স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বাম আমলের দেখানো পথেই হাঁটতে চাইছে বিজেপি’র সরকার? ৩৩ বছর আগের সিদ্ধান্তের ‘আংশিক পুনরাবৃত্তি’ দেখে বর্ষীয়ান সরকারি চিকিৎসকদের একাংশের মনে পড়ছে ১৯৯৩ সালে বাম সরকারের ‘বিতর্কিত’ পদক্ষেপ।
সাল ১৯৯৩। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়— ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল এডুকেশন সার্ভিস’, ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল হেল্থ সার্ভিসেস’। এর ফলে রাজ্যের প্রতিটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ মেডিক্যাল এডুকেশন সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত হয়। জেলা হাসপাতাল, গ্রামীণ হাসপাতাল, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি হেল্থ সার্ভিসেসের অধীনে চলে আসে। মেডিক্যাল এডুকেশন সার্ভিসেসের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকেরা প্রাইভেট প্র্যাক্টিস করতে পারবেন না বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। সেই বিজ্ঞপ্তিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন মেডিসিনের চিকিৎসক সুকুমার মুখোপাধ্যায়, অবনী রায়চৌধুরী, হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ অঞ্জন দত্ত, এন্ডোক্রিনোলজিস্ট দেবাশিস মাজির মতো বিশিষ্ট শিক্ষক-চিকিৎসকেরা। শেষপর্যন্ত আদালতের রায় সরকারের পক্ষেই গিয়েছিল। এর পর ১৯৯৪ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে বেসরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সুকুমার মুখোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্ট চিকিৎসকেরা। সোমবারের বিতর্কিত নির্দেশিকার প্রেক্ষিতে নব্বইয়ের দশকের পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না সরকারি চিকিৎসকদের একাংশ।
প্রশ্ন হল, রোগীদের নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিবর্তনের সরকার যদি সরকারি চিকিৎসকদের সপ্তাহে তিন দিন হাসপাতালে থাকা বাধ্যতামূলক করেন, তা হলে এত গেল-গেল রব ওঠার কারণ কী?
এই প্রশ্নের উত্তরে সরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রের ‘মুখ’ বলে পরিচিত চিকিৎসকদের বক্তব্য, ১৯৯৩ সালে বাম আমলের নির্দেশিকা শেষপর্যন্ত ২০০৬ সালে বাম আমলের সরকারকেই প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। রাজ্যের ‘মেধাবী’, ‘প্রতিভাবান’ চিকিৎসকেরা যাতে ভিন্রাজ্য বা কর্পোরেট হাসপাতালে না চলে যান, সে জন্যই নির্দেশিকা প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। এখন যাঁরা সিনিয়র চিকিৎসক, তাঁরা বছর কুড়ি আগে সরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ‘প্রাইভেট প্র্যাক্টিসে’র সুযোগ রয়েছে, তা জেনেই স্বাস্থ্য দফতরের চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। তা হলে কোনও রকম আলোচনা ছাড়া আচমকা সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের কী অর্থ? সুকুমার মুখোপাধ্যায়দের উদাহরণ টেনে এসএসকেএমের এক সিনিয়র চিকিৎসক বলেন, ‘‘স্যারেরা চলে যাওয়ায় লাভবান হয়েছিল বেসরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্র। সরকারি মেডিক্যাল কলেজে পড়তে আসা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরা স্যারদের মতো শিক্ষকদের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছিল।’’
সোমবারের নির্দেশিকা প্রসঙ্গে প্রবীণ চিকিৎসক সুকুমার মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘এই নির্দেশিকায় সরকারি চিকিৎসকদের আংশিক প্র্যাক্টিস বন্ধ করা হয়েছে। কিন্ত কোনও চিকিৎসক ৭২ ঘণ্টা প্র্যাক্টিস বন্ধ রাখছেন কি না, তা নজরদারি কে করবেন? এই নির্দেশিকার বাস্তবায়নে জটিলতা হবে। হয়তো আমাদের সময়ের মতো পুরোপুরি প্র্যাক্টিস বন্ধ করার প্রাথমিক ধাপ। সরকার কেন ৩৩ বছর আগের সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে আনল তা তারাই ভাল বলতে পারবে!’’
আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের হৃদ্রোগ বিভাগের এক চিকিৎসক বলেন, ‘‘বেসরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রের তরফে সিনিয়র চিকিৎসকদের মাসে আট-দশ লক্ষ টাকার পারিশ্রমিকের প্রস্তাব রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে কেটেকুটে একজন প্রফেসরের বেতন এক থেকে দেড় লক্ষ টাকা। তবুও সব রকম প্রলোভন দূরে সরিয়ে গবেষণা, রোগী পরিষেবা, শিক্ষকতাকে ভালবেসে অনেকে সরকারি হাসপাতালে থেকে গিয়েছেন। এর পরও যদি বাম আমলের মতো প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করার কথা বলা হয়, তা হলে চাকরি ছেড়ে দেওয়া ছাড়া উপায় কী!’’ যদিও এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়া, ‘‘কেউ চাকরি ছেড়ে যাবে না। নিশ্চিন্ত থাকুন। এখনও কি কেউ চাকরি ছেড়েছেন? দেখুন না কী হয়।’’ তাঁর আশ্বাস, ‘‘১৯৯৩ সালের মতো অর্ডার এটা নয়। আমি ডাক্তারবাবুদের কাছে হাতজোড় করে ৭২ ঘণ্টা সময় চেয়ে নিচ্ছি।’’
তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী যা-ই বলুন, চাকরি ছাড়ার দৃষ্টান্ত তৈরি হওয়া শুরুও হয়ে গিয়েছে। সম্প্রতি এসএসকেএমের নেফ্রোলজি বিভাগের এক চিকিৎসক ইস্তফা দিয়েছেন। বিজেপির শীর্ষনেতৃত্বের সঙ্গে ‘সুসম্পর্ক’ রয়েছে এমন এক বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্টও স্বাস্থ্য ভবনের নির্দেশিকায় ‘ক্রুদ্ধ’। তাঁর বক্তব্য, ‘‘এক তো এই নির্দেশিকায় যে সকল চিকিৎসকের সপ্তাহে দু’দিন অ্যাডমিশন ডে তিনি কী করবেন তা স্পষ্ট করা হয়নি। এ ছাড়া অ্যাডমিশন ডে’র বাইরেও অনেকগুলো বিষয় রয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে কোনও রোগীর অস্ত্রোপচার করতে হলে দিনের দিন অস্ত্রোপচার করা হয়। নচেৎ রোগী ভর্তির সাধারণত তিন দিন পরে অস্ত্রোপচার হয়। অস্ত্রোপচারের পরবর্তী সময় একজন রোগীর ক্ষেত্রে সবচেয়ে ক্রিটিক্যাল সময়। অস্ত্রোপচারের দিন অনেক চিকিৎসক সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওটি কক্ষে থাকেন। তা হলে একজন সার্জনের ক্ষেত্রে ৭২ ঘণ্টা কবে থেকে ধরা হবে?’’
তবে ভিন্ন মতও রয়েছে। এসএসকেএমের ফিজিক্যাল মেডিসিনের বিভাগীয় প্রধান রাজেশ প্রামাণিক বলেন, ‘‘সরকারি নির্দেশিকা যখন, তখন তো মানতেই হবে। তাই আমি যেখানে প্র্যাক্টিস করি সেখানে জানিয়ে দিয়েছি, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতিবার আমার পক্ষে প্রাইভেটে রোগী দেখা সম্ভব নয়!’’ এসএসকেএমের স্কুল অফ লিভার ডিজিজ়ের এক সিনিয়র চিকিৎসকেরও একই বক্তব্য।
নির্দেশিকা ঘিরে দ্বিধাবিভক্ত দুই শিবিরের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলা চিকিৎসক দলও রয়েছেন। নিউ টাউনে আদানি গোষ্ঠী যে দু’হাজার শয্যার বেসরকারি হাসপাতাল নির্মাণ করতে চলেছে, তা সোমবার নবান্নে জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের ‘প্র্যাক্টিস’ সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রকাশিত হয়। নতুন সরকারের প্রতি ‘সহানুভূতিশীল’ চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, সরকারের এই নির্দেশিকা একটা ধাক্কা দিয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এই ধাক্কার প্রয়োজনও ছিল বলে দাবি তাঁদের। তবে আলোচনার ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ করা হলে বিতর্কের মাত্রা কমত বলে মনে করা হচ্ছে। সরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্র থেকে অবসরপ্রাপ্ত এক প্রভাবশালী চিকিৎসক বলেন, ‘‘সরকারি হাসপাতালের ৯০ শতাংশ রোগী স্বাস্থ্যসাথী কার্ডে ভর্তি হন। কার্ডিওলজির চিকিৎসক বেসরকারি হাসপাতালে স্বাস্থ্যসাথীর রোগীর অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করে পান ১৮ হাজার টাকা। সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন স্বাস্থ্য সাথীতে প্রচুর রোগীর অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করলেও চিকিৎসক কোনও ইনসেন্টিভ পান না। প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ন্ত্রণের নির্দেশিকা প্রকাশের আগে এই বিষয়গুলি নিয়ে ভাবা প্রয়োজন ছিল।’’
তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘এই নির্দেশিকা প্রাথমিক ভাবে দেওয়া হয়েছে। এমন নয় এটাই চূড়ান্ত নির্দেশিকা। পরিস্থিতি বুঝে নির্দেশিকা পরিবর্তন করা হবে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় আরও একটি নির্দেশিকা জারি করা হবে। নন ক্লিনিক্যাল বিষয় যেমন অ্যানাটমি, বায়োকেমিস্ট্রি, ফিজিওলজি, প্যাথলজি, ফরেনসিক মেডিসিন, মাইক্রোবায়োলজি যে এই নির্দেশিকার বাইরে তা জানিয়ে দেওয়া হবে।’’
চিকিৎসকদের এই ‘অসন্তোষে’র বার্তা নিয়ে মঙ্গলবার স্বাস্থ্য ভবনে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যান অ্যাসোসিয়েশন অফ হেল্থ সার্ভিসেসের প্রতিনিধিরা। এএইচএসডি’র সাধারণ সম্পাদক উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা হয়েছে। এই নির্দেশিকা কেন জারি করা হল তা নিয়ে মন্ত্রী তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। আমরাও চিকিৎসকদের মনে যে প্রশ্নগুলি রয়েছে সেগুলি তাঁর নজরে এনেছি। চিকিৎসকদের আশঙ্কা দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে বলে উনি আশ্বাস দিয়েছেন।’’
চিকিৎসকদের অসন্তোষের মধ্যেও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনে করিয়ে দেন, ‘‘সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা ভাববেন না বিনামূল্যে পরিষেবা দিচ্ছেন। চিকিৎসকদের তার জন্য সরকার বেতন দিচ্ছে। কোনও পরিষেবাই কেউ ফ্রিতে দিচ্ছেন না। সরকারি অর্থ মানে জনগণের টাকা। তাই জনগণকে অবহেলা করতে পারব না। জনগণের পয়সায় হাসপাতাল চলে। জনগণের পয়সায় চিকিৎসকেরা শিক্ষকতা করেন। সুতরাং আমাকে তো জনগণকে উত্তর দিতে হয়। জনগণের প্রতি চিকিৎসা পরিষেবা যেন অব্যাহত থাকে, তাই এই নিয়ম করা হয়েছে। পরিষেবা যাতে উন্নতমানের হয়, সে জন্য ৭২ ঘণ্টা সময় ধার্য করা হয়েছে।’’