শুভেন্দু অধিকারী শপথ নিয়েছিলেন ৯ মে। পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে। পরের দিন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন সি জোসেফ বিজয়। ১৯৬৭ সালের পরে ডিএমকে বা এডিএমকে বাদে তামিলভূমে প্রথম অন্য কোনও মুখ্যমন্ত্রী।
প্রায় পাঁচ মাস পরে দুই মুখ্যমন্ত্রীই নিজের রাজ্যে জোড়া বিধানসভা উপনির্বাচনের মুখে। ভোটের ফল যা-ই হোক, দুই প্রথম বারের মুখ্যমন্ত্রীরই কাজের মূল্যায়ন করছেন রাজ্যের মানুষ। কারণ দু’জনেই আশা জাগিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। কিন্তু দু’জনের সরকারের বিরুদ্ধেই প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ার নালিশ। আবার দু’জনের বিরুদ্ধেই বিরোধী দলে ভাঙন ধরানোয় বেশি প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ। মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রাম, রেজিনগর ও তামিলনাড়ুর ধারাপুরম, মদুরান্টকম উপনির্বাচনের আগে শুভেন্দু, বিজয়ের পাঁচ মাসের কাজের চুলচেরা বিচার চলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভূত এবং ভবিষ্যৎ—এই দুই প্রশ্নেই বাংলায় প্রথম বিজেপি সরকারের আপাতত নজর। যাবতীয় চর্চাও দুই প্রশ্ন ঘিরেই। তৃণমূলের ১৫ বছরে শিল্প-বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বরং, শিল্প আরও বেহাল হয়ে পড়ার অভিযোগ ছিল। শেষ দিকে উন্নয়নের কাজও কার্যত থমকে গিয়েছিল। অপশাসন, দুর্নীতি, তোলাবাজির অভিযাগ ছিল ভূরি ভূরি। ক্ষমতায় আসার পরে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার আগের জমানার বহু ফাইল খুলেই তদন্তের পথে এগিয়েছে। প্রাক্তন মন্ত্রী-বিধায়কদের গ্রেফতারের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২০২১ সালে পায়ের আঘাত নিয়ে ‘মিথ্যাচারে’র ফাইল উদঘাটনও আছে। কিন্তু প্রশ্ন, অতীতের ফাইল ঘেঁটে কত দিন? ভূত নিয়ে এই চর্চার মধ্যেই ভবিষ্যতের স্বার্থে মুকেশ অম্বানী, গৌতম ও করণ আদানিদের সঙ্গে একাধিক বার বৈঠক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। অম্বানী-আদানিদের কাছ থেকে বিনিয়োগের প্রাথমিক প্রস্তাবও এসেছে। স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্ষেত্রে আদানি গোষ্ঠী পা রেখেছে। কিন্তু ভোটের আগে ‘সঙ্কল্পপত্রে’ দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ যাচাই প্রক্রিয়ার গেরোয় জট পেকে রয়েছে। ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র টাকা সময়ে না-পেয়ে দফায় দফায় বিক্ষোভ হচ্ছে।
একই নালিশ তামিলনাড়ুতে ‘থলপতি’ বিজয়ের বিরুদ্ধে। তিনিও মহিলাদের জন্য ২,৫০০ টাকা ভাতা চালু করবেন বলছিলেন। এখনও পেরে ওঠেননি। আগে ডিএমকে সরকারের আমলে ১ হাজার টাকা দেওয়া হত। তা-ই চলছে। শুধুমাত্র মহিলাদের জন্য নিখরচায় বাসযাত্রা, মহিলা সুরক্ষায় বিশেষ বাহিনী তৈরি করেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার চেষ্টা করেছেন। ডিএমকে-র আমলে প্রাথমিক স্কুলে মুখ্যমন্ত্রী প্রাতঃরাশ প্রকল্পের নাম বদলে তিনি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এই প্রকল্প চালু করেছেন। বিরোধীদের অভিযোগ, বিজয় শুধু প্রকল্পের নামবদল করছেন। তবে তাঁরা মানছেন, বিজয়ের টিভিকে সরকার এখনও পর্যন্ত ‘দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন’-এর ভাবমূর্তি ধরে রাখতে পেরেছে। বাংলায় বিজেপির নিচুতলায় তোলাবাজির অভিযোগ উঠলেও শুভেন্দুর প্রশাসনে এখনও সেই কালির দাগ পড়েনি। তবে দুই রাজ্যেই আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে বিরোধীরা সরব।
বিজেপির বিরুদ্ধে এখন সব থেকে বড় অভিযোগ, যে তৃণমূলকে সরিয়ে মানুষ তাঁদের ক্ষমতায় এনেছিল, তাঁরাই এখন বিজেপিতে ভিড়ছেন। তৃণমূলের একটি গোষ্ঠী সরাসরি বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। আর একটি গোষ্ঠী নামে বিরোধী হলেও আসলে বিজেপির বি-টিম বলে অভিযোগ। বিজয়ের বিরুদ্ধেও অভিযোগ, তিনি এডিএমকে-র ছয় বিধায়ককে ভাঙিয়ে নিজের দলে টেনেছেন। এই ছ’জনের মধ্যেই দু’জনের ফাঁকা আসনে মঙ্গলবার উপনির্বাচন। সেখানে এডিএমকে ছেড়ে আসা নেতারাই টিভিকে-র প্রার্থী। ঠিক যে ভাবে তৃণমূলের রাজ্যসভা সাংসদরা বিজেপিতে যোগ দিয়ে আবার বিজেপির টিকিটে রাজ্যসভায় যাচ্ছেন।
শুভেন্দু সরকারের থেকে মানুষের সব থেকে আশা শিল্প ক্ষেত্রে। নতুন সরকারের শিল্প-নীতি ও জমি-নীতির খসড়া এখনও তৈরি হচ্ছে। পুজোর পরে সরকারি নীতি আনুষ্ঠানিক ভাবে সামনে আসবে বলে সূত্রের ইঙ্গিত। একই ভাবে তামিলনাড়ুতে বিজয় স্বপ্ন দেখিয়েছেন, দশ বছরে তিনি রাজ্যের জিডিপি প্রায় পাঁচ গুণ বাড়িয়ে ১.৫ লক্ষ কোটি ডলারে নিয়ে যাবেন। নীতিও তৈরি হচ্ছে বলে টিভিকে-সরকারের দাবি। শুভেন্দু বলছেন, ‘‘মানুষ পাঁচ বছরের জন্য সরকার নির্বাচিত করেছেন। অন্তত এক বছর হলে সরকারের কাজের মূল্যায়নের একটা জায়গা থাকবে, আমরাও হিসেব দেব।’’ রবিবার প্রচার শেষে বিজয় বলেন, “মানুষ আমাদের উপরে বিরাট ভরসা করেছেন। আমরা সেই আস্থা রক্ষা করব।”