পূর্ব প্রতিশ্রুতি মতো শনিবার রাজ্য বিধানসভায় সিএজি রিপোর্ট পেশ করল রাজ্য সরকার। এ দিন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট ২৮টি রিপোর্টের আলোচনার জন্য বিশেষ অধিবেশন হবে। অন্য দিকে, এ দিনই অর্থ বিল পেশ করেছে রাজ্য। তাতে প্রফেশনাল ট্যাক্স এবং জিএসটি-তে কিছু সংশোধন করে সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে। রাজ্যের দাবি, করের বোঝা কমিয়ে আরও বেশি মানুষকে করের আওতায় আনা গেলে রাজ্যের আয় বাড়বে। অর্থমন্ত্রীর দাবি, এই পদক্ষেপ ছাড়াও নিজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তাতে চলতি অর্থবর্ষের (২০২৬-২৭) শেষে নিজস্ব আয় ১৮ শতাংশ বাড়তে পারে।
অন্য দিকে, এ দিন প্রফেশনাল ট্যাক্স আইনে যে সংশোধনী আনা হয়েছে তার আওতায় এমন কর্মীদের রাখা হয়েছে (বেসরকারি-সহ) যাঁরা এ রাজ্যে কর্মরত অথচ অফিসের মূল প্রতিষ্ঠান ভিন্ রাজ্যে অবস্থিত, এবং সেখান থেকে হওয়া বেতন এ রাজ্যে থেকে হাতে পান। আগে এই ক্ষেত্রে সংস্থার সদর দফতর যে রাজ্যে অবস্থিত সেই রাজ্যই ওই কর্মীর প্রফেশনাল ট্যাক্স পেত। এ বার তা পাবে এ রাজ্য। অফিস কর্তৃপক্ষও এ বার থেকে তাঁদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মীর সংখ্যা সরকারকে জানাবেন। তা ছাড়া, প্রফেশনাল ট্যাক্স না দিলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হত। কর খেলাপির জেল পর্যন্ত হতে পারত। এ বার তাকে অপরাধ হিসাবে ধরা হবে না। বরং কিছু ক্ষেত্রে জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানান, প্রফেশনাল ট্যাক্সে বেতনের ঊর্ধ্বসীমা ১০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। সরকারের আশা, এই সব সংস্কারের ফলে কর ফাঁকি কমবে। পাশাপাশি, জিএসটি-র ক্ষেত্রেও কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। আগে কোনও বিক্রেতা পণ্য বিক্রি করার পরে ক্রেতা যদি কিছু পণ্য ফেরত দিতেন, তাতে অর্থ ফেরত বা ছাড় পাওয়ার সুযোগ ছিল না। এ বার তা পাওয়া যাবে।
অর্থমন্ত্রী বিধানসভায় জানান, প্রফেশনাল কর আদায় ছাড়াও, যত ব্যবসা, শিল্প, আর্থিক গতিবিধি বাড়বে, তত বাড়বে আয়। জিএসটি সংগ্রহ বাড়ানো এবং তা সময়মতো আদায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। কর কমিয়ে ‘ট্যাক্স-নেট’ বাড়ানোতেও বেশি কাজ হবে। স্বপনের কথায়, ‘‘এ বছরের শেষে ১৮% নিজস্ব আয় বাড়ানো যাবে বলে মনে হচ্ছে।’’
এ দিকে, সিএজি রিপোর্টও বিশেষ ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ, সিএজি রিপোর্ট থেকে বোঝা যায়, দফতরগুলি কী ভাবে কাজ করেছে। আর্থিক শৃঙ্খলা থেকে অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয়েছে কি না—সবের খুঁটিনাটি তথ্য জানা যায়। এ দিন বিধানসভায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘‘এই রিপোর্ট থেকে বোঝা যাবে, রাজ্যের ঘাটতি ৮ লক্ষ কোটির বেশি কেন!’’
সূত্রের খবর, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষ পর্যন্ত সময়কালের রিপোর্ট তৈরি করেছে সিএজি। তাতে রাজ্যের আর্থিক স্বাস্থ্য, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ ব্যবহারের বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হয়েছে। রিপোর্ট বলছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫৭,২৬৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ করা হয়েছিল, যা অপ্রয়োজনীয়। শুধু ২০২৪-২৫ সালে, তৃণমূল সরকারের শেষের আগের বছরে অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত খরচ হয়েছিল ১৩,৪৮৬ কোটি টাকা। এমনকি, সেস বাবদ ১৮০৯ কোটি টাকা সম্মিলিত তহবিলে পাঠানো হয়েছিল ২০২৪-২৫ সালে। কিন্তু তা পাঠানো হয়নি পাবলিক অ্যাকাউন্টে। তাই আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে সিএজি। রিপোর্টে ধরা পড়েছে, রাজ্যের জিএসডিপি ৯.৯১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে। তবে রাজ্যের রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে ৩৯,৭২৭ কোটি টাকা, যা জিএসডিপি-র ৩.৪১ শতাংশ। জিএসডিপির তুলনায় ধারের হার দাঁড়িয়েছে ৩৮.৬৬ শতাংশ, তা এফআরবিএম (ধার করার সীমা)-এর থেকে কিছুটা বেশি। ২০১৫-১৬ থেকে ২০২৪-২৫ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে রাজ্যের এবং রাজকোষ ঘাটতিও এই সময়কালে বেড়েছে ১২.৩৮ শতাংশ। রাজ্যের রাজস্বের ৫২ শতাংশ এসেছিল কেন্দ্রের থেকে। অডিটে ধরা পড়েছে, রাজ্যের ৪১ শতাংশ রাজস্ব খরচ এসেছে ধার করে। তাতে আর্থিক বোঝা আরও বেড়েছিল।