লাল মাটির সোঁদা গন্ধ, শাল-পিয়ালের বন আর সুবর্ণরেখার তিরতিরে জলধারা। সঙ্গে পাঁচশো বছরের পুরনো মল রাজা বধের জীবন্ত ইতিহাস। এই পুজোয় নিরিবিলি অবসরের ঠিকানা হোক জঙ্গলমহলের‘বাবুরভানি’। এখানে কাল পাতলে শোনা যায় পাতার মর্মরধ্বনি। শোনা যায় পাখির কলতান। তবে শুধু নৈসর্গিক সৌন্দর্যই নয় বাবুরভানিকে ঘিরে আছে মল রাজার এক অজানা ইতিহাস। পুজোর কোলাহল যদি পছন্দ না হয় দু'দিনের ছুটিতে ঘুরেই আসুন না বাড়ির কাছের এই জায়গায়।
২০১৭ সাল থেকে পর্যটন মানচিত্রে ঝাড়গ্রাম এখন অন্যতম জনপ্রিয় নাম। কিন্তু বেলপাহাড়ি, চিল্কিগড় বা ঝাড়গ্রাম শহরের পরিচিত ভিড় এড়িয়ে যাঁরা প্রকৃতির খাঁটি নির্জনতা ভালবাসেন, তাঁদের জন্য এক মায়াবী জনপদ এই বাবুরভানি। যেখানে কৃত্রিমতা নেই। কান পাতালে মাঝেমধ্যেই ভেসে আসে 'দলমার দামাল'-এর গগনভেদী গর্জন।
কীভাবে যাবেন ?
কলকাতা থেকে এই জায়গার দূরত্ব আনুমানিক ১৬৫ কিলোমিটার। কলকাতা থেকে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে কিংবা ট্রেনে করে ঝাড়গ্রাম স্টেশনে নেমে একটি গাড়ি বা অটো নিয়ে চলে যেতে পারেন বাবুরভানি। সময় লাগবে ঘণ্টা চারেক। পৌঁছানো খুব কঠিন নয়, সহজেই পৌঁছে যাবেন এই জায়গায়।
থাকা-খাওয়া
জঙ্গলমহল পর্যটকদের জন্য এখন অত্যন্ত সুরক্ষিত ও পর্যটনবান্ধব। বাবুরভানি ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি হয়েছে বেশ কিছু পরিবেশবান্ধব ইকো-রিসর্ট, মাটির কটেজ ও গ্রামীণ হোমস্টে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বজায় রেখেও সেখানে মেলে শিকড়ের ছোঁয়া। গ্রামীণ ও শান্ত পরিবেশে থাকার পাশাপাশি এখানে স্থানীয় বাঙালি খাবার এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার খেতে পারবেন। শালপাতার থালায় ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সঙ্গে দেশি মুরগির লাল ঝোল, কচি পাঁঠার মাংস, ডাল আর মুচমুচে ঝুড়ি আলুভাজা। জঙ্গলমহলের বিশেষ পদ হিসেবে মিলতে পারে বাঁশের কোঁড়লের তরকারি কিংবা স্থানীয় পদ্ধতিতে রান্না করা লাল পিঁপড়ের ডিমের চাটনি।
কী কী দেখবেন?
বাবুরভানি এবং এর আশেপাশের অঞ্চল মূলত শাল, পিয়াল ও মহুল গাছে ঘেরা গভীর জঙ্গল এবং সুবর্ণরেখা নদী বেষ্টিত এই অঞ্চলটি আদিবাসী সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ঢিল ছোড়া দূরত্বে সুবর্ণরেখা নদী এবং ওপারেই ওড়িশা সীমান্ত। নদীর লাগোয়া ঘন হাতিবাড়ি জঙ্গল। দলমা ও ময়ূরভঞ্জের করিডর ধরে এই পথেই বুনো হাতির দল সুবর্ণরেখা পার হয়। ভাগ্য সহায় থাকলে নদীর চরে দাঁড়িয়ে দূর থেকে হাতির পালেরও দেখা মিলবে। ডুলুং নদীর তীরে গভীর অরণ্যে ঘেরা চিল্কিগড়ের শতাব্দীপ্রাচীন কনকদুর্গা মন্দির। পুজোয় অষ্টধাতুর জাগ্রত দেবীর পুজো দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা সমবেত হন। এ বার আপনিও সামিল হতে পারেন। পাহাড়ি গ্রাম এবং সবুজ ঘেরা প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন ঝিলিমিলি এবং বেলপাহাড়ি।
ইতিহাস এখানে নিশ্চিন্তে নিদ্রা যায়
ইতিহাসে জানা যায়, ষোড়শ শতকের শেষভাগে (আনুমানিক ১৫৭৪ খ্রিষ্টাব্দ) মুঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি রাজা মানসিংহের নির্দেশে তাঁর রাজপুত সেনাদল জঙ্গলখণ্ডে অভিযানে আসে। সেই বাহিনীর অন্যতম রাজপুত সেনাপতি সর্বেশ্বর সিংহ স্থানীয় পরাক্রমশালী ‘মল’ রাজাদের পরাজিত করে এই ভূখণ্ডের অধিকার নেন। মল রাজাদের পরাস্ত করার স্মারক হিসেবে তিনি নিজের নামের সঙ্গে ‘মল্লদেব’ উপাধি ধারণ করেন। মল রাজাকে পরাজিত করার প্রতীক হিসেবে আজও বিজয়া দশমীর দিন এখানে মল রাজার প্রতীকী বধ উৎসব পালন করা হয়। মল্লদেব বংশের উত্তরাধিকারী ও স্থানীয় যোদ্ধারা তির-ধনুক, তলোয়ার এবং ঢাল নিয়ে প্রাচীন রণকৌশল প্রদর্শন করেন। ইতিহাসের এমন জীবন্ত দলিল চাক্ষুষ করতে কে না চান?
উৎসবের দিনগুলোতে শহরের কৃত্রিম কোলাহল পেছনে ফেলে কয়েকটা দিন নির্ভেজাল শান্তি চাইলে চলে যান বাবুরভানি। প্রকৃতি আপনাকে সেখানে নিরাশ করবে না।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।