পাইন বনের আড়ালে কোথায় ছেলেটা? নাচমহলে কার ঘুঙুরের শব্দ? রাত নামলেই গল্প বদলায় বাংলার এই ৮ ঠিকানায়
টিমটিমে আলোর এক রাত। কাঁপা কাঁপা প্রদীপ শিখায় যেন আরও ঘন হয়ে আসে ভয়ের শিহরণ। অসমসাহসী যাঁরা ভূত চতুর্দশীতে ভূতের খোঁজে বেরিয়ে পড়তে চান, তাঁদের জন্য রইল এই বাংলারই কিছু ভূতুড়ে ঠিকানার সন্ধান।
চোদ্দো প্রদীপ জ্বলে উঠলেই জমে ওঠে ভূতের গল্পের আসর। কেমন হবে সেই গল্পের আসল ঠিকানায় পৌঁছে গেলে? যেখানে পাহাড়ি কুয়াশার আড়ালে মিলিয়ে যায় ছোট্ট ছেলে, পুরনো রাজবাড়ির নাচমহলে শোনা যায় ঘুঙুরের শব্দ, কিংবা নির্জন রেলস্টেশনে অপেক্ষায় সাদা শাড়ির এক নারী।
এ সব ঘটনার কতটা সত্যি, কতটা লোককথা— তা নিয়ে তর্ক চলতেই পারে। তবে বাংলার এই সুনসান জায়গাগুলোয় বেড়াতে গেলে ইতিহাস, প্রকৃতি আর অলৌকিকের গল্প পাবেন একসঙ্গে। সঙ্গে আছে আরও কিছু গল্প, দিনের আলোয় শুনলেও ফিরে আসতেই পারে রাতের স্বপ্নে।
ডাও হিল, কার্শিয়াং: মাথা-বিহীন সেই ছেলেটি- কার্শিয়াংয়ের ডাও হিল। সেখানে কুয়াশা নামে পাইনগাছের ফাঁকে। শিশির ভেজা পাতায় ঢাকা সরু রাস্তার কোথাও রোদ পৌঁছয় না ভাল করে। এমনই এক বনপথ, স্থানীয়দের কাছে তার নাম ‘ডেথ রোড’। তাকে ঘিরেই রয়েছে এক মুণ্ডহীন বালকের গল্প।
শোনা যায়, স্থানীয় ভিক্টোরিয়া বয়েজ স্কুলের কাছাকাছি তাকে হেঁটেচলে বেড়াতে দেখা যায়। কিছুদূর এগিয়েই সে নাকি অদৃশ্য হয়ে যায় গাছের আড়ালে। স্কুলের বন্ধ করিডরের ভিতর থেকেও নাকি শোনা যায় তার পায়ের শব্দ। কার্শিয়াংয়ের চা-বাগান, পাহাড় আর পুরনো স্কুলবাড়ি দেখতে গিয়ে ডাও হিলেও ঘুরে আসতে পারেন। তবে জঙ্গলের দিকে কতদূর পায়ে হেঁটে এগোবেন, সে আপনার ব্যাপার।
মর্গান হাউস, কালিম্পং: মেমসাহেব কি এখনও বাড়িতে?- কালিম্পংয়ের দুরপিন পাহাড়ে কালো পাথরের তৈরি সুবিশাল মর্গান হাউস। ঢালু ছাদ, পুরনো জানলা, কাঠের সিঁড়ি আর চারপাশে একরাশ পাহাড়ি সবুজ। তিরিশের দশকে জর্জ মর্গানের তৈরি এই বাড়ি এখন পর্যটকদের থাকার জায়গা। অথচ আজও এখানকার সবচেয়ে আলোচিত বাসিন্দা নাকি লেডি মর্গান!
আরও পড়ুন:
প্রচলিত গল্পে, রাত গভীর হলেই সিঁড়িতে শোনা যায় তাঁর পায়ের শব্দ। অনেক পর্যটকই তাঁর অদৃশ্য উপস্থিতি অনুভব করেছেন বলেও দাবি করেন। লেডি মর্গানের গল্প কতটা সত্যি, তা আপনি বিচার করবেন। কিন্তু রাত বাড়লে, পাহাড়ের আলো নিভে চারপাশ যখন নিস্তব্ধ হয়ে আসে, তখন প্রাচীন বাড়িটার করিডরে হঠাৎ ভেসে আসা পায়ের শব্দে যুক্তিবাদী মনও কি এক মুহূর্তের জন্য টলে ওঠে না?
