গত ১৭ এবং ১৮ অক্টোবর আয়ারল্যান্ডের কর্ক শহরে সকল বিধি মেনে অনুষ্ঠিত হল কর্ক সর্বজনীন দুর্গোৎসবের তৃতীয় বর্ষের পুজো। প্রবাসে বাঙালির শিকড়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বার্তাবাহক হয়ে উঠেছিল এই পুজো। বাঙালিদের পাশাপাশি অবাঙালি সম্প্রদায়ের মানুষেরও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই দুর্গোৎসব আক্ষরিক অর্থেই হয়ে উঠেছিল প্রাণবন্ত এক মিলনমেলা।
প্রতি বছরের মতো এ বছরও এই দুর্গোৎসবে সামিল হয়েছিলেন কর্ক-সহ আয়ারল্যান্ডের বিশিষ্টরা। উপস্থিত ছিলেন কর্কের লর্ড মেয়রের প্রতিনিধি কাউন্সিলর কিয়ারা ও’কনর এবং সার্জেন্ট জেমস সুইনি। তাঁদের অংশগ্রহণ প্রবাসী বাঙালিদের সাংস্কৃতিক উদ্যোগকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতার বার্তাও তুলে ধরে।
এ বারের সান্ধ্য-অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল ‘শ্যামরক লোটাস অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান। এই সম্মাননার দ্বিতীয় বর্ষে পুরস্কারে ভূষিত হন ‘দ্য হোপ ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা মৌরিন ফরেস্ট। ১৯৯৯ সালে স্থাপিত এই সংস্থা দীর্ঘ সময় ধরে কলকাতার দুঃস্থ শিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছে| মৌরিনের দীর্ঘদিনের মানবিক অবদানকে স্বীকৃতি জানাতেই তাঁকে এই সম্মান প্রদান করা হয়।
দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, আবেগ ও মিলনের এক বিশেষ উপলক্ষ। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে এই দু’দিনের আয়োজন বহু বাঙালি পরিবারের কাছে পরিচিত মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো এবং নতুন করে শিকড়ের টান অনুভব করার সুযোগ। এ বারও গান, নাচ, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উৎসবের আমেজ আরও জমে ওঠে।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আয়ারল্যান্ডের ইংরেজিভাষী পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুরা পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সুকুমার রায়ের সৃষ্টির সঙ্গে। রবীন্দ্রসঙ্গীত, কবিতা আবৃত্তির পাশাপাশি সুকুমার রায়ের ছড়া ও মজার সাহিত্যকর্ম এখানকার শিশুদের কাছে বাংলা সাহিত্যের জগৎকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। বিদেশের মাটিতে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্মের কাছে এমন উদ্যোগ মাতৃভাষা ও নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
কর্ক সর্বজনীন দুর্গোৎসবে প্রবেশ ও খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। স্থানীয় স্পনসর ও শুভানুধ্যায়ীদের অনুদানেই পুজোর যাবতীয় খরচ বহন করা হয়। পুজোর বিশেষ আকর্ষণ মায়ের ভোগ প্রস্তুতি। বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে সকলে একসঙ্গে ভোগ তৈরিতে অংশ নেন। সবার সম্মিলিত উদ্যোগ উৎসবের আনন্দে এনে দেয় আন্তরিকতা, সহযোগিতা ও মিলনের এক বিশেষ মাত্রা।
তৃতীয় বছরে কর্ক সর্বজনীন দুর্গোৎসবের এই আয়োজন আরও এক বার প্রমাণ করে দিল, প্রবাসে একটি উৎসবকে ঘিরে কীভাবে নানা ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ একত্রিত হতে পারেন। সকলের অংশগ্রহণ, বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতি এবং শিশুদের সাংস্কৃতিক চর্চা মিলিয়ে দুর্গোৎসব হয়ে উঠেছিল মিলন ও সম্প্রীতির এক সুন্দর উদাহরণ।
দেশ থেকে দূরে থেকেও বাংলার উৎসব, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা কর্কের বাঙালি সমাজের কাছে নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। একইসঙ্গে এই আয়োজন বহু সংস্কৃতির মিলমিশে স্থানীয় সমাজের সঙ্গে বন্ধন আরও দৃঢ় করে তোলার একটি সুবর্ণ সুযোগ।
এই প্রতিবেদনটি আনন্দ উৎসব ফিচারের একটি অংশ