ফোন নম্বর গোপন রেখে শুধু নাম (ইউজ়ারনেম) ব্যবহার করে বার্তা আদান-প্রদানের ব্যবস্থা চালু করতে উদ্যোগী হয়েছে হোয়াট্সঅ্যাপ। চলতি বছরের শেষের দিকে এই ব্যবস্থা চালু করতে চায় হোয়াট্সঅ্যাপের পেরেন্ট সংস্থা মেটা। তাদের যুক্তি, এর ফলে হোয়াট্সঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা বাড়বে। বিশেষ করে অপরিচিত কারও সঙ্গে বার্তালাপের সময় বা নতুন কোনও গ্রুপে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের ফোন নম্বর গোপন রাখা যাবে। আবার শুধু ফোন নম্বর জানা থাকলেই কাউকে হোয়াট্সঅ্যাপ বার্তা পাঠিয়ে দেওয়া যাবে না। তাঁর ইউজ়ারনেম ঠিকঠাক জানা থাকতে হবে।
এতে সিঁদুরে মেঘ দেখছে কেন্দ্রীয় সরকার। তাদের আশঙ্কা, এর ফলে ভুয়ো পরিচয় দিয়ে প্রতারণা থেকে শুরু করে অন্যান্য মারাত্মক অপরাধের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে হোয়াট্সঅ্যাপ। সে ক্ষেত্রে অপরাধীদের শনাক্ত করতে কালঘাম ছুটবে পুলিশের। কেন্দ্রীয় সরকারের এক আধিকারিকের কথায়, “কোনও নামজাদা লোক, সংস্থা বা সংগঠনের নামে বা কাছাকাছি নামের ইউজ়ারনেম তৈরি করে প্রতারণার ফাঁদ পাতা হতে পারে। ডিজিট্যাল অ্যারেস্টের ঘটনা তো আমরা হামেশাই দেখছি। ফোন নম্বর গোপন করা হলে প্রতারকদের ধরা আরও অসম্ভব হয়ে উঠবে।’’
বুধবার মেটাকে নোটিস পাঠিয়ে তাদের পরিকল্পনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে কেন্দ্র। বলা হয়েছে, আলোচনাপর্ব শেষ না-হওয়া পর্যন্ত এই ব্যবস্থা ভারতে চালু করা যাবে না। মেটার অবশ্য দাবি, তারা সর্বোচ্চ সুরক্ষার ব্যবস্থা করছে। বিশিষ্ট ব্যক্তি, সরকারি সংস্থা বা ভেরিফায়েড মেটা অ্যাকাউন্টের ইউজ়ারনেম সংরক্ষিত থাকবে, প্রকৃত ব্যক্তি বা সংস্থা ছাড়া আর কেউ সেগুলি ব্যবহার করতে পারবে না।
হোয়াট্সঅ্যাপের নতুন এই ফিচার নিয়ে ব্যবহারকারীরা কী ভাবছেন? জেন জ়ি-দের পাশাপাশি তুলনায় প্রবীণ নেটাগরিকদের সঙ্গেও কথা বলল আনন্দবাজার ডট কম।
হোয়াট্সঅ্যাপের নতুন ফিচারকে ‘খুব একটা কাজের’ মনে করছেন না অভিনেত্রী স্বস্তিকা দত্ত। তাঁর মতে, কেউ নকল ইউজ়ারনেম ব্যবহার করে বিরক্ত করতে পারেন। তা ছাড়া, কাজের জন্য যাঁদের সঙ্গে হোয়াট্সঅ্যাপে যোগাযোগ, তাঁদের কাছে নম্বর এমনিতেই থাকে। তাই সেটা আড়াল করার কী প্রয়োজন, প্রশ্ন স্বস্তিকার।
অভিনেতা বিক্রম চট্টোপাধ্যায় আবার বলছেন, “কাজের সূত্রে আমাদের এমন অনেকের সঙ্গে কথা বলতে হয়, যাঁদের ফোন নম্বর না-দিলেও চলে। সে দিক থেকে দেখলে এই ব্যবস্থাটা বেশ ভাল বলেই মনে হচ্ছে।”
হোয়াট্সঅ্যাপের নয়া ব্যবস্থা ঘিরে টলিউডের মতোই মতানৈক্য জেন জ়ি-র মধ্যেও। বছর ঊনত্রিশের ইভানা নাজ়ির যেমন বলছেন, “যোগাযোগের ক্ষেত্রে ফোন নম্বর ব্যবহার করা হলে অবশ্যই ভাল। কারণ তাতে আমার উল্টো দিকে থাকা ব্যক্তিটিকে চিহ্নিত করতে সুবিধা হয়। বিষয়টা অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্যও মনে হয়।”
আবার আইটি কর্মী বছর চৌত্রিশের পিয়ালি মাইতির মতে, “বর্তমানে অধিকাংশ চ্যাটিং হোয়াট্সঅ্যাপ নির্ভর। যেমন জ়োম্যাটো, বিজ়নেস অ্যাড, প্রোমোশন ইত্যাদি। আর সেই জন্য অনেক অচেনা মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হয়। সকলের সঙ্গে মোবাইল নম্বর শেয়ার করতে ভাল লাগে না। তাই ‘ইউজ়ারনেম’ ফিচারটা এ ক্ষেত্রে কিছুটা ইনস্টাগ্রামের মতো কাজ করবে বলে মনে হয়। সেটা মন্দ হবে না। তবে অবশ্যই ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয়টি সুনিশ্চিত করতে হবে।”
