Health Partner
Comfort Partner
Knowledge Partner

‘অরণ্যের দিনরাত্রি’তে মিশেছিল ‘কোয়েলের কাছে’র কুয়াশামাখা পাইন বন, পুজোয় দেখে আসবেন নাকি সেই কেচকি-নেতারহাট?

হাওড়া থেকে বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে প্রথমে রাঁচি। স্টেশন থেকে বেরিয়ে আগেই বুক করে রাখা এসইউভি নিয়ে সদলবলে রওনা দিয়েছিলাম পালামৌ-এর পথে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শহরকে পিছনে ফেলে আমাদের গাড়ি ঝাঁপিয়ে পড়ল হাইওয়েতে। নিমেষের মধ্যে চারপাশের শহুরে পটভূমি বেমালুম গায়েব! সে জায়গা নিল ছোটনাগপুরের পাহাড়-জঙ্গল মেশা মালভূমি, যার মাঝে মাঝে জটলা করে ঝিরঝিরিয়ে কথা বলছে শাল, মহুয়া আর পলাশের দল।

বিশ্বজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:১৫
হারিয়ে যান ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলে

হারিয়ে যান ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলে

পুজোর শোরগোল, হইচই আর হাঁকডাক সব না হয় শহরেই জমা থাক। এ বার পুজোয় ব্যাগ গুছিয়ে ঋজুদার সঙ্গে জঙ্গলের দিকে যাবেন নাকি এক বার? ঠিক যেমনটা আমরা করেছিলাম কিছুদিন আগে। বলার অপেক্ষা রাখে না, আমাদের গন্তব্য ছিল মহুয়ার গন্ধে মাতানো শাল পিয়ালের খয়েরি-সবুজ চাঁদোয়ায় ঘেরা পালামৌ-এর জঙ্গল।

হাওড়া থেকে বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে প্রথমে রাঁচি। স্টেশন থেকে বেরিয়ে আগেই বুক করে রাখা এসইউভি নিয়ে সদলবলে রওনা দিয়েছিলাম পালামৌ-এর পথে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শহরকে পিছনে ফেলে আমাদের গাড়ি ঝাঁপিয়ে পড়ল হাইওয়েতে। নিমেষের মধ্যে চারপাশের শহুরে পটভূমি বেমালুম গায়েব! সে জায়গা নিল ছোটনাগপুরের পাহাড়-জঙ্গল মেশা মালভূমি, যার মাঝে মাঝে জটলা করে ঝিরঝিরিয়ে কথা বলছে শাল, মহুয়া আর পলাশের দল।

সে বার প্ল্যান করেছিলাম, পালামৌ অভিযান দু’দিনে শেষ করে আমরা চলে যাব নেতারহাট। উদ্দেশ্য, নেহাতই আলসেমি আর আড্ডায় আরও দুটো দিন কাটানো।

তবে প্রথম দুটো দিনের জন্য বাঙালির গর্বের স্মৃতি মাখা এমন এক জায়গা বেছে নিয়েছিলাম যে, শুনলে নির্ঘাত আপনিও সেখানেই ছুটে যাবেন!

কেচকি ফরেস্ট রেস্ট হাউস। ঠিকানা— কেচকি সঙ্গম। যেখানে সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ছবির শুটিং করেছিলেন। জায়গাটা পালামৌ টাইগার রিজার্ভের একেবারে গা ঘেঁষে বিছিয়ে থাকা নীলাভ ধূসর পাহাড়ে বাঁধানো একটা বালির চরের উপরে। যার বুক চিরে বয়ে যাওয়া কোয়েল নদীর সঙ্গে মিশেছে সমকোণে এগিয়ে আসা ঔরঙ্গা নদী। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসে ঠিক যেমনটি বর্ণনা দিয়েছেন, সত্যজিৎ রায় যেমনটি শুট করেছেন, জায়গাটা আজও অবিকল সেই রকমই আছে।

রাতের খাওয়া সেরে এই গা ছমছমে বন্য বালুচরে হাঁটতে হাঁটতে আমরা বেশ খানিকটা দূরেই চলে গিয়েছিলাম। সম্বিৎ ফিরে পেলাম বেতলা টাইগার রিজার্ভ থেকে ভেসে আসা কোনও বন্য জন্তুর চিৎকারে। নদীর ওপারে শ্মশানের দিকে চোখ পড়তেই দেখলাম একটা চিতা জ্বলে উঠেছে। তার লকলকে আগুনের শিখার ইশারাতেই হয়তো একসঙ্গে ডেকে উঠল এক পাল শেয়াল। আমরা হনহন করে হাঁটা লাগালাম রেস্ট হাউসের দিকে। এমন সময়ে মনে হল একটা ধাতব গোঙানির শব্দ যেন ধীরে ধীরে আমাদের দিকেই ধেয়ে আসছে। ক্রমশ সেটা একটা বিকট গর্জনের আকার ধারণ করে আছড়ে পড়ল চুপিসারে দাঁড়িয়ে থাকা রেল ব্রিজটার উপরে। আড়চোখো চাঁদের মিটমিটে আলোয় যে ব্রিজটাকে আমরা এতক্ষণ খেয়ালই করিনি! মনে হল অ্যালিসের আজব দুনিয়া থেকে টিমটিমে লন্ঠন হাতে ইয়া মোটা একটা ইস্পাতের শুঁয়োপোকা যেন নিজের শরীরটা টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে ব্রিজেরই অপর দিকে। রাত বারোটার মালগাড়ি ব্রিজ পেরোনোর আগেই আমরা সে দিন রেস্ট হাউসে ফিরে এসেছিলাম। হলফ করে বলতে পারি, সে রাতের অভিজ্ঞতা ছিল এক্কেবারে প্রাইসলেস যাকে বলে! যা কিন্তু আপনিও সেখানে গিয়ে অনুভব করতে পারেন।

