আমেরিকার মাটিতে ৯/১১ হামলার ২৫ বছর পূর্ণ হল। অথচ, এখনও বিচার শুরু হয়নি হামলার অন্যতম মূলচক্রী বলে অভিযুক্ত খালিদ শেখ মহম্মদের। ২০০৩ সালে পাকিস্তান থেকে গ্রেফতারের পর তাঁকে দীর্ঘ দিন গোপন কারাগারে রাখার অভিযোগ রয়েছে। জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদার অন্যতম নেতা হিসেবে ৯/১১ হামলার পরিকল্পনা ও পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ আমেরিকার। প্রায় তিন বছরের বেশি সময় বিভিন্ন দেশের গুপ্ত জেলে কাটানোর পর ২০০৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর থেকে কিউবার গুয়ানতানামো বে-র মার্কিন সামরিক বন্দিশিবিরে রয়েছেন তিনি।
অ্যাসোসিয়েট প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি এক বিচারক খালিদ-সহ ৯/১১ হামলায় অভিযুক্ত চার জনের সামরিক আদালতে বিচার শুরুর দিন ধার্য করেছেন ২০২৮ সালের ৫ জুন। তবে সেই বিচার আদৌ শুরু হবে কি না তা নিয়েই সংশয় রয়েছে আইনজীবীদের একাংশের। তাঁদের মতে, মার্কিন হেফাজতে খালিদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে তৈরি হওয়া জটিল আইনি প্রশ্নের সমাধান করা অত্যন্ত কঠিন।
২০০৭ সালে এফবিআইকে দেওয়া খালিদের কথিত স্বীকারোক্তিও সম্প্রতি বিচারে ব্যবহার করতে নিষেধ করেছে মার্কিন সামরিক আদালত। বিচারকের মতে, ওই স্বীকারোক্তি নির্যাতনের ফলে প্রভাবিত হয়েছিল। খালিদকে ‘উন্নত জিজ্ঞাসাবাদ কৌশল’-এর (এনহ্যান্সড ইন্টারোগেশন টেকনিক) নামে একাধিক পদ্ধতিতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বলে অভিযোগ। যার মধ্যে কৃত্রিম ভাবে ডুবিয়ে শ্বাসরোধ করার কৌশল ‘ওয়াটারবোর্ডিং’-ও ছিল। মার্কিন সেনেটের একটি রিপোর্টেও সিআইএ হেফাজতে তাঁর উপর দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতনের কথা উঠে এসেছে। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী, তাঁর উপর ১৮৩ বার ওই কৌশল ব্যবহার করা হয়।
আরও পড়ুন:
ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল না-করার সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন সরকার। কারণ, আপিল করলে বিচার আরও পিছিয়ে যেতে পারত।
একসময় খালিদের বিচার নিউ ইয়র্কের অসামরিক আদালতেই করার পরিকল্পনা হয়েছিল। ২০০৯ সালে তৎকালীন মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল এরিক হোল্ডার জানিয়েছিলেন, ম্যানহাটনের আদালতে খালিদ-সহ ৯/১১ হামলায় অভিযুক্ত পাঁচ জনের বিচার হবে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছিলেন, মহম্মদকে “ন্যায়বিচারের কঠিনতম পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে।” এর আগে গুয়ানতানামো বন্দিশালা বন্ধ করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু, বিভিন্ন মহল থেকে নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র আপত্তি ওঠে। শেষপর্যন্ত সেই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়।
পরে সামরিক আদালতে বিচার শুরুর ব্যাপারে পদক্ষেপ করা হলেও বার বার আইনি জটিলতায় তা পিছিয়েছে।
খালিদের আইনজীবী জোশুয়া ড্রাটেলের কথায়, এই মামলা “রাজনীতি এবং নির্যাতনের জন্য দায়বদ্ধতার অভাব”-এ জর্জরিত।
৯/১১ হামলায় স্বামী টমকে হারিয়েছিলেন টেরি স্ট্রাডা। তাঁর কথায়, নিহতদের পরিবারগুলি এখনও বিচারের অপেক্ষায়। তিনি আরও বলেন, ঘটনার ২৫ বছর পরেও ন্যায়বিচার পাওয়া তাঁদের কাছে সমান ভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ‘৯/১১ ফ্যামিলিজ় ইউনাইটেড’-এর চেয়ারপার্সন স্ট্রাডা খালিদের মৃত্যুদণ্ডই চান। এই ব্যাপারে তিনি কোনও সমঝোতা চান না। তাঁর উদ্বেগ, খালিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হলে ভবিষ্যতে দেশের কোনও নেতা হয়তো বিশ্বের অন্য কোথাও বন্দি আমেরিকানের বিনিময়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার প্রলোভনে পড়তে পারেন।
দোষ স্বীকারের বিনিময়ে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে খালিদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার বিষয়ে চুক্তি হওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২৪ সালে। পরে সেটি ভেস্তে যায় এবং গত বছর তা পুরোপুরি বাতিল হয়ে যায়।
তবে বিচার কবে শুরু হবে, তা এখনও অনিশ্চিত। ওয়াশিংটনের আইনজীবী ডেভিড রাসকিন বুধবার ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে বলেছেন, নিউ ইয়র্কে অসামরিক আদালতে বিচার হলে খালিদের শাস্তি হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। অন্যদিকে, সামরিক আদালতের কার্যক্রম আইনি বৈধতা ও পদ্ধতিগত বিষয় নিয়ে ‘অন্তহীন আইনি জটিলতা’-য় জর্জরিত হয়ে পড়ায়, সেটি “বিবাদী পক্ষের আইনজীবীদের কাছে স্বপ্নে পরিণত হয়েছে।” রাসকিনের আশঙ্কা, খালিদ এবং ৯/১১-র অন্য অভিযুক্তদের সামরিক আদালতে বিচার শেষপর্যন্ত কোনও দিনই সম্পূর্ণ হবে না।
নিউ ইয়র্কে অসামরিক আদালতে বিচার হলে, মহম্মদের বিরুদ্ধে সরকারিপক্ষের কৌঁসুলি হতেন রাসকিন।