কার্পেথিয়ান পাহাড়ের গায়ে সন্ধে নেমেছে। পাহাড়ি হাওয়ায় কনকনে ঠান্ডা। কুয়াশার ভিতর থেকে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে এক মধ্যযুগীয় দুর্গের কালো অবয়ব। উঁচু মিনার, পাথরের দেওয়াল, সরু সরু জানলা। মিনারের চূড়া থেকে হঠাৎ ভেসে এল দাঁড়কাকের কর্কশ ডাক!
রোমানিয়ার ট্রান্সিলভানিয়ায় আপনি স্বাগত। আর পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা দুর্গটি ব্রান ক্যাসল— ড্রাকুলার দুর্গ নামেই যার পরিচিতি বেশি।
অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে হ্যালোউইনের সময়ে দুর্গের চেহারা একেবারে বদলে যায়। দিনের আলোয় যে দুর্গ পর্যটকদের ভিড়ে গমগম করে, রাত নামলে সেখানেই পুরোপুরি অন্য মেজাজ। ম্লান আলোয় পাথরের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়, পেরোতে হয় সরু করিডর, ভারী কাঠের দরজা আর শতাব্দীপ্রাচীন ঘর। কোথাও আচমকা ভেসে আসে অচেনা আওয়াজ। কোথাও মিশমিশে অন্ধকার থেকে যেন হাওয়ায় ভেসে বেরিয়ে আসে কালো আলখাল্লা পরা এক চরিত্র। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে গায়েব!
এখানেই হ্যালোউইনের বিশেষ আকর্ষণ। নাটকীয় আলো, শব্দ আর সাজপোশাকে দুর্গের ইতিহাস মিশে যায় ভ্যাম্পায়ারদের কাল্পনিক জগতের সঙ্গে। ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলা উপন্যাসের সঙ্গে ব্রান দুর্গের সরাসরি ঐতিহাসিক যোগাযোগ নিয়ে মতভেদ আছে। কিন্তু এই দুর্গের অন্ধকার সিঁড়ি, গোপন কুঠুরি আর পাহাড়ি নিঃসঙ্গতা দেখলে কল্পনা আর বাস্তবের সীমারেখাটা বেশ ঝাপসা হয়ে আসে।
আরও পড়ুন:
রাতের সফর শেষে দুর্গের বাইরে দাঁড়িয়ে একটি বার পিছন ফিরে তাকান। দুর্গের গায়ে নিভু নিভু আলো জ্বলছে দু’একটা জানলায়। বাকিটা ডুবে আছে ছায়া ছায়া অন্ধকারে। ভিতরে কেউ এখনও রয়ে গিয়েছে কি? সে কি বন্দি হবে কাউন্ট ড্রাকুলার হাতে?
ট্রান্সিলভানিয়ার গা ছমছমে অভিজ্ঞতা অবশ্য এখানেই শেষ নয়। এর পরের গন্তব্য হোক হোইয়া-বাচিউ বন। অনেকে একে রোমানিয়ার সবচেয়ে ভূতুড়ে জঙ্গল বলেন। অস্বাভাবিক রকমের বাঁকানো সব গাছপালা, রহস্যময় আলো আর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মানুষের গল্প ঘিরে এই জঙ্গলের কুখ্যাতি। স্থানীয় লোককথায় রয়েছে ভূতপ্রেত, অদৃশ্য উপস্থিতি আর সময় হারিয়ে ফেলার গল্পও। এখানে নাকি মাঝেমধ্যেই মোবাইলের সিগন্যাল উধাও হয়ে যায়। ক্যামেরা আর অন্য বৈদ্যুতিন যন্ত্রপাতি বিগড়ে যায় আচমকা। কম্পাসও নাকি ঠিকমতো কাজ করে না। যদিও এ সব ঘটনার সঙ্গে কোনও অলৌকিক শক্তির যোগ থাকার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ মেলেনি। তবু গাছপালার ঘন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে হঠাৎ ফোনের পর্দায় নো সিগন্যাল ফুটে উঠলে বুকটা এক বার ছ্যাঁৎ করে উঠতেই পারে!
কী ভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে বিমানে রোমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্ট। সেখান থেকে ট্রেনে ব্রাশভ, তারপর বাস বা গাড়িতে ব্রান দুর্গ। হোইয়া-বাচিউ দেখতে যেতে হবে ক্লুজ়-নাপোকা শহরে। দু’টি জায়গা একসঙ্গে ঘুরতে অন্তত পাঁচ-ছ’দিন রাখুন। জঙ্গলে সন্ধ্যার সফর অবশ্যই স্থানীয় গাইডের সঙ্গে করবেন।
খরচ: (কলকাতা থেকে, দু’জনের জন্য): পাঁচ-ছয় দিনের সফরে বিমানভাড়া, মাঝারি মানের হোটেল, খাবার, যাতায়াত ও থিম-ট্যুর মিলিয়ে আনুমানিক ৩ লক্ষ টাকা।
এই প্রতিবেদনটি 'আনন্দ উৎসব' ফিচারের একটি অংশ।