Health Partner
Comfort Partner
Knowledge Partner

উত্তম ঠিক ফিরবেন, ভিজে কাপড়ে নির্জলা উপোস সুপ্রিয়ার! মহানায়কের দ্বিতীয় সংসারের কোজাগরী রাত যেন এক না-বলা ট্র্যাজেডি

উত্তমকুমারের লক্ষ্মীপুজো মানেই আজ ভবানীপুরে গিরিশ মুখার্জি রোডের বাড়ির পুজো হলেও, উত্তম-সুপ্রিয়ার ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতেও হত কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো। মহানায়কের শতবর্ষে আনন্দ উৎসবে ফিরে দেখা যাক উত্তম-সুপ্রিয়ার হারিয়ে যাওয়া লক্ষ্মীপুজোর ইতিহাস।

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:১৭
মহানায়কের দুই সংসারের কোজাগরী রাত যেন এক না-বলা ট্র্যাজেডি

মহানায়কের দুই সংসারের কোজাগরী রাত যেন এক না-বলা ট্র্যাজেডি

‘‘সে ছিল লক্ষ্মীমন্ত পুরুষ, তাঁকে ছাড়া কি লক্ষ্মীপুজো হয়? কার জন্য পুজো করব?ʼʼ জীবনের শেষ দিনগুলিতে ৩২ নং বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের সরকারি আবাসনে একতলার ফ্ল্যাটে বসে এমন কথাই বলতেন ‘মেঘে ঢাকা তারাʼর ‘নীতা’ সুপ্রিয়া দেবী। তাঁর সেই লক্ষ্মীমন্ত পুরুষটির নাম মহানায়ক উত্তমকুমার।

উত্তমকুমারের লক্ষ্মীপুজো মানেই আজ ভবানীপুরে গিরিশ মুখার্জি রোডের বাড়ির পুজো হলেও, উত্তম-সুপ্রিয়ার ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতেও হত কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো। মহানায়কের শতবর্ষে আনন্দ উৎসবে ফিরে দেখা যাক উত্তম-সুপ্রিয়ার হারিয়ে যাওয়া লক্ষ্মীপুজোর ইতিহাস।

প্রথমেই প্রশ্ন উঠবে, উত্তমকুমার কেন দু’টি লক্ষ্মী পুজো করতেন? উত্তমকুমারের দু’টি সংসার, তাই দুটি লক্ষ্মী পুজো। বড় গিন্নি গৌরী দেবী আর ছোট গিন্নি সুপ্রিয়া দেবী— দু'জনেরই সব আবদার রাখতেন স্বামী উত্তমকুমার। এ বারেও প্রশ্ন উঠবে সত্যি কি সুপ্রিয়া উত্তমের স্ত্রী? উত্তরটা হ্যাঁ। কারণ উত্তমকুমার নিজেই এই মান্যতা দিয়েছিলেন। প্রথমা স্ত্রী বিবাহ-বিচ্ছেদ না করলে দ্বিতীয়া স্ত্রী আইনি বৈধতা পান না। সুপ্রিয়াও পাননি। কিন্তু ১৯৬৩ সালের পৌষ মাসে উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবীর বিয়ে হয়। এখনকার যুগে লিভ-ইন ঘরে ঘরে হচ্ছে, কিন্তু ছয়ের দশকে বাঙালি সমাজে তা এতটাও সহজ ছিল না। পৌষ মাসে কিন্তু সাধারণত বাঙালির বিয়ে হয় না, ওঁদের হয়েছিল। সুপ্রিয়ার বাবা গোপালচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, “এ ভাবে বিয়ে না করে একসঙ্গে থাকা যাবে না। তোমরা বিয়ে করো। আগেও তো কৌলিন্য প্রথায় দুই স্ত্রী থাকতে পারতেন, তাতে প্রথম জনকে ডির্ভোস দেওয়ার দরকার নেই।”

তা-ই হল। শালগ্রাম শিলার সামনে উত্তম কুমার সিঁদুর পরিয়ে দেন সুপ্রিয়া দেবীকে। মালাবদল করে বৈদিক মতে বিয়ে হয় ওঁদের। আর এই বিয়ের পরের বছর, ১৯৬৪ সাল থেকেই ময়রা স্ট্রিটে উত্তম-সুপ্রিয়ার যৌথ সংসারে শুরু হল কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো।