বছর পঁয়ষট্টির চিকিৎসক নির্মলেন্দু মাইতিও বলছেন, “আমরা অনেক সময় হোয়াট্সঅ্যাপে রোগীদের সঙ্গে কথা বলি। আগে তো এই সমস্ত প্রযুক্তি ছিল না। ফলে ইউজ়ারের গোপনীয়তা রক্ষাই প্রাথমিক কাজ।”
যদিও ব্যক্তিগত সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত করা যাবে, তা নিয়ে সন্দিহান বছর চল্লিশের কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী ধ্রুবজ্যোতি ভুঁইয়া। কিছুটা আক্ষেপের সুরেই বললেন, “যা-ই করুক, আজকাল জালিয়াতি (স্ক্যাম) ঠেকানোটা অসম্ভব মনে হয়।” একই সঙ্গে ঠাট্টার সুরে তাঁর সংযোজন, “আজকাল মানুষজন বড্ড বেশি সৃজনশীল। ‘ইউজ়ারনেমে’ যা রাখবেন, তা বোঝার জন্য অক্সফোর্ড ডিকশনারিও কম পড়ে যাবে।”
মেটার সিদ্ধান্তকে অবশ্য স্বাগতই জানাচ্ছেন এথিক্যাল হ্যাকিং এবং সাইবার অপরাধ দমনের সঙ্গে যুক্ত সাম্যজিৎ মুখোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, “অত্যন্ত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। কারণ, আমাদের দেশে ফোন নম্বর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ফোন নম্বরের সঙ্গে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে সরকারি নথিপত্রও যুক্ত। সেই ফোন নম্বর যত কম শেয়ার করা যায়, তত ভাল।’’
কেন্দ্রের সংশয়ের প্রশ্নে সাম্যজিতের ব্যাখ্যা, ‘‘অপরাধী খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে ফোন নম্বর এখনও একটা বড় হাতিয়ার। ফোন নম্বরের বদলে ইউজ়ারনেম থেকে তাদের শনাক্ত করে খুঁজে বার করা তুলনামূলক ভাবে কঠিন। আবার ব্যবহারকারীর গোপনীয়তার স্বার্থে বহু ক্ষেত্রে মেটা ফোন নম্বর তদন্তকারীদের না-ও জানাতে পারে। এটা আইনরক্ষকদের দিক থেকে একটা সমস্যার ব্যাপার।’’
সাম্যজিতের এই যুক্তি মেনে নিয়েছেন রাজ্য পুলিশের সাইবার অপরাধ দমন শাখার সঙ্গে যুক্ত এক আধিকারিক। সেই সঙ্গে তিনি এই বলে সতর্ক করেছেন যে, নম্বরের বদলে কেবল ইউজ়ারনেম থাকলে, অন্যের নামে বা কোনও বড় সংস্থার নামে ভুয়ো অ্যাকাউন্ট তৈরি করে জালিয়াতির সম্ভবনা বাড়বে। তিনি মনে করিয়ে দেন, ভারতের ৫০ কোটি হোয়াট্সঅ্যাপ ব্যবহারকারীর মধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ প্রযুক্তিগত ভাবে ততটা সাবলীল নন। সে ক্ষেত্রে তাঁরা ভুয়ো আর আসল অ্যাকাউন্টের ফারাক কতটা ধরতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয়ী তিনি।
সাইবার অপরাধ আইনজীবী এবং রাজ্য সরকারের স্পেশ্যাল পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) বিভাস চট্টোপাধ্যায় উপভোক্তার তথ্যের গোপনীয়তার প্রয়োজনীয়তার কথা মেনে নিয়েও, পুলিশ বা তদন্তকারী সংস্থার তদন্তে সমস্যার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘‘বহুক্ষেত্রেই হোয়াট্সঅ্যাপ গ্রুপ থেকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা থেকে শুরু বহু বড় অপরাধের সূত্রপাত হয়। কেবলমাত্র ইউজ়ার নেম থাকলে, হোয়াট্সঅ্যাপের সূত্র ধরে সেই অপরাধীকে খুঁজে বার করা কঠিন হবে।’’ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘‘এক জন অপরাধী হোয়াটস্অ্যাপ চালু করার সময় একটি সিমকার্ড ব্যবহার করে পরে ফেলে দিতে পারে। তার পর ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে অপরাধ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে মোবাইল ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারের অনুপস্থিতিতে সেই অপরাধীকে চিহ্নিত করে পাকড়াও করা কঠিন কাজ।’’