পরদিন বেতলা ন্যাশনাল পার্কে আমাদের সকাল এবং সন্ধ্যা মিলিয়ে একজোড়া সাফারি বুক করা ছিল। পারলে আপনিও দুটোই করবেন। জঙ্গলের সৌন্দর্য দু’বেলায় কিন্তু দু’রকম। আমরা হাতি আর বাঁদর ছাড়াও নীলগাই, বাইসন, নানা প্রজাতির হরিণ এবং অনেক ময়ূর দেখতে পেয়েছি। বনলক্ষ্মী সদয় হলে বাঘ আর চিতাবাঘও কপালে জুটে যেতে পারে! আমাদের যদিও জোটেনি!

দুই সাফারির মধ্যেকার সময়টা কাটিয়েছিলাম আশপাশের দ্রষ্টব্যগুলো দেখে। প্রথম গন্তব্য পালামৌ ফোর্ট। ষোলোশো শতকে চেরো রাজবংশের তৈরি এই দুর্গ অতীতে মুঘল আক্রমণ আর সিপাহী বিদ্রোহের সময়ে প্ৰতিরোধ গড়ে তোলায় ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল। সেই কেল্লা আজও ঘন জঙ্গলের মধ্যে এক রহস্যময় ঐতিহাসিক ক্যানভাস হয়ে টিকে আছে। কেল্লার ভিতরের জংলা চত্বরে সেকালের দুটো গভীর কুয়ো দেখতে ভুলবেন না যেন! তার পাঁচিলের গায়ে সময়ের পলিতে গেঁথে বট-অশ্বত্থের শিকড়। নীচের দিকে তাকালে মাথা ঘুরে যেতেই পারে খানিক!

কেল্লাকে বাঁ হাতে রেখে জঙ্গলের পথ ধরে বেশ খানিকটা ভিতরে ঢুকলাম কমলদহ ঝিল দেখতে। চার পাশের প্রাচীন শালবন আর ঘন বাঁশঝাড়ের মধ্যে লাল আর শ্বেতপদ্ম আঁকা বিশাল একটা কাচের টুকরোর মতোই যেন পড়ে রয়েছে কমলদহ—এক কালে যা ছিল চেরো রাজবংশের রানী আর রাজকন্যাদের স্নানের জলাশয়। যার নিস্তব্ধতা ভেঙে এখন শুধু বন্য পরিযায়ী পাখিদের ডাক আর তৃষ্ণার্ত হাতির দলের জল খাওয়ার শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়।

রাতে রেস্ট হাউসে ফিরে স্থানীয় কড়কনাথ মুরগির মাংসের লালচে তেল ঝোল আর গরম ভাত আর জমাটি আড্ডা পেরিয়ে আরামের ঘুম। পরদিন গন্তব্য নেতারহাট। লাতেহারের সীমানা ছুঁয়ে, পাইন আর শালের বুনোট দিয়ে মোড়ানো পাহাড়ি রাস্তায় মেঘ-কুয়াশার সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে সন্ধের মুখে আমরা গিয়ে পৌঁছলাম বন দফতরেরই রেস্ট হাউসে। রোদ-ছায়া মাখা পাহাড়, ঝরনা আর উপত্যকায় অলস ভাবে ঘুরে বেড়িয়ে দিনটা দেখতে দেখতে কেটে গেল। রেস্ট হাউসের কাছেই খাদের কিনারায় সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহর স্মৃতিবিজড়িত নেতারহাট ডাকবাংলো। সেখানে খাদের নীচে তাকালেই দেখতে পাবেন এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে কোয়েল নদী। 'কোয়েলের কাছে' থেকে ঋজুদার অভিযান - বুদ্ধদেবের উপন্যাসের অনেক চরিত্রই এই বাংলোয় কোনও না কোনও সময়ে আস্তানা গেড়েছে।

পরদিন নেতারহাটকে বিদায় জানিয়ে গাড়ি ছুটল রাঁচি স্টেশনের দিকে। আমাদের মাথার ভিতর, মনের গভীরে, ব্যাগে-বুকপকেটে বোঝাই হয়ে কলকাতা ফিরল রোমাঞ্চ-রূপকথা-ইতিহাসে ভরা চার-চারটে দিন। হাতে সময় থাকলে একবার স্টেশনের কিছুটা আগের মিষ্টির দোকানগুলোয় ঢুঁ মারতে পারেন। এখানকার মিল্ক কেক কিন্তু জটায়ুর ভাষায় যাকে বলে 'থ্রিলিং ব্যাপার'!

এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy