Health Partner
Comfort Partner
Knowledge Partner

বহু ঘূর্ণিঝড় পেরিয়ে আজও অক্ষত কালীঘাট ‘ষষ্ঠীতলাʼর আদিবৃক্ষ, পুজোর যাবতীয় ভার সামলান মেয়েরাই

এই মন্দির চত্বরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও এক প্রাচীন লোকবিশ্বাসের কাহিনি। মন্দিরের পিছনেই রয়েছে ‘ষষ্ঠীতলাʼ— সন্তান কামনায় নারীদের প্রার্থনা, মানত এবং মাতৃত্বের আশায় গড়ে ওঠা এক বিশেষ স্থান। ভক্তদের বিশ্বাস, এই ষষ্ঠীতলায় গাছের ডালে সুতো, কাপড়ের টুকরো কিংবা ইটের ছোট ছোট খণ্ড বেঁধে মনস্কামনা পূরণ হয়। কেউ চান সন্তানের সুস্থতা, কেউ বা মঙ্গল ও দীর্ঘায়ু।

আনন্দ উৎসব ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ১২:০৩
পেরিয়ে আজও অক্ষত কালীঘাট ‘ষষ্ঠীতলাʼর আদিবৃক্ষ

পেরিয়ে আজও অক্ষত কালীঘাট ‘ষষ্ঠীতলাʼর আদিবৃক্ষ

কলকাতার কালীঘাট মানেই মহাশক্তি দেবী কালীর মন্দির, সতীপীঠের মাহাত্ম্য আর অগণিত ভক্তের ভিড়। কিন্তু এই মন্দির চত্বরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও এক প্রাচীন লোকবিশ্বাসের কাহিনি। মন্দিরের পিছনেই রয়েছে ‘ষষ্ঠীতলাʼ— সন্তান কামনায় নারীদের প্রার্থনা, মানত এবং মাতৃত্বের আশায় গড়ে ওঠা এক বিশেষ স্থান। ভক্তদের বিশ্বাস, এই ষষ্ঠীতলায় গাছের ডালে সুতো, কাপড়ের টুকরো কিংবা ইটের ছোট ছোট খণ্ড বেঁধে মনস্কামনা পূরণ হয়। কেউ চান সন্তানের সুস্থতা, কেউ বা মঙ্গল ও দীর্ঘায়ু।

বাংলার লোকবিশ্বাসে দেবী ষষ্ঠী সন্তানধারণ, প্রসব এবং নবজাতকের রক্ষাকর্ত্রী। বিড়াল দেবীর বাহন। বিড়ালকে অবহেলা বা অত্যাচার করলে দেবী অসন্তুষ্ট হন—এমন বিশ্বাসও লোকসমাজে প্রচলিত। বাংলায় বছরের বিভিন্ন সময়ে নানা নামে ষষ্ঠী ব্রত পালিত হয়। অরণ্য ষষ্ঠী বা জামাই ষষ্ঠী, লুণ্ঠন ষষ্ঠী, চাপড়া ষষ্ঠী, অশোক ষষ্ঠী, দুর্গা ষষ্ঠী, শীতল ষষ্ঠী প্রভৃতি।

সন্তানের জন্মের পর ষষ্ঠীপুজো করা, শিশুর মঙ্গল কামনা করা কিংবা সন্তানলাভের আশায় মানত করার মতো নানা প্রথা দীর্ঘকাল ধরে বাংলার পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের অংশ। এই উপাসনার ক্ষেত্রে দেবীমূর্তি থাকতেই হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। কোথাও পাথর, কোথাও গাছের ডাল, আবার কোথাও গাছের তলায় সামান্য বেদি— এ সবের মধ্য দিয়েও দেবীর উপস্থিতি কল্পনা করা হয়।