বেগুনকোদর, পুরুলিয়া: শেষ ট্রেনের অপেক্ষায় ও কে দাঁড়িয়ে? পুরুলিয়ার বেগুনকোদর। আপাতদৃষ্টিতে আর পাঁচটা ছোট রেলস্টেশনের মতোই। অথচ ষাটের দশকে এই স্টেশনকে ঘিরে এমন এক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল যে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল রেল পরিষেবা। শোনা যায়, রাতের অন্ধকারে রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন সাদা শাড়ি পরা এক মহিলা। ট্রেন এগোতে শুরু করলে তিনিও নাকি ছুটতেন তার সঙ্গে, কখনও ট্রেনের গতিকেও হার মানিয়ে। এক স্টেশনমাস্টারের মৃত্যুর পরে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।
দীর্ঘদিন যাত্রী পরিষেবা বন্ধ থাকার ইতিহাসও জড়িয়ে এই কিংবদন্তির সঙ্গে। এখন অবশ্য ট্রেন চলাচল আবার শুরু হয়েছে, মানুষের আনাগোনাও আগের তুলনায় বেশি। অযোধ্যা পাহাড়ের দিকে বেড়াতে গেলে স্টেশনটি দেখে আসতে পারেন। রোদ ঝলমলে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে গল্পটা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু সন্ধের নিভু নিভু আলোয় দূরে রেললাইনের দিকে তাকালে কী মনে হবে, বলা কঠিন।
বক্সা দুর্গ, ডুয়ার্স: দেওয়ালে আটকে থাকা দীর্ঘশ্বাস- বক্সা পাহাড়ের জঙ্গলের ভিতরে আছে এক পুরনো দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। পৌঁছতে গেলে পাহাড়ি পথ ধরে বেশ কিছুটা হাঁটতে হয়। ব্রিটিশ আমলে এই দুর্গে বন্দি রাখা হত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের। সেই বন্দিজীবনের স্মৃতি থেকেই জন্ম নিয়েছে অশরীরী উপস্থিতি আর অদৃশ্য দীর্ঘশ্বাসের গল্প। যদিও নির্দিষ্ট ভূতুড়ে ঘটনার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
আরও পড়ুন:
চার দিকে ঘন বন, পাখির ডাক, শ্যাওলা ধরা পাথর। তবে ফাঁকা ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের ভারটুকু টের পাওয়া যায় ঠিক। ডুয়ার্সের জয়ন্তী, বক্সা আর লেপচাখা ঘোরার পরিকল্পনায় এই দুর্গটিকে স্থান দিতেই পারেন। তবে ভূতের গল্পের চেয়েও শিহরণ জাগায় ইতিহাস। এই নির্জন পাহাড়ের বুকে, দুর্গের পাথুরে ঘরগুলোয় এক দিন বন্দি ছিলেন কত স্বাধীনতা সংগ্রামী। তাঁদের দীর্ঘশ্বাস কি লেগে নেই দেওয়ালের গায়ে?
সুন্দরবন: অন্ধকার জলে ওটা আলো নাকি আলেয়া?- সন্ধে নামলে সুন্দরবনের খাঁড়িতে মুছে যেতে থাকে নদী আর জঙ্গলের সীমারেখা। মাছধরার নৌকো এসে ঘাটে নোঙর করে, দূরে উড়ে যায় বকের ঝাঁক । সুন্দরবনের জেলেদের মুখে শোনা যায় আলেয়ার গল্প। গভীর রাতে জলাভূমির উপরে নাকি ভেসে বেড়ায় এক রহস্যময় আলো। তাকে অনুসরণ করতে গিয়ে অনেকেই নাকি আর ফেরার পথ খুঁজে পায় না। জঙ্গলে একে বাঘের ভয় তো আছেই, তার সঙ্গে জুড়ে আছে বেঘো ভূতের আতঙ্ক।
লোকবিশ্বাস বলে, বাঘের শিকার হওয়া মানুষদের আত্মা নাকি ঘুরে বেড়ায় বনের আনাচকানাচে। কখনও বাঘের ডাক নকল করে, কখনও পথ ভুলিয়ে মানুষকে ঠেলে দেয় বাঘের মুখে। কে জানে, রাতের জঙ্গলে দূর থেকে ভেসে আসা সে ডাক আসলে কার! বনবিবি ও দক্ষিণ রায়কে ঘিরেও গড়ে উঠেছে সুন্দরবনের নিজস্ব লৌকিক-অলৌকিক বিশ্বাসের জগৎ। নৌকোয় বসে স্থানীয় মানুষের মুখে এ সব শুনলে অচেনা লাগে চেনা নদীকেও। তবে অলৌকিকের খোঁজে নয়, জঙ্গলের নিয়ম মেনে বেড়ানোই ভাল।
কমলপুর জমিদারবাড়ি, বর্ধমান: এলোচুল মহিলা গেলেন কোথায়? - বর্ধমানের কমলপুরে বসু পরিবারের পুরনো জমিদার বাড়ি। ভাঙা দেওয়াল বেয়ে গাছপালা উঠেছে, ধুলো জমেছে দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত বারান্দায়। এই বাড়িতেই এক সন্ধেয় কাজ করতে এসে এক মিস্ত্রি নাকি দেখেছিলেন এলোচুলে দাঁড়িয়ে থাকা এক মহিলাকে। চোখের পলক ফেলতেই তিনি উধাও!
যদিও বসু পরিবারের এক সদস্য ভূতের গল্প মানতে একেবারেই নারাজ। তবে বর্ধমান বেড়াতে গেলে এই পুরনো জমিদারবাড়িটি দেখে আসতে পারেন। বাড়ির এখন ভগ্নদশা। তাই অনুমতি ছাড়া ভিতরে না ঢোকাই ভালো।
আন্দুল রাজবাড়ি, হাওড়া: নাচমহলে কার ঘুঙুরের শব্দ?- হাওড়ার আন্দুল রাজবাড়ির এক সময়ের জাঁকজমক এখন অতীত। পুরনো স্তম্ভ, ভাঙা ছাদ আর পরিত্যক্ত নাচমহল ঘিরে তাই জমে উঠেছে নানা গল্প। স্থানীয় যুবকের দাবি, নাচমহলের দিক থেকে নাকি ঘুঙুরের শব্দ আর শিশুদের কান্নার আওয়াজ মাঝেমাঝেই শুনতে পাওয়া যায়।
ঝড়ের রাতে বাড়ির ছাদ ভেঙে পড়ার ঘটনার কথা শুনিয়েছেন আর এক বাসিন্দা। সেই ঘটনাতেও নাকি ভূতুড়ে কাণ্ডের ছায়া দেখেছিলেন স্থানীয়রা। কলকাতা থেকে কাছেই এই পুরনো রাজবাড়ি। দিনের আলোয় স্থাপত্য দেখতে গিয়ে কারও কাছে শুনে নিতে পারেন সেই রাতের গল্প। ভাঙা অংশে অবশ্য প্রবেশ করবেন না।
সাউথ পার্ক স্ট্রিট গোরস্থান: মৃত সাহেবের অস্থির আত্মা- পার্ক স্ট্রিটের এই পুরনো সমাধিক্ষেত্র কলকাতাবাসীর কাছে অচেনা নয়। তবু যত বার ঢোকা যায়, বাইরের ব্যস্ত শহরটা যেন কোথায় হারিয়ে যায়! বিশাল গাছের শিকড় জড়িয়ে ধরেছে পুরনো সমাধি, শ্যাওলা জমেছে শ্বেতপাথরের তৈরি ডানাওয়ালা দেবদূতের শরীরে। কোথাও দুশো বছরের পুরনো নাম, কোথাও বা রয়েছে অকালমৃত শিশুর সমাধি।
এই সমাধিক্ষেত্রের সবচেয়ে অদ্ভুত লোককথাগুলোর একটি জড়িয়ে আছে স্যার উইলিয়াম ম্যাকনটেনকে ঘিরে। লোকে বলে, আফগানিস্তানে তাঁর নৃশংস হত্যার ঘটনা সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে বর্ণনা করলেই নাকি পাশের গাছপালার ডাল নড়ে ওঠে। সত্যি কি না জানা নেই। তবে শেষ বিকেলের আলোয় নির্জন সমাধিগুলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে গাছের পাতায় সামান্য খসখস শব্দ হলেও চমকে উঠতে পারেন কিন্তু!
কোথাও কবন্ধ বালক, কোথাও অদৃশ্য মেমসাহেব, কোথাও আবার হারিয়ে যাওয়া নূপুরের শব্দ - এসব গল্পের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ জাগতেই পারে। তবু পুরনো বাড়ি, নির্জন বনপথ কিংবা জনশূন্য প্ল্যাটফর্ম ঘিরে মানুষের ভয় আর কল্পনার যে জগৎ গড়ে উঠেছে, তার আকর্ষণই বা বাস্তবের চেয়ে কম কিসে? (এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।)