ভুত মানে কি শুধুই ভয়, নাকি আরও অন্য কিছু? এক এক জনের উত্তর আসবে এক এক রকম। কেউ বলবেন, ভূতের উপদ্রবে জীবনে ঘটে গিয়েছে মারাত্মক কোনও ঘটনা। আবার কারও দাবি, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় গল্পের মতো ভাল ভূতের দেখা মিলেছে কোথাও। ভূত দেখলে লাভ না লোকসান, সে বলা ভারী মুশকিল। তবে এক বার অন্তত ভূতের দেখা পেতেই হবে, এমন ইচ্ছে পোষণ করা মানুষের সংখ্যাটা কমই বলা চলে। সেই দলেই অবশ্য পড়েন অভিনেত্রী দেবলীনা দত্ত।
অভিনেত্রীর জন্ম এবং বেড়ে ওঠা যে বাড়িতে, তার উঁচু ছাদ, উঁচু উঁচু অন্ধকার সিঁড়ি, লম্বা লম্বা থাম, বিরাট ঠাকুর দালান। এমন বাড়িগুলোতে যখন রাত নামে, অনেকেরই গা ছমছম করে ওঠে। তার সঙ্গে যদি জুড়ে যায় লোডশেডিং, তবে তো কথাই নেই! যেমনটা ভূতের গল্পে হয়!
এ হেন বাড়িতে দেবলীনা ছোটবেলা থেকেই ভূত খুঁজে বেড়াতেন। চেষ্টা করতেন, এক বার অন্তত ভূত বাবাজির দেখা পেতে। অভিনেত্রী জানালেন, রাতে সকলে ঘুমিয়ে পড়লে তিনি ও বাড়ির এক পরিচারিকা অন্ধকারে গোটা বাড়ি ঘুরে বেড়াতেন। বাড়িতে সবচেয়ে ফাঁকা জায়গা ছিল একতলা আর পাঁচ তলার বিশাল ছাদ। সেই ছাদে যেতে হলে তালা খুলতে হত। ছোট্ট দেবলীনার ভয় করত না একটুও। মা যে তাকে ছোটবেলা থেকে শিখিয়েছেন, “ভূত থাকতেও পারে, না-ও পারে। যদি তুমি তাঁদের দেখে ফেল, তবে তুমি জেনে গেলে তাঁরা আছেন। কিন্তু যত ক্ষণ না দেখতে পাচ্ছ, তত ক্ষণ তুমি নিশ্চিত করে বলতে পারো না যে, ভূত নেই। আবার এটাও ধরে নিতে পারো না যে, ভূত মানেই খুব ভয়ঙ্কর বা বীভৎস চেহারার এবং সে সব সময়ে ভয় দেখাবে বা ক্ষতি করবে। এমনও তো হতে পারে, তুমি এমন কোনও ভূত দেখতে পেলে যে তোমাকে খুব হাসাল, তোমাকে সব ব্যাপারে সাহায্য করল, এমনকি তোমার পরীক্ষার খাতায় সব উত্তরগুলো লিখে দিল। তা হলে তো সে ভাল ভূত।”
মায়ের এই কথাগুলো দেবলীনা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। সেই জন্যই ভূত নিয়ে কোনও দিন আলাদা করে ভয় তৈরি হয়নি তাঁর।
তবে ভয় পেতেন তাঁর বাড়ির পরিচারিকা বন্ধুটি। অভিনেত্রী জানালেন, বাড়ির কিছু কিছু জায়গায় গেলে তিনি শুনতে পেতেন অদ্ভুত সব শব্দ। বাড়ির বৈঠকখানা, যেখানকার সমস্ত দেওয়ালে অতীত প্রজন্মের নারী-পুরুষদের বড় বড় সব ছবি ছিল, সেখানেও নাকি কার যেন উপস্থিতি টের পাওয়া যেত।
মজার বিষয় হল, এই ভূতটি ছিলেন দেবলীনা স্বয়ং। বান্ধবীকে ভয় দেখাতে তিনিই বিভিন্ন কারসাজি করতেন। পরিচারিকা বান্ধবীটি সে সবে বিশ্বাসও করতেন। তিনি তো আর জানতেন না, ভূত আসলে সশরীরে তাঁর পাশে পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে!
