সিঁড়ি বেয়ে নামলেই বাড়ে অস্বস্তি, ভাঙা প্রাসাদের বুক চিরে শোনা যায় ও কার আর্তনাদ? পা রাখলেই গা ছমছম দেশের এই আট ঠিকানায়
কালীপুজোর ঠিক আগের রাতটাই ভূত চতুর্দশী। আর তো মোটে কয়েকটা দিন মাঝে। এই গা ছমছমে সময়ে একটু ঢুঁ মারা যাক বাংলার বাইরের কিছু চেনা, অচেনা, আধ-চেনা ভুতুড়ে ঠিকানায়।
ভূত চতুর্দশী আসছে, ভূতেরা সব কোথায়? শোনা যায়, এই রাতেই নাকি ভূতপ্রেত আর অনুচরদের নিয়ে মর্ত্যে হাজির হয় নরকাসুর। আবার কারও বিশ্বাস, এ রাতে মৃত পূর্বপুরুষদের আত্মারাও ফিরে আসেন নিজেদের বাড়িতে।
কালীপুজোর আগের এই শিরশিরে ভয়ের রাতে ভূতেরা সত্যিই মর্ত্যে নামে কি না, সে খবর ঠিক ঠিক জানা নেই! তবে চোদ্দো প্রদীপের কাঁপা কাঁপা আলোর রাতে রহস্যঘেরা কোনও ঠিকানায় বেড়াতে যাওয়া কিংবা কোনও ভুতুড়ে বাড়িতে জমিয়ে ভূতের গল্প শোনার মজাই আলাদা।
ভারতের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে এমন সব দুর্গ, পরিত্যক্ত গ্রাম আর পুরনো বাড়ি, যাদের ঘিরে আজও প্রচলিত গা ছমছমে সব কাহিনি। চলুন, সে সব জায়গায় একটু উঁকি দেওয়া যাক!
কুলধারা, রাজস্থান জয়সলমের থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে একটা গোটা গ্রাম। বাড়ি আছে, রাস্তা আছে, অথচ বাসিন্দা নেই। ভাঙা পাথরের বাড়িগুলোর ফাঁক দিয়ে বাতাস বয়ে যায়, আর ফাঁকা গলিগুলোয় নিজের পায়ের শব্দই কেমন অচেনা লাগে।
লোককথা বলে, অত্যাচারী মন্ত্রী সেলিম সিংয়ের হাত থেকে বাঁচতে এক রাতেই কুলধারা গ্রাম ছেড়েছিলেন পালিওয়াল ব্রাহ্মণরা। যাওয়ার আগে নাকি অভিশাপ দিয়ে যান, এখানে আর কেউ থাকতে পারবে না! সূর্যাস্তের পরে প্রবেশ বন্ধ!
আরও পড়ুন:
ভানগড় দুর্গ, রাজস্থান পাহাড়ঘেরা ভাঙা প্রাসাদ, পরিত্যক্ত মন্দির আর অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। ঝোপঝাড়ে ঢেকে যাওয়া পাথরের সিঁড়ি আর ফাঁকা দরজাগুলো দেখে মনে হয়, এই বুঝি কেউ আড়াল থেকে বেরিয়ে এল!
ভানগড়ের গল্পে রয়েছে রাজকন্যা রত্নাবতী আর তাঁর প্রেমে পাগল এক তান্ত্রিক। রাজকন্যাকে বশ করার চেষ্টা ব্যর্থ হলে মৃত্যুর আগে নাকি গোটা নগরীকে অভিশাপ দেন তিনি। জনশ্রুতি, আজও দুর্গের ভিতর থেকে ভেসে আসে আর্তনাদ। সূর্যাস্তের পরে এখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ।
শনিওয়ারওয়াড়া, পুণে বিশাল ফটক, উঁচু প্রাচীর আর প্রাসাদের ভাঙা ভিত— শনিওয়ারওয়াড়ার আনাচকানাচে যেন এখনও লুকিয়ে রয়েছে পুরনো ষড়যন্ত্রের গল্প। পেশোয়াদের এই দুর্গে ১৭৭৩ সালে ক্ষমতার লড়াইয়ে খুন হয়েছিলেন তরুণ নারায়ণরাও।
আরও পড়ুন:
জনশ্রুতি বলে, গভীর রাতে পুণের এই অভিশপ্ত প্রাসাদ থেকে আজও নাকি ভেসে আসে নারায়ণরাওয়ের আর্তনাদ—‘কাকা, মালা বাচওয়া!’ অর্থাৎ, কাকা, আমাকে বাঁচাও! ১৮২৮ সালে ভয়াবহ আগুনে সাত দিন ধরে পুড়েছিল প্রাসাদ। সেই অগ্নিকাণ্ডে মৃতদের আত্মারাও নাকি ঘুরে বেড়ায় এখানে।
ফার্নহিল হোটেল, উটি কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ের কোলে পুরনো ইউরোপীয় ধাঁচের বাড়ি। কাঠের বারান্দা আর নির্জন করিডরগুলো দেখলেই মনে পড়ে যায় কোনও পুরনো ভূতের সিনেমার দৃশ্য। উটির এই হোটেলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বলিউডের ‘রাজ়’ ছবির শুটিংয়ের গল্প।
শোনা যায়, এক রাতে সেই ফার্নহিল হোটেলের উপরতলায় আসবাব টানাটানির শব্দে ঘুম ভেঙেছিল কয়েক জন নৃত্যশিল্পীর। সকালে অভিযোগ জানাতে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, তাঁদের ঘরের উপরে কোনও তলাই নেই! নিশুতি রাতে তবে আসবাব সরাচ্ছিল কারা?
অগ্রসেন কি বাওলি, দিল্লি দিল্লির ব্যস্ত রাস্তার কাছেই পাথরের ১০৮টি সিঁড়ি নেমে গিয়েছে গভীরে। দু’পাশের উঁচু দেওয়াল আর সারি সারি খিলানের ছায়ায় দিনের বেলাতেও নীচের অংশটা কেমন অন্ধকার লাগে।
অগ্রসেন কি বাওলির গল্পও কিন্তু কম অদ্ভুত নয়। কথিত আছে, যত নীচে নামবেন, ততই বাড়বে অজানা অস্বস্তি। কেউ কেউ নাকি অনুভব করেছেন অদৃশ্য কারও উপস্থিতি। যদিও এ সবের কোনও হাতেগরম প্রমাণ নেই।
ডুমাস বিচ, গুজরাত সমুদ্র সৈকত মানেই কি রোদ, ঢেউ আর ছুটি? সুরাতের ডুমাস বিচের গল্প একটু অন্য রকম। কালচে বালি, দূরে ধূসর সমুদ্র আর ফাঁকা সৈকতে বাতাসের একটানা শব্দ— সন্ধের পরে জায়গাটা কল্পনাতেই বেশ গা ছমছমে।
এই সৈকত এক সময়ে শ্মশান ছিল বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। রাতের অন্ধকারে নাকি ফিসফিসানি শোনা যায়, অকারণে ডেকে ওঠে কুকুর। এমনকি রাতে বেড়াতে গিয়ে কয়েক জন নিখোঁজ হয়েছেন বলেও কানাঘুষো শোনা যায় এখানে। সত্যতা অবশ্য অজানা।
ওম বান্না মন্দির, রাজস্থান রাজস্থানের রুক্ষ, ধুলোমাখা রাস্তার পাশে ছোট্ট মন্দির। আর সেখানে ফুলের মালায় সাজানো একটা মোটরবাইক! এখানে দেবতার আসনে রয়েছে রয়্যাল এনফিল্ড বুলেট। গল্পটা আরও অদ্ভুত।
১৯৯১ সালে দুর্ঘটনায় মারা যান বাইকের মালিক ওম সিং রাঠৌর। পুলিশ মোটরবাইকটি থানায় নিয়ে গেলেও সেটি নাকি বারবার ফিরে আসত দুর্ঘটনাস্থলে। এমনকি পেট্রোল খালি করে তালাবন্দি রেখেও আটকানো যায়নি! সেই বিশ্বাস থেকেই তৈরি হয়েছে মন্দির। পথচারীরা আজও থেমে প্রণাম করেন।
মুকেশ মিলস, মুম্বই ভাঙা দেওয়াল, পোড়া জানলা আর ছাদহীন বিশাল হলঘর। সমুদ্রের ধারের এই পরিত্যক্ত কারখানার ভিতর দিয়ে বাতাস বয়ে গেলে পরিবেশটা আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। এক সময়ে শ্রমিকদের ব্যস্ততায় গমগম করত কোলাবার এই কাপড়কল। ১৯৮২ সালে বন্ধ হওয়ার পরে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায় অনেকটা অংশ।
পরবর্তীতে বহু সিনেমার শুটিং হয়েছে এখানে। শোনা যায়, অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কারণে কোনও কোনও অভিনেতা কাজ করতে চাননি। এক অভিনেত্রীর আচরণ ঘিরে অশরীরী ভর করার গল্পও ছড়িয়েছিল। তবে এটি সাধারণ পর্যটকদের অবাধে ঘোরার জায়গা নয়।
ভূতের গল্প, নাকি ইতিহাসের ছায়া? কোথাও অভিশপ্ত রাজকন্যা, কোথাও হারিয়ে যাওয়া গ্রাম, কোথাও বা ঘুটঘুটে রাতে অদ্ভুত সব শব্দ। এ সব গল্পের সত্যি-মিথ্যের চুলচেরা বিচার করা কঠিন। তবু পুরনো দেওয়াল, নিঃসঙ্গ পথ আর বিস্মৃত ইতিহাসের টানে ধরা দিতে সাধ জাগে। সামনেই ভূত চতুর্দশী। ভূতের ভয় কাটিয়ে ঘুরে আসতেই পারেন কিন্তু! এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।