নিজের দেশ পোল্যান্ড। ভাষা আলাদা, সংস্কৃতিও। তবু বাংলার টানে কলকাতার সঙ্গে তাঁর আত্মিক যোগ। বিয়ে করেছেন এই শহরেরই ছেলে বীতশোক দে-কে। বাঙালির উৎসব, উৎসবের প্রস্তুতি, মণ্ডপে ঘোরা থেকে জমিয়ে খাওয়াদাওয়া—সবেতেই মন মজেছে পোল্যান্ডের নৃত্যশিল্পী তথা উঠতি অভিনেত্রী গোশা ইয়ারজেবাক দে-র। কলকাতার পুজো যেন তাঁকে আপন করে নিয়েছে। তাই এ বার ভিনদেশে বসে দুর্গাপুজোর মরসুমে শহরকে মিস্ করছেন তিনি। আনন্দবাজার ডট কম-এর কাছে ভাগ করে নিলেন সেই মনখারাপের কথা।
শিল্পী বলেন, “দুর্গাপুজোর আমেজটা বড়ই প্রিয়। প্রতিবছর কলকাতায় এসেছি পুজোর সময়। এই বছর পারলাম না। খুব আফসোস হচ্ছে। আশা করছি আবার সামনের বছর আসতে পারব।”
গোশার কাছে দুর্গাপুজো মানে শুধু কয়েক দিনের উৎসব নয়। বরং পুজোকে ঘিরে প্রস্তুতির দিনগুলিই তাঁর বেশি প্রিয়। তাঁর কথায়, “পুজোর ক’টা দিন সবাই মিলে একসঙ্গে হইহই। প্যান্ডেল হপিং থেকে খাওয়াদাওয়া, সবটাই বেশ উপভোগ করি। এর চেয়ে ভাল সময় আর কী-ই হতে পারে!”
আর বাঙালির উৎসব মানেই যে খাওয়াদাওয়ার বিশেষ আয়োজন, তা বিলক্ষণ বুঝে গিয়েছেন এই পোল্যান্ডের শিল্পী। রসিকতার সুরে তিনি বলেন, “এটা বোধহয় কলকাতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ! গোটা পুজোটাই তো খাওয়াদাওয়াকে ঘিরে।”
আরও পড়ুন:
কলকাতার খাবারের কথা উঠলে কি শুধু রসগোল্লা কিংবা মিষ্টি দইয়ের কথাই মনে পড়ে তাঁর? একেবারেই না। ফোনের ওপার থেকে হেসে গোশা বলেন, “আমি কিন্তু সব কিছু চেখে দেখেছি। আমার সবটাই পছন্দের। এর মধ্যে থেকে সেরাটা বেছে নেওয়া সত্যিই খুব কঠিন।”
তবে পছন্দের তালিকায় বিশেষ জায়গা রয়েছে মাছের ঝোল আর চিংড়ির মালাইকারির। শিল্পীর কথায়, “মাছের ঝোল আর চিংড়ির মালাইকারি আমার দু’টি পছন্দের পদ। প্রতিবার কলকাতায় পা দিলেও প্রথম ফোনটা যায় শাশুড়ি মায়ের কাছে। তিনি রান্না করে রাখেন আমার জন্য।”
অবশ্য রোজের খাবারের তালিকায় তাঁর পছন্দ আরও ছিমছাম। ভুরিভোজের বদলে ডাল, ভাত, আলু সেদ্ধ আর ডিমের কারি দিয়েই দিব্যি দিন কেটে যাবে তাঁর। গোশা বলেন, “ডাল-ভাত আর ডিমের কারি আমি রোজ খেয়ে নেব। আমি কিন্তু এই খাবারগুলি ভাল রাঁধতেও পারি।” কলকাতায় এলে শ্বশুরবাড়িতে শাশুড়ির সঙ্গে রান্নার কাজেও সাহায্য করেন তিনি। বিদেশের মাটিতে থেকেও এ ভাবেই যেন বাংলার ঘরোয়া স্বাদের সঙ্গে জুড়ে রয়েছেন গোশা।
২০২১ সালে কলকাতার ছেলে বীতশোকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তবে কলকাতার সঙ্গে তাঁর পরিচয় এক দিনের নয়। ২০২২ সালে পুজোর সময় স্বামীর সঙ্গে প্রথম এই শহরে আসেন গোশা। যদিও তার আগে থেকেই লন্ডনে দুর্গাপুজো দেখে বড় হয়েছেন তিনি। কিন্তু কলকাতার পুজোর অভিজ্ঞতা যে একেবারেই আলাদা, তা প্রথম বার শহরে এসেই বুঝেছিলেন।
গোশার কথায়, “কলকাতার পুজোর পরিবেশ একেবারেই অন্যরকম। আমার এখনও মনে আছে, প্রথম বার যখন পুজোর সময়ে কলকাতায় আসি, আমার ঘুম ভেঙেছিল ঢাকের আওয়াজে। এত ইতিবাচক আবহ আগে অনুভব করিনি।”
ভাষার বাধা কি কখনও এই শহরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের পথে অন্তরায় হয়েছে? এত বছরে কতটা বাংলা শিখলেন তিনি? গোশার সহজ জবাব, “আমি বাংলা পুরোপুরি শিখে উঠতে না পারলেও আমি এই সংস্কৃতিকে বুঝেছি খুব কাছ থেকে। পুজোর সময় হোক বা অন্য কোনও উৎসব, আমি মানুষজনকে পরখ করি। তাঁদের বোঝার চেষ্টা করি। আমার মনে হয়, ভাষা শেখার থেকেও বেশি প্রয়োজন সেখানকার সংস্কৃতিকে অনুভব করা।”
আরও পড়ুন:
সংস্কৃতির সঙ্গে এই নিবিড় পরিচয়ের পাশাপাশি শিল্পী হিসাবে নিজের যাত্রাও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন গোশা। খুব ছোট থেকেই নাচের সঙ্গে তাঁর সখ্য। বিদেশি নাচের বিভিন্ন ধরনের পাশাপাশি শিখেছেন কত্থকও। এ বার অভিনয়ের জগতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই মুহূর্তে গ্র্যামির লড়াইয়ে রয়েছে তাঁর অভিনীত গানের ভিডিয়ো। ফলে কলকাতার পুজোয় থাকতে না পারার আক্ষেপ থাকলেও, পেশাগত জীবনের নতুন সম্ভাবনা ঘিরে আশাবাদী পোল্যান্ডের এই শিল্পী। বাংলার ভাষা হয়তো এখনও পুরোপুরি আয়ত্তে আসেনি, কিন্তু এই শহরের সংস্কৃতি যে তাঁর মনে পাকাপাকি জায়গা করে নিয়েছে, তা বলাই যায়।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।