সুপ্রিয়া কাঠ বাঙাল আর উত্তম পাড় ঘটি। বাঙালদের লক্ষ্মীপুজোয় মৃন্ময়ী মূর্তি আসে না। মাটির সরায় আঁকা দেবীলক্ষ্মী, সঙ্গে পেঁচা, ধানের শীষ, কলাগাছ, কলার ভেলা আর চির-এয়োস্ত্রীর শুভ প্রতীক হিসেবে মাছ ভোগ হয় পুজোয়। সুপ্রিয়া আগে এ ভাবে লক্ষ্মী পুজো করতেন। কিন্তু কাঠ বাঙাল সুপ্রিয়া দেবীর লক্ষ্মীপুজোও ১৯৬৩ সালের পর থেকে খাস ঘটি হয়ে গেল। সুপ্রিয়া বলেছিলেন, ‘‘স্বামীর বাড়ির নিয়মেই আমাদের যৌথ পুজো হবে।ʼʼ তাই সরার বদলে এলেন সালঙ্করা বড় প্রতিমা, আমিষের ‘আʼ পর্যন্ত ধুয়েমুছে সাফ করে সব নিরামিষ ভোগ রাঁধতেন সুপ্রিয়া।

দুই বাড়িকেই, দুই গিন্নিকেই সমান সম্মান দিয়েছিলেন উত্তমকুমার। ১৯৬৩-র পর থেকে ভবানীপুরের পৈতৃক ভিটেতে তিনি আর না থাকলেও, রোজ সকালবেলা মাকে প্রণাম করে ও বড় গিন্নি গৌরী দেবীর সঙ্গে দেখা করে তবেই যেতেন শ্যুটিংয়ে।

লক্ষ্মীপুজোর আগের দিন থেকেই নিরামিষ খেতেন উত্তম-সুপ্রিয়া দুʼজনেই। লক্ষ্মীপুজোর কাকভোরে দুʼজনেই বড় গঙ্গায় গিয়ে স্নান সেরে ভিজে শুচিশুদ্ধ বস্ত্রে ঘড়া ভরে গঙ্গাজল নিয়ে আসতেন। ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে গঙ্গাজলের ঘট স্থাপন করে শুকনো শুদ্ধ কাপড় পরতেন উত্তমকুমার। সুপ্রিয়া দেবী ওই ভিজে কাপড়ে নির্জলা উপোস করে ভোগের প্রতিটা পদ নিজে হাতে রাঁধতেন সারা দিন ধরে। সকালে উত্তমকুমার দুধ-খই খেয়ে চলে যেতেন ভবানীপুরের পৈতৃক ভিটের লক্ষ্মীপুজোয়। সেখানে ছোট ভাই তরুণ কুমার সবটা ব্যবস্থা করতেন। সেই পুজো সাঙ্গ করে সুপ্রিয়ার পুজোয় ফিরতে ফিরতে উত্তমের রাত হয়ে যেত। যত ক্ষণ না তিনি ফিরছেন, তত ক্ষণ ওই ভিজে কাপড় গায়ে এক ফোঁটাও জল না খেয়ে স্বামীর জন্যে অপেক্ষা করতেন বাংলা ছবির নায়িকা সুপ্রিয়া দেবী।

জলে ভেজা নতুন কাপড় কখন গায়েই শুকিয়ে যেত বেণুর। যে সুপ্রিয়াকে সমাজ দেবীর সম্মান দেয়নি কখনও। তাঁর তকমা জুটেছে ‘সহবাসিনীʼ। সমাজ যতই সুপ্রিয়ার প্রতি হিংস্র হোক, তিনি নিজে এ সব গায়ে মাখেননি। ভবানীপুরের বাড়ির লক্ষ্মী প্রতিমার মুখ গৌরী দেবীর আদলে করতেন উত্তম কুমার। তা হলে কি ময়রা স্ট্রিটের প্রতিমার মুখ সুপ্রিয়া মুখশ্রীর হত? না, একদমই নয়। সুপ্রিয়া এ সব কোনও দিন চাননি।