কালীঘাট মন্দির প্রাঙ্গণের উত্তর-পূর্ব কোণে, একটি বিশাল ও প্রাচীন পবিত্র বটগাছের নীচে ‘ষষ্ঠীতলাʼ । ভক্তেরা বলেন, কালীঘাটের মূল গর্ভগৃহের বাইরে যে কয়েকটি অত্যন্ত জাগ্রত এবং অলৌকিক স্থান রয়েছে, তার মধ্যে ষষ্ঠীতলাই প্রধান। যার পাশেই রয়েছে মহাদেবের মন্দির।

প্রকৃতির ষষ্ঠ অংশ থেকে উৎপন্ন এক আদি শক্তি, তাই দেবীর নাম ষষ্ঠী। শোনা যায়, প্রাচীনকালে কালীঘাট মন্দির সুন্দরবনের অংশ ছিল। তখন এই বটগাছের নীচে একদল আদিম তান্ত্রিক এবং কাপালিকেরা প্রকৃতির আদি জননী শক্তির আরাধনা করতেন। পরবর্তীতে এই স্থানটি গৃহস্থ নারীদের কাছে এক পরম আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়।

আবার ঔপনিবেশিক আমলে বাংলার নারীদের ধর্মাচার নিয়ে লেখা ‘উইমেন অফ বেঙ্গলʼ বইতে কালীঘাটের এমন একটি গাছের কথা বলা হয়েছে, যেখানে সন্তান কামনায় নারীরা নিজেদের চুল দিয়ে কিংবা অন্য কিছুতে বাঁধা ইটের টুকরো ঝুলিয়ে রাখতেন। সন্তানলাভের আশায় তাঁরা মানত করতেন, আর প্রার্থনা পূর্ণ হলে সেই মানত পালন করার প্রতিশ্রুতি দিতেন।

লোকবিশ্বাসে গাছ দীর্ঘ জীবন, বৃদ্ধি, উর্বরতা ও জীবনের ধারাবাহিকতার প্রতীক। তাই গাছকে ঘিরে মানত করার রীতি বাংলার নানা লোকাচারে দেখা যায়। কালীঘাটের ষষ্ঠীতলার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, এখানে দেবী ষষ্ঠীর পাশাপাশি আরও দুই দেবী শীতলা ও মনসার পুজো করা হয়। তাই মন্দিরে রয়েছে ফণীমনসা গাছও। বছরে ষষ্ঠীর দিনগুলি ছাড়াও মনসা পুজো ও শীতলা পুজোর দিনেও এই মন্দিরে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। দেবী মঙ্গলচণ্ডীও অধিষ্ঠান করেন এই শিলাতে।

প্রচলিত বিশ্বাসে ষষ্ঠীতলার এই গাছটি নিয়ে অনেক অলৌকিক রহস্যকাহিনি রয়েছে। গাছটির বয়স কয়েকশো বছর। কালীঘাট অঞ্চলে এই পুরো সময়কালে বহু বার শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, কালবৈশাখীর তাণ্ডব এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটেছে, যা অনেক আধুনিক ঘরবাড়ি ও গাছপালাকে উপড়ে ফেলেছে। কিন্তু এই আদি বৃক্ষটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একই ভাবে অক্ষত হয়ে দাঁড়িয়ে। তান্ত্রিকদের মতে, স্বয়ং আদি শক্তি এই বৃক্ষের শিকড়ে অবস্থান করেন। তাই এই ষষ্ঠী বৃক্ষকে টলানো অসাধ্য।

আরও একটি বৈশিষ্ট্য হল, কালীঘাটের ষষ্ঠীতলা মন্দিরে সব পুজো থেকে পরিচর্যা করে থাকেন নারীরাই। মেয়েদের দায়িত্বেই রোজ মন্দিরে মাতৃ আরাধনা হয়। এই মন্দিরে শুধুমাত্র নারীরাই পুরোহিত। দেবীকে অন্নভোগ দেওয়ার রীতি সে অর্থে নেই। আদি অনন্তকাল ধরে যাঁরা কালীঘাটে আসেন, ষষ্ঠীতলা দর্শন না করলে নাকি তাঁদের দেবী দর্শন সম্পূর্ণ হয় না।

এই প্রতিবেদনটি 'আনন্দ উৎসব' ফিচারের একটি অংশ।

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy