ভিনদেশে ছুটি কাটানোর সাধ আপনার অনেক দিনের। কিন্তু চেনা ছকের বিদেশ ভ্রমণের ছবি যা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোরে ফেরে, তা কেমন যেন মনে ধরে না। ওই তো চেকলিস্ট মিলিয়ে এখানে যাও আর ওখানে, ওমুক জায়গায় তমুক পোজ়ে ছবি তোলো। ব্যস! তার চেয়ে যদি রোজকার জীবনযাপনের সঙ্গে মিলেমিশে একটা নতুন দেশকে চেনা যায়, তার স্বাদই তো আলাদা! বেশ তো, তাইল্যান্ড চলুন তবে! কলকাতা থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার উড়ান। পুজোর ছুটি আর মেজাজ, দুটোই তো হাতে আছে এখনও!
গন্তব্য পাটায়ার জমজমাট নাইটলাইফ কিংবা ফুকেটের বিচ পার্টি নয়। বরং চেনা ছকের সফরের বাইরে গিয়ে দেশটার সংস্কৃতি, ইতিহাস আর রোজকার জীবনের সঙ্গে পরিচিত হওয়াই থাক প্ল্যানে। প্রাচীন মন্দির, পুরনো পাড়া, স্থানীয় বাজার, সাবেক রান্না আর শিল্পকলার টানে ঘুরে দেখা এক অন্য তাইল্যান্ড। কখনও পায়ে হেঁটে, কখনও সাইকেলে, আবার কখনও স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে নিতে। পর্যটনের ঝলমলে ছবির আড়ালে যে তাইল্যান্ডের গল্প ছড়িয়ে রয়েছে, তাকেই খুঁজেপেতে নেওয়া!
প্রথম গন্তব্য ব্যাঙ্কক। আলো, গাড়ি আর মানুষের ভিড়ে শহরটা প্রথমে খানিকটা চোখ ধাঁধিয়ে দিলেও পায়ে হেঁটে ঘুরতে শুরু করলেই ধরা পড়ে তার অন্য রূপ। তালাত নইয়ের পুরনো চিনা পাড়ায় সরু গলি, শতাব্দীপ্রাচীন বাড়ি, ছোট ছোট দোকান আর দেওয়ালজোড়া স্ট্রিট আর্টের মেলবন্ধনে এক অন্য ব্যাঙ্কক ধরা দেয়। চাও ফ্রায়া নদীর ফেরিতে নামমাত্র খরচেই পৌঁছে যেতে পারেন অন্য পাড়ে। শহরের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের স্বাদ নিতে ঢুঁ মারুন কোনও বৌদ্ধমন্দিরে। সোনালি কারুকাজ, বুদ্ধমূর্তি আর প্রার্থনার শান্ত পরিবেশে ব্যস্ত মহানগরের কোলাহল যেন মুহূর্তে মিলিয়ে যাবে। সন্ধে নামলে চলে যান ইয়াওয়ারাতের চিনাটাউনে। রাস্তার ধারে ধোঁয়া ওঠা নুডলস, গ্রিল করা সামুদ্রিক মাছ, নারকেলের মিষ্টি— কোনটা ছেড়ে কোনটা খাবেন! নামী রেস্তোরাঁয় না গিয়ে এখানকার স্ট্রিট ফুডেই জমে উঠতে পারে রাতের খাওয়াদাওয়া। হাতে সময় থাকলে ব্যাঙ্ককের কাছাকাছি কোনও ভাসমান বাজারে কাটিয়ে আসুন একটা সকাল। নৌকোয় সাজানো ফল, সবজি, মশলা আর নানা পদের খাবারের পসরা দেখতে দেখতে পরিচয় হবে তাইল্যান্ডের বহু পুরনো নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্য-সংস্কৃতির সঙ্গে।
চিয়াং মাই
এর পরে উড়ে চলুন উত্তর তাইল্যান্ডের চিয়াং মাই-এ। ব্যাঙ্ককের তুলনায় এখানে যেন সময় চলে ঢিমেতালে। পুরনো শহরের চারপাশে প্রাচীন দেওয়াল, ছোট ছোট বৌদ্ধ মন্দির, ছায়াঘেরা গলি। সকাল সকাল সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন – দেখে নিন ফুলের বাজার, কাঠের বাড়ি, কফির দোকান আর নিরিবিলি পাড়ার জীবনচর্যা। রবিবারের ওয়াকিং স্ট্রিট মার্কেট যেন এক চলমান প্রদর্শনী— হাতে আঁকা ছবি, রুপোর গয়না, হাতে তৈরি ব্যাগ, মাটির জিনিস। শিল্পীরা সামনে বসেই কাজ করছেন। দরদাম করতে করতে দু-একটা জিনিস কিনে ফেললেই বা ক্ষতি কী!
খাবারের গল্পও বেশ জমজমাট। উত্তরের বিখ্যাত খাও সুয়ে— নারকেলের দুধে তৈরি ঝাল-মশলাদার কারি, উপরে মুচমুচে ভাজা নুডলস। সঙ্গে স্টিকি রাইস, গ্রিল করা মাংস আর স্থানীয় সস। সময় থাকলে কুকিং ক্লাসে যোগ দিতে পারেন। বাজার থেকে শাকপাতা, লঙ্কা, লেমনগ্রাস কিনে তাই রান্নার হাতেখড়ি হোক না —ভ্রমণের স্মৃতি তো শুধু আর ফ্রিজ ম্যাগনেট নয়!
রাজধানী আয়ুথায়া
সময় থাকলে ব্যাঙ্কক ফেরার পথে পাড়ি জমাতে পারেন প্রাচীন রাজধানী আয়ুথায়ায়। এক সময়ের সমৃদ্ধ শ্যামরাজ্যের এই শহরে ছড়িয়ে থাকা মন্দির, বুদ্ধমূর্তি আর প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ আজও বয়ে বেড়াচ্ছে তাইল্যান্ডের গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষ্য।
সফরের শেষ দু’দিন কাটাতে পারেন সমুদ্রের ধারে, একটু ধীরেসুস্থে। তবে গতানুগতিক সমুদ্রবিলাসের বাইরে অন্য রকম অভিজ্ঞতা চাইলে বেছে নিন কো সামুই দ্বীপের শান্ত, গ্রামীণ পরিবেশ। সারি সারি নারকেল গাছ, নোনা হাওয়া আর নরম বালির সৈকতে সময় কাটবে নিজের ছন্দে। সকালে সমুদ্রের ধারে হাঁটাহাঁটি, দুপুরে স্থানীয় কোনও ছোট্ট খাবারের দোকানে মাছের তাই কারি আর ভাত, বিকেলে একটা নৌকোয় নীল জলে ভেসে বেড়ানো। সুযোগ পেলে ঢুঁ মারুন কোনও জেলেপাড়ায়। পর্যটনের চাকচিক্যের আড়ালে দ্বীপের বাসিন্দাদের সহজ, অনাড়ম্বর জীবনযাত্রার সঙ্গেও পরিচয় হবে।
এই সফরে পাঁচতারা হোটেলের বিলাসিতা নয়, ভরসা থাকুক পরিচ্ছন্ন হোম স্টে বা গেস্ট হাউস, গণপরিবহণ আর স্থানীয় খাবারে। সঙ্গে থাক আগে থেকে কেটে রাখা বিমানটিকিট। কলকাতা থেকে দু’জনের ন’দিনের সফরে যাওয়া-আসার বিমানভাড়া আনুমানিক ৫০ হাজার টাকা, তাইল্যান্ডের ভিতরে বিমান ও অন্যান্য যাতায়াতে আরও ৪০ হাজার। থাকা, খাওয়া ও ঘোরাঘুরি মিলিয়ে মোট খরচ পড়তে পারে ২ লক্ষ টাকা্র মতো, কেনাকাটা বাদে। তবে উৎসবের মরশুমে বিমানভাড়া ও কো সামুইয়ে থাকার খরচ আগেভাগে যাচাই করে নিন অবশ্যই।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।