ময়রা স্ট্রিটে ফিরেই গরদ পরে, তসরের চাদর গায়ে উত্তম কুমার বসতেন ষোড়শোপচারে পুজোয়। তত ক্ষণে সন্ধে গড়াতে দ্বিতীয় শুচিস্নানে সকালের কাপড় ছেড়ে বসনে-ভূষণে-আভরণে সেজে উত্তমের বামে বসতেন সুপ্রিয়া। পুজো সেরে চরণামৃত প্রথম খেতেন উত্তমকুমার। আর সব শেষে খেতেন সুপ্রিয়া। পতিব্রতা স্ত্রী হওয়ার প্রতিযোগিতায় দৌড়তে গিয়ে সুপ্রিয়া নিজেকে, নিজের একমাত্র মেয়েকে অবহেলা করে ফেলেছেন অজান্তেই। সুপ্রিয়া কন্যা সোমা বেশিরভাগ সময়ে বোর্ডিংয়ে থাকায় খুব কমই দেখেছেন এই লক্ষ্মীপুজো। কোজাগরীর অর্থ 'কে জেগে আছো'-র মতোই উত্তমের সেবায় রাতের পর রাত জেগেছেন সুপ্রিয়া।

কোজাগরী রাতের চুনোট করা ধুতি আর গিলে পাঞ্জাবিতে দেখা মিলত মহানায়কের। সুপ্রিয়া সাজতেন রাজেন্দ্রাণীর মতো সালঙ্কারা রূপে। সুপ্রিয়া এক এক বার এক এক রকম সাজতেন। স্লিভলেস ব্লাউজের সঙ্গে ঢাকাই পরতেন। হংসীগ্রীবা গলায় মুক্তোর চোকার পরতেন। নাকে হীরের জ্বলজ্বলে নাকছাবি, কখনও বা বড় নথ। তবে কিছু ক্ষণ পর দামি শাড়ির আঁচল গাছকোমর করে বেঁধে একাই দশভূজার মতো ভোগ পরিবেশন করতেন সুপ্রিয়া। তারকাখচিত ছিল সে সব পুজোর রাত। শেষের আর্কষণ থাকত জলসা। নামীদামি শিল্পীরা গান গাইতেন ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে। কখন যে কোজাগরীর রাত ভোর হয়ে যেত, টের পাওয়া যেত না।

কিন্তু উত্তম সাম্রাজ্য শেষ হতেই এই পুজোও শেষ হয়ে গেল। ১৯৭৯ সালে ময়রা স্ট্রিটে উত্তম সুপ্রিয়ার সংসারে শেষ বার লক্ষ্মী পুজো হয়। ২৪ জুলাই ১৯৮০ উত্তম কুমারের অকাল প্রয়াণ, যা মেনে নিতে পারেনি সারা বাংলা। সুপ্রিয়াও পারেননি উত্তমকে ছাড়া এই পুজোর আয়োজন করতে। কোথাও গিয়ে দুই সংসারের চাপে উত্তম হয়ে পড়েছিলেন একা।

বহু বিবাদ, আইনি লড়াইয়ের পরে শেষমেশ অত বড় বাড়িতে একা থাকতে না পেরে লাউডন স্ট্রিটে উঠে আসেন সুপ্রিয়া দেবী। যদিও সবক’টিই ছিল ভাড়া বাড়ি। ময়রা স্ট্রিটে থাকা উত্তমের সব পোশাক সুপ্রিয়া দিয়ে দেন উত্তম-পুত্র গৌতমকে। মহানায়কের ভরত পুরস্কারও ভবানীপুরের বাড়িতে দিয়ে দেন সুপ্রিয়া। ময়রা স্ট্রিটের ওই বিলিতি বাড়ি পরে কিনে নেন এক ব্যবসায়ী। হাত বদলের পরে এখন সেখানে অভিজাত হোটেল 'পাতোদিয়া হাউসʼ। নেই উত্তম-সুপ্রিয়ার এতটুকু চিহ্ন। তবু ওই মাটিতে রয়ে গিয়েছে উত্তম-সুপ্রিয়ার প্রেমের তীর্থের শেষ মাটি।

"এইখানে এসে বহুদিন পরে এই শিলালিপি কেউ যদি পড়ে...

সমবেদনার একটু অশ্রু তার দুটি চোখ ঢাকো...

সাক্ষী থাকুক ঝরা পাতা, আকাশ বাতাস সাক্ষী থাকুক, সাক্ষী থাকুক বনলতা...।ʼ

এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।

Uttam Kumar

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy