যানজটে হাঁসফাঁস কলকাতার পথঘাট পেরিয়ে গাড়ি ছুটছিল যশোর রোড ধরে। মনটা ততক্ষণে আনন্দে একলাফে বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়েছে। পুজোর ঢাক আর আলোর ঝলকানি থেকে দূরে, দু’দিন একটু ভিন্ন স্বাদের ছুটির খোঁজে আমাদের গন্তব্য ছিল— ইছামতী নদীর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা রূপসী মঙ্গলগঞ্জ!
মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টার ড্রাইভে কলকাতার চেনা ভিড় পিছনে ফেলে যখন মঙ্গলগঞ্জে পৌঁছলাম, চার পাশে তখন কাশফুলের শুভ্রতা আর মাতাল করা ছাতিম ফুলের গন্ধ। আমরা তো বটেই, সঙ্গের চারপেয়ে খুদেও মহাখুশি! বাঁশবন লাগোয়া গাছে ঘেরা রিসর্টের একফালি খোলা চত্বরে রীতিমতো ছোটাছুটি জুড়ে দিল তক্ষুনি!
আলসেমি করে বেরোতে খানিকটা দেরিই হয়েছিল। ফলে পৌঁছতেও দেরি। দুপুর শেষের পথে। খাওয়াদাওয়া সেরে দলের দুই প্রবীণা সদস্যকে বিশ্রামে পাঠিয়ে বেরোলাম খানিক আশপাশ ঘুরে দেখতে।
ছোট্ট, নিরিবিলি গ্রাম। তার মেঠো পথ, ঘরবাড়ি, ছোট ছোট দোকানপাট, চাষের জমির গা বেয়ে চলে গিয়েছে পিচ রাস্তা। পাশ দিয়ে বইছে ইছামতী। ওপারে জঙ্গল। পারমাদান অভয়ারণ্য। চওড়া ঘাটের পাশে নৌকোরা তৈরি থাকে সকাল-বিকেল। কেউ নদীতেই ঘোরেন। কেউ বা যান জঙ্গল-অভিযানে। এ জায়গাটার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু অবশ্য নদীর এপারেই। মাঠ জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ব্রিটিশ আমলের এক পেল্লায় ভাঙাচোরা বাড়ি। নীল কুঠি! স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ফেরা গল্প যার নাম দিয়েছে ‘কাটা সাহেবের কুঠি’। দিনের ঝকঝকে আলোয় তার যে চেহারা, পড়ন্ত বিকেলের লালচে নিভু নিভু আলোয় তাতেই যেন কেমন একটু ছমছমে ভাব!
সফরের আসল শিহরণ অবশ্য জমা ছিল রাতের জন্য!
সন্ধের অন্ধকার একটু গাঢ় হতেই বনফায়ারে জমে গেল ভূতের গল্প। তারপর রাত দশটা নাগাদ রিসর্টের কেয়ারটেকার তথা স্থানীয় গাইড যেই বললেন, "চলুন, নীলকুঠির নাইট সাফারি আর কাটা সাহেবের খোঁজে বেরোনো যাক", অমনি পেটের ভিতরে কেমন যেন একটা হালকা মোচড়! আমরা চলেছি হাঁসের মতো। একেবারে সামনে হ্যারিকেন হাতে গাইড। সঙ্গে রিসর্টের এক কুকুর। মাঝে আমরা চার জন এবং পোষ্য। পিছনে টর্চ হাতে রিসর্টের আর এক কর্মী ও কুকুর। টিমটিমে আলোর রেখা ধরে ঘন বাঁশবাগান আর জঙ্গল ঘেরা পথ পেরিয়ে পৌঁছলাম প্রাচীন মঙ্গলগঞ্জ নীলকুঠির ভগ্নাবশেষের সামনে। চারপাশে নিশুতি রাত, ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক আর তালগাছের পাতার খসখস শব্দটুকু বাদ দিলে একেবারে নিস্তব্ধ।
স্থানীয়দের মুখে মুখে ফেরা গল্পে আজও এই চত্বরে ঘুরে বেড়ায় অত্যাচারী নীলকর সাহেব—বিদ্রোহের সময়ে ক্ষুব্ধ চাষিরাই নাকি যার শিরচ্ছেদ করেছিল! আজও নাকি আঁধার রাতে কুঠির ভাঙা বারান্দায় মাথা কাটা সেই 'কাটা সাহেব'-কে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। শোনা যায় তাঁর ঘোড়ার খুরের খটাখট, চাবুকের সপাসপ শব্দ! সেই নিকষ অন্ধকারে কুঠির জীর্ণ দেওয়াল আর ঝুলন্ত বট-পাকুড়ের ঝুরির মাঝে দাঁড়িয়ে শিরদাঁড়া দিয়ে যেন হিমের স্রোত বয়ে গেল। সত্যি বলছি, সেই মুহূর্তে টর্চের আলো সামান্য কেঁপে উঠলেও বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠছিল!
পরদিন সকালের রোদ মেখে ইছামতীর শান্ত বুকে নৌকাবিহার আর পারমাদান ফরেস্টে হরিণ দেখার আনন্দ রাতের সেই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় একেবারে অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল।
কী কী করবেন ও দেখবেন:
গা-ছমছমে নাইট ওয়াক: রাতে গাইডের সাথে নীলকুঠিতে কাটা সাহেবের গল্প আর নির্জনতার স্বাদ।
ইছামতীতে সূর্যাস্ত: পড়ন্ত বিকেলে ডিঙি নৌকায় ভেসে শান্ত নদীতে জল-সফর।
পারমাদান অভয়ারণ্য: সবুজ জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া আর হরিণ দর্শন।
মোট আনুমানিক খরচ (জনপ্রতি বাজেট ট্রিপ):
ট্রেনে গেলে (যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য সব মিলিয়ে): ₹১,৫০০ – ₹১,৮০০
গাড়িতে গেলে (জ্বালানি ভাগাভাগি, থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য সব মিলিয়ে): ₹২,০০০ – ₹২,৩০০
এই প্রতিবেদনটি "আনন্দ উৎসব" ফিচারের একটি অংশ