিলকেও সব জানানো হয়েছে বলেই খবর। স্বাস্থ্য দফতরের এক শীর্ষ কর্তা এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘পুরো বিষয়টি তদন্ত প্রক্রিয়ারমধ্যে রয়েছে।’’