দেবলীনার ভূতের খোঁজ শুধু তাঁর নিজের বাড়িতেই থেমে থাকেনি। এই উদ্দেশ্যেই ঝাড়গ্রামের এক পোড়ো বাগানবাড়িতে অভিনেত্রী এবং তাঁর তুতো ভাইবোনরা সবাই মিলে রাত কাটিয়েছিলেন এক বার। সে বাড়ির নাকি ভূতুড়ে বলে বদনাম ছিল। বাড়ির বাগানে মাদুর পেতে ভাই-বোন সে রাতে বসে ছিলেন ভূতের অপেক্ষায়। অভিনেত্রীর দাবি, নিরাশ হতে হয়নি। তাঁরা শুনতে পেয়েছিলেন, কারা যেন ফিসফিস করে কথা বলছে। মনে হয়েছিল, কেউ যেন সাদা শাড়ি পরে পাশ দিয়ে দৌড়ে চলে গেল, কানে এসেছিল হঠাৎ কল থেকে বালতিতে জল ভরার শব্দ। এমন আরও কত কী!
কিন্তু ভোর হতেই সব মাটি! অভিনেত্রী জানান, আলো ফুটতে সবাই মিলে চারপাশটা ঘুরে দেখেন তাঁরা। বাড়ির পিছন দিকে গিয়ে দেখেন, সেখানে একটি পরিবার বাস করে। সম্ভবত তাঁদের বাড়িরই আওয়াজে ভয় পেয়েছিলেন সকলে।
তবে কি ভূতের দেখা আর পাওয়া হয়নি তাঁর?
বেশ উত্তেজিত হয়ে অভিনেত্রী জানান, ছোটবেলায় নৈনিতাল বেড়াতে গিয়ে যে হোটেলে ছিলেন, পরবর্তীতে ফের নৈনিতালে গিয়ে একই জায়গায় থাকার জেদ ধরেছিলেন তিনি। সে বাড়ি তখন সারানো হচ্ছে। সকলে বারণ করা সত্ত্বেও দেবলীনা সেখানেই রাত কাটাবেন বলে ঠিক করেন। হোটেল কর্তৃপক্ষও বাধ্য হন থাকতে দিতে। রাতে আচমকা লোডশেডিং। সে দিনই বাজার থেকে অনেক রকম মোমবাতি কিনে এনেছিলেন দেবলীনা। সারা ঘর সুন্দর করে সাজিয়েও ছিলেন। কিন্তু মোমবাতি যে কিছুতেই জ্বলে না! এক বার, দু’বার, তিন বার...দশ বারো বার চেষ্টা করলেন। প্রতি বারই নিভে যাচ্ছে। ঠিক যেন কেউ ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিচ্ছে! এ দিকে, ঘরে কোনও জানলা দরজা খোলা নেই। কোথাও থেকে এক ফোঁটা হাওয়া ঢুকছে না। ঠান্ডা ছিল বলে ফ্যানও বন্ধ। কিন্তু মোমবাতি কিছুতেই জ্বালানো গেল না। এই ঘটনার আজও কোনও ব্যাখ্যা নেই দেবলীনার কাছে।
অভিনেত্রী বলেন, “যদি সেখানে কোনও ভূত থেকে থাকে, তা হলে তার হয়তো অন্ধকার পছন্দ ছিল।" তবে আর কোনও রকম ক্ষতি বা ভয় দেখানোর ঘটনা ঘটেনি। দেবলীনার কথায়, সে ছিল ভাল ভূত